প্রিয় দর্শক, গল্প শুরু করার আগে আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করছি, আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আপনি সবসময় নতুন গল্প ও খবর পেতে পারেন! চলুন, তাহলে শুরু করা যাক আজকের গল্প!”
ইউটিউব চ্যা সাবস্ক্রাইব করুন, এবং 10 হাজার টাকা জিতুন, চ্যানেলের ভিডিও তে কমেন্ট করুন, আমরা 3 জন বিজয়ী বেছে নেব।
https://youtube.com/@mrtempestis-q7f?si=g3B45DE2WFSjYpOi

মৃত্যুর যন্ত্রণা
ঢাকার পুরানো অংশের একটা সরু গলিতে, যেখানে বৃষ্টি হলে পানি জমে থাকে দিনের পর দিন, সেখানে থাকতেন আব্দুল হামিদ সাহেব। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। চারতলা বাড়ির নিচতলায় একটা ছোট ফ্ল্যাট। সকালে উঠে ফজরের নামাজ পড়তেন, তারপর চায়ের দোকানে বসে খবরের কাগজ পড়তেন। দিনের বেলা মিরপুরের একটা ছোট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে অ্যাকাউন্ট্যান্টের চাকরি করতেন। স্ত্রী রহিমা, দুই ছেলে আর এক মেয়ে। বড় ছেলে রিয়াজ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, মেয়ে সুমাইয়া কলেজে। ছোট ছেলে সামি স্কুলে।
হামিদ সাহেব সাধারণ মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন না নিয়মিত, কিন্তু জুম্মার দিন মসজিদে যেতেন। রমজানে রোজা রাখতেন, কিন্তু অন্য সময় ধূমপান ছাড়তে পারতেন না। অফিসের চাপে মাঝে মাঝে সুদের লেনদেনে জড়িয়ে পড়তেন, পরে তওবা করতেন। পরিবারের জন্য সবকিছু করতেন। রহিমা বলত, “আপনি একটু ধীরে চলেন, শরীর খারাপ করবেন।” তিনি হাসতেন, “আল্লাহ যা লিখেছেন তাই হবে।”
সেই বছর শীতের শেষে তার শরীরটা খারাপ হতে শুরু করল। প্রথমে শুধু কাশি, তারপর জ্বর। ডাক্তার বললেন, নিউমোনিয়া। অ্যান্টিবায়োটিক দিলেন। কিন্তু সুস্থ হচ্ছিল না। একদিন অফিস থেকে ফিরে বুকে ব্যথা অনুভব করলেন। রাতে ঘুম ভেঙে গেল। বুকের ভিতর যেন কেউ চাপ দিচ্ছে। রহিমা জেগে উঠে পানি দিল। “ডাক্তারের কাছে যাবেন কাল।”
পরদিন হাসপাতাল। ইসিজি করিয়ে দেখা গেল হার্টের সমস্যা। ডাক্তার বললেন, “এনজিওগ্রাম করাতে হবে।” কিন্তু টাকার অভাব। হামিদ সাহেব বাসায় ফিরলেন। রাতে ব্যথা বাড়ল। তিনি বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিলেন। চোখ বন্ধ করলে মনে হচ্ছিল, জীবনের সব স্মৃতি একসাথে ভেসে উঠছে।
ছোটবেলার কথা। বাবা মারা গিয়েছিলেন খুব ছোট বয়সে। মা একাই লালনপালন করেছেন। প্রথম চাকরি, বিয়ে, সন্তানদের জন্ম। একবার ব্যবসা করতে গিয়ে লোকসান। সুদের টাকা ধার নিয়েছিলেন। সেই পাপের কথা মনে পড়তেই বুক কেঁপে উঠল। “আস্তাগফিরুল্লাহ...” ফিসফিস করে বললেন।
রাত দুটোর দিকে ব্যথা অসহ্য হয়ে উঠল। যেন বুকের ভিতর আগুন জ্বলছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। রহিমা ছেলেমেয়েদের ডেকে তুলল। সামি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আব্বু, কী হয়েছে?” হামিদ সাহেবের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না ভালো করে, কিন্তু শুনতে পাচ্ছিলেন সব।
হঠাৎ মনে হল, ঘরের কোণে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অদৃশ্য, কিন্তু অনুভব করা যাচ্ছে। শরীর অবশ হয়ে আসছে। পা থেকে শুরু করে হাত, তারপর বুক। যেন কেউ ধীরে ধীরে টেনে নিচ্ছে ভিতর থেকে। এটাই সাকারাতুল মওত। মৃত্যুর যন্ত্রণা।
কোরআনে বলা হয়েছে: “মৃত্যুযন্ত্রণা সত্য সহ আসবে – এ তো তাই যা তুমি এড়িয়ে যেতে চাইতে।” (সূরা কাফ, ১৯)। হামিদ সাহেবের মনে হল, শরীরের প্রতিটি কোষ চিৎকার করছে। রূহ বের হতে চায় না। এই শরীর, যেটা সে পঞ্চাশ বছর ধরে ব্যবহার করেছে, এখন তাকে ছাড়তে চায় না। প্রতিটি শিরা, প্রতিটি নার্ভ যেন টেনে ধরছে।
তিনি চেষ্টা করলেন কথা বলতে। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...” কিন্তু জিভ ভারী হয়ে গেছে। রহিমা কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “আপনি কালেমা পড়ুন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।” ছেলেরা চারপাশে বসে কাঁদছে। মেয়ে সুমাইয়া তার হাত ধরে আছে।
যন্ত্রণা বাড়ছে। মনে হচ্ছে কেউ তার বুকের ভিতর থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে বের করছে। হাদিসে বলা হয়, ঈমানদারের রূহ বের হয় পানির ফোঁটার মতো সহজে, কিন্তু পাপীর জন্য কষ্ট হয় অনেক। হামিদ সাহেব জানতেন না তিনি কোন দলে। শুধু তওবা করছিলেন মনে মনে। “ইয়া আল্লাহ, মাফ করুন। আমি অনেক ভুল করেছি। সন্তানদের জন্য, স্ত্রীর জন্য যা করেছি তা আপনার জন্যই করি।”
চোখের সামনে দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। যেন তিনি তার জীবনের ফিল্ম দেখছেন। ছেলেবেলার খেলা, যৌবনের ভুল, বিয়ে, সুখ-দুঃখ। তারপর হঠাৎ একটা আলো। ঘরে যারা ছিল তারা দেখতে পাচ্ছিল না, কিন্তু তিনি দেখছিলেন। সাদা পোশাক পরা ফেরেশতা। মুখ শান্ত। তাদের হাতে সুন্দর কাপড়।
একজন বললেন, “ওহে পবিত্র আত্মা! বেরিয়ে এসো। আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টির দিকে।” কিন্তু রূহ বের হচ্ছিল না সহজে। শরীরের সাথে আটকে আছে। যন্ত্রণায় শরীর কেঁপে উঠছিল। ডাক্তার ডাকা হয়েছিল, তিনি এসে বললেন, “অবস্থা খারাপ। হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।”
হামিদ সাহেবের কাছে সময় থেমে গেছে। প্রতি সেকেন্ড যেন এক ঘণ্টা। তিনি অনুভব করছিলেন, তার পা থেকে রূহ উঠে আসছে ধীরে ধীরে। পায়ের আঙ্গুল অবশ, তারপর হাঁটু, কোমর। বুকে পৌঁছাতেই যন্ত্রণা চরমে। মনে হল, কেউ তার বুক ছিঁড়ে ফেলছে। শ্বাসকষ্টে গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে। “উফফ...”
রহিমা কুরআন তিলাওয়াত শুরু করল। সূরা ইয়াসিন। ঘর ভরে গেল শান্তিতে। হামিদ সাহেবের চোখের সামনে তার মা দেখা দিলেন, যিনি অনেক আগে মারা গেছেন। “বাবা, ভয় পেও না। আল্লাহ আছেন।”
অবশেষে, অনেক কষ্টের পর রূহ বেরিয়ে এল। শরীরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চোখ খোলা, কিন্তু দৃষ্টি নেই। রহিমা চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ছেলেরা “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলতে বলতে কাঁদছে।
কিন্তু হামিদ সাহেবের জন্য যাত্রা শুরু হয়েছে নতুন। রূহ এখন ফেরেশতাদের সাথে। তারা তাকে নিয়ে উপরের দিকে যাচ্ছেন। আকাশের দরজায় প্রশ্ন। “কে এসেছে?” “আব্দুল হামিদ, আল্লাহর বান্দা।”
তার জীবনের আমলনামা খোলা হবে। ভালো-মন্দ। নামাজের কথা, রোজার কথা, সুদের কথা, সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব, মানুষের সাথে আচরণ। তিনি জানতেন না ফলাফল কী হবে। কিন্তু এই দুনিয়ায় যে যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, সেটা তার পাপের কাফফারা হতে পারে।
বাসায় শোকের ছায়া নেমেছে। রহিমা গোসলের ব্যবস্থা করছে। জানাজার প্রস্তুতি। পাড়ার লোকজন আসছে। কেউ বলছে, “ভালো মানুষ ছিল।” কেউ বলছে, “আল্লাহ যেন কবরে শান্তি দেন।”
হামিদ সাহেবের শরীর কবরে নামানো হল। মাটি চাপা দেওয়ার সময় শেষবারের মতো যন্ত্রণার অনুভূতি মনে পড়ল। কিন্তু এখন সব শেষ। এখন শুধু প্রশ্নের সময়। মুনকির-নাকির আসবেন। “তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে?”
তিনি যদি সঠিক উত্তর দিতে পারেন, তাহলে কবর হবে জান্নাতের বাগান। না হলে আজাব।
দুনিয়ায় যারা বেঁচে আছে, তারা জানে না কবে তাদের পালা আসবে। প্রত্যেকের জন্য একটা মৃত্যু আছে। সাকারাতুল মওত সবাইকে ভোগ করতে হবে। কেউ সহজে, কেউ কষ্টে। কিন্তু সবাইকে ফিরে আসতে হবে আল্লাহর কাছে।
হামিদ সাহেবের গল্প শেষ। কিন্তু আমাদের গল্প চলছে। প্রতিদিন আমরা মৃত্যুর কাছাকাছি হচ্ছি। একটু বেশি নামাজ পড়া, একটু বেশি তওবা করা, সন্তানদের ভালোবাসা, মানুষের হক আদায় করা – এটাই একমাত্র প্রস্তুতি।
কারণ মৃত্যু আসবে অবশ্যই। আর তার যন্ত্রণা ভোলা যায় না।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহজ মৃত্যু দান করুন এবং কবরের আজাব থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
(গল্পটি বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে লেখা। পড়তে প্রায় ৮-১২ মিনিট লাগবে সাধারণ গতিতে।)