Posts

গল্প

জীবন যুদ্ধের লড়াই

May 3, 2026

Md Josam

26
View

প্রিয় দর্শক, গল্প শুরু করার আগে আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করছি, আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আপনি সবসময় নতুন গল্প ও খবর পেতে পারেন! চলুন, তাহলে শুরু করা যাক আজকের গল্প!”

ইউটিউব চ্যা সাবস্ক্রাইব করুন, এবং 10 হাজার টাকা জিতুন, চ্যানেলের ভিডিও তে কমেন্ট করুন, আমরা 3 জন বিজয়ী বেছে নেব।

https://youtube.com/@mrtempestis-q7f?si=g3B45DE2WFSjYpOi

জীবনযুদ্ধের লড়াই
রাহাতের ছোট্ট জীবনটা যেন একটা অবিরাম কষ্টের নদী। গ্রামের সেই মাটির ঘরে জন্ম। বাবা মারা যাওয়ার পর মা আছিয়া বেগম একাই সব সামলাত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অন্যের বাড়িতে ঝি-গিরি, ধান ভানা, গরু-ছাগলের দেখাশোনা। রাহাত যখন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তখন তার পায়ে জুতো ছিল না। মা নিজের শাড়ির অংশ কেটে পাড় বানিয়ে দিয়েছিল।
স্কুলে প্রথম দিন অন্য বাচ্চারা নতুন ব্যাগ, নতুন বই, রঙিন জামা নিয়ে এসেছিল। রাহাতের হাতে পুরোনো খাতা আর একটা ভাঙা পেন্সিল। ছেলেরা তাকে “ভিখারি” বলে ডাকত। রাহাত চুপ করে ক্লাসে বসে থাকত। কিন্তু মাস্টার সাহেব, আব্দুল করিম স্যার, তাকে দেখে বলতেন, “রাহাত, তুই পড়। তোর মা যে কষ্ট করে তোকে পাঠিয়েছে, সেটা মনে রাখিস।” স্যার প্রায়ই নিজের পকেট থেকে খাতা-পেন্সিল দিতেন। শীতে যখন রাহাতের গায়ে গরম কাপড় থাকত না, স্যার তার ছেলের পুরোনো সোয়েটার দিয়ে দিয়েছিলেন।
ক্লাস ফাইভে উঠার পর রাহাতের আরেক বন্ধু হয়—সিয়াম। সিয়াম ধনী ঘরের ছেলে। তার বাবা শহরে ব্যবসা করত। সিয়াম রাহাতকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেত, খাওয়াত, বই দিত। “তুই চিন্তা করিস না রাহাত, আমরা একসাথে পড়ব।” কিন্তু সিয়ামের মা রাহাতকে দেখে নাক সিঁটকাতেন। “ওই গরিবের ছেলের সাথে মিশিস না।” সিয়াম তবু লুকিয়ে লুকিয়ে সাহায্য করত।
মাধ্যমিকের সময় কষ্ট আরও বেড়ে গেল। বাড়িতে খাবারের অভাব। মা অনেকদিন শুধু ভাত আর লঙ্কা খেয়ে থাকত, রাহাতকে ডিম কিনে খাওয়াত। রাহাত রাতে পড়তে বসলে মা তার পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করত। “বাবা, ঘুমা। আমি জেগে থাকি।” একবার বন্যায় ঘর ভেসে গেল। বই-খাতা সব নষ্ট। রাহাত কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে ধরল। মা চোখের জল মুছে বলল, “কাঁদিস না বাবা। আমি আবার জোগাড় করে দিব। তোর পড়াশোনা বন্ধ হতে দিব না।”
স্কুলের শিক্ষিকা নীলা আপা ছিলেন আরেক আশ্রয়। রাহাত যখন পরীক্ষায় প্রথম হয়, আপা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “তুই আমার গর্ব রাহাত। তোর মতো ছেলে দেখলে মনে হয় ঈশ্বর এখনো আছেন।” কিন্তু সেই আপাও একদিন বদলি হয়ে চলে গেলেন। নতুন শিক্ষক এসে গরিব ছেলেদের অবহেলা করতেন। রাহাতকে প্রায়ই বলতেন, “তোর মতো ছেলেরা পড়ে কী হবে? চাষবাস কর।”
কলেজে উঠার পর কষ্ট যেন আকাশছোঁয়া হলো। প্রতিদিন দশ কিলোমিটার হেঁটে বাস ধরা, বাসে ভিড়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া। কখনো টাকা না থাকায় বাসে উঠতে পারত না। পুরো রাস্তা হেঁটে কলেজে যেত। পায়ে ফোসকা পড়ত, রক্ত পড়ত, কিন্তু সে যেত। কলেজের অনেক ছেলে তাকে দেখে হাসত। “এই গ্রাম্য, জুতো কই?” রাহাত চুপ করে থাকত। শুধু সিয়াম তার পাশে ছিল। সিয়াম একবার নিজের নতুন জুতো জোর করে রাহাতকে পরিয়ে দিয়েছিল। “তোর পা দেখলে আমার বুক ফেটে যায় রে।”
একবার রাহাতের খুব জ্বর। পরীক্ষার আগের দিন। মা রাতভর তার কপালে পানি দিয়েছে, কিন্তু সকালে রাহাত উঠে বলল, “মা, আমি যাব।” পরীক্ষার হলে বসে তার চোখে অন্ধকার দেখছিল। কলম ধরতে পারছিল না। তবু লিখেছে। ফলাফল বের হলে প্রথম বিভাগ পেয়েছে। কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখে মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে—অতিরিক্ত পরিশ্রমে।
মা’র অসুখ বাড়তে লাগল। ডাক্তার বললেন, “ক্যান্সার। অনেক দেরি হয়ে গেছে।” রাহাত সব টিউশনির টাকা, যা জমিয়েছিল সব নিয়ে হাসপাতালে ছুটল। ক্লাস ফেল করল, বন্ধুরা এগিয়ে গেল। সিয়ামও শেষ পর্যন্ত বিদেশ চলে গেল। “ভাই, আমি টাকা পাঠাব।” কথা দিয়েছিল, কিন্তু প্রথম কয়েক মাস পাঠাল, তারপর যোগাযোগ কমে গেল। রাহাত একদম একা।
হাসপাতালের বেডে মা শুয়ে আছে। চুল উঠে গেছে, শরীর কঙ্কালসার। রাহাত মা’র হাত ধরে বসে থাকে। মা ক্ষীণ গলায় বলে, “বাবা, আমি তোকে অনেক কষ্ট দিলাম। তোর বিয়ে দেখতে পারব না, তোর সফলতা দেখতে পারব না। ক্ষমা করে দিস।” রাহাত ফুঁপিয়ে কেঁদে বলে, “মা, তুমি ছাড়া আমার কোনো সফলতা নেই। তুমি না থাকলে আমি কী করব মা?”
শেষ রাতে মা রাহাতের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “তুই পড়িস বাবা। আমি তোর চোখের ভেতরে থাকব।” তারপর চলে গেল।
রাহাত মা’র লাশ কাঁধে করে গ্রামে নিয়ে এল। কবরের পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁদল। “মা, তুমি চলে গেলে আমি কার জন্য লড়ব?” সিয়ামও আসেনি শেষ দেখতে। শুধু পুরোনো শিক্ষক আব্দুল করিম স্যার এসেছিলেন। স্যার রাহাতকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “বাবা, তোর মা চলে গেছে, কিন্তু তার স্বপ্ন তো যায়নি।”
আজও রাহাত পড়ে। রাতে মা’র পুরোনো শাড়ি জড়িয়ে ঘুমায়। চোখ বন্ধ করলে মা’র হাসিমুখ, স্যারের উৎসাহ, সিয়ামের সেই সাময়িক ভালোবাসা—সব মনে পড়ে। ছাত্র জীবন শুধু বইয়ের পাতা নয়। এটা মায়ের অশ্রু, শিক্ষকের স্নেহ, বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতা, আর নিজের অবিরাম লড়াইয়ের নাম।
যারা আজও এই কষ্টের পথে হাঁটছে, তাদের জন্য এই গল্প। চোখের জল মুছে আবার পড়তে বসো। কারণ তোমার মা-বাবা, তোমার শিক্ষকরা তোমার ভেতরে বেঁচে আছেন।
(

Comments

    Please login to post comment. Login