Posts

উপন্যাস

দশম শ্রেণীর জীবিত লাশ

May 3, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

23
View

প্রিয় দর্শক, গল্প শুরু করার আগে আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করছি, আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আপনি সবসময় নতুন গল্প ও খবর পেতে পারেন! চলুন, তাহলে শুরু করা যাক আজকের গল্প!”

ইউটিউব চ্যা সাবস্ক্রাইব করুন, এবং 10 হাজার টাকা জিতুন, চ্যানেলের ভিডিও তে কমেন্ট করুন, আমরা 3 জন বিজয়ী বেছে নেব।

https://youtube.com/@mrtempestis-q7f?si=g3B45DE2WFSjYpOi

দশম শ্রেণীর জীবিত লাশ
রাত দুটো বেজে গেছে। ঢাকার একটা ছোট্ট, ভাঙাচোরা টিনের ঘরে একটা ম্লান বাল্ব জ্বলছে। তার নিচে বসে আছে রাহাত। বয়স সতেরো। দশম শ্রেণির ছাত্র। না, ছিল। এখন আর স্কুলে যায় না। পরীক্ষায় ফেল করার পর থেকে তার জীবনটা একটা জীবিত লাশের মতো হয়ে গেছে।
রাহাতের চোখ দুটো ফোলা। কয়েকদিন ধরে ঘুম হয় না। তার মা, ছোট বোন আর বাবা—তিনজনের সংসার। বাবা রিকশা চালায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যে টাকা আনে, তাতে কোনোমতে চলে। কিন্তু রাহাতের জন্য আর কোনো সহানুভূতি নেই।
“তুই তো জীবিত লাশ! খাইয়া-দাইয়া ঘুমাইয়া বেড়াস, আর আমরা মরি!”—বাবার কথাগুলো প্রতিদিন কানে বাজে।
সকালে উঠেই রাহাতের মা বলে, “আর কতদিন এমন করে থাকবি? তোর বয়সী ছেলেরা দোকানে কাজ করে, গ্যারেজে শিখে, তুই শুধু বইয়ের পাতা উল্টাস আর ফেল করস। লজ্জা করে না?”
রাহাত চুপ করে থাকে। কী বলবে? সে তো চেষ্টা করেছিল। রাত জেগে পড়াশোনা করেছিল। কিন্তু গণিত আর ইংরেজিতে তার মাথা কাজ করত না। পরীক্ষার হলে বসে তার হাত কাঁপত। ফলাফল বের হওয়ার দিন সে ২.১৩ পেয়েছিল। ফেল।
সেই থেকে পাড়ার ছেলেরা তাকে দেখলেই হাসে। “এই ফেলু, কোন ক্লাসে ভর্তি হবি এবার?” “নাকি বিয়ে দিয়ে দিবি তোর বাবা?”
রাহাতের একটা স্বপ্ন ছিল। সে ডাক্তার হবে। ছোটবেলায় মায়ের অসুখ দেখে সেই স্বপ্ন জন্মেছিল। কিন্তু এখন সেই স্বপ্নটা তার বুকের ভিতর মরে পচে যাচ্ছে। প্রতিদিন সকালে সে বের হয় কাজের খোঁজে। দোকানে যায়, “ভাইয়া, কোনো কাজ আছে?”
“তোর তো পড়াশোনা নাই, কী কাজ করবি? যা, বাবার রিকশায় বস।”
কেউ কেউ দয়া করে দোকানে রাখে। দুইদিন পর বলে, “তোর তো হিসাব মেলে না, চলে যা।”
রাহাতের চোখে জল আসে, কিন্তু ফেলে না। বাড়ি ফিরে দেখে বোনটা পড়ছে। ছোট বোন রিয়া। সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। রাহাত রিয়াকে পড়ায়। কিন্তু রিয়াও একদিন বলে ফেলল, “দাদা, তুমি নিজেই ফেল করছ, আমাকে কী পড়াবা?”
সেই কথাটা রাহাতের বুকে ছুরি চালিয়ে দিয়েছিল। সে রাতে খায়নি। শুধু চুপ করে শুয়ে ছিল। তার শরীরটা যেন আর তার নয়। হাত-পা নড়ে, চোখ দেখে, কিন্তু ভিতরে কেউ নেই। জীবিত লাশ।
পাড়ার চাচা-চাচিরা বলে, “ওই ছেলেটা তো গুন্ডা-বদমাশ হবে। ফেল করা ছেলে তো এমনিই হয়।” কেউ বলে, “বিয়ে দিয়ে দাও, নইলে বাড়িতে বসে খাবে।” রাহাত শোনে, কিন্তু কিছু বলে না। তার গলা দিয়ে আর আওয়াজ বের হয় না।
একদিন সে একটা গ্যারেজে কাজ পেল। মোটরসাইকেল মেরামতের কাজ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রীস-তেল মাখা হাতে কাজ করে। শরীর ভেঙে পড়ে। কিন্তু মাইনে মাত্র তিন হাজার। বাবা বলল, “তিন হাজারে কী হয়? তোর খাওয়া-দাওয়া, জামা-কাপড়—সব তো আমার।”
রাহাতের মনে হয়, সে একটা বোঝা। পুরো পৃথিবীর কাছে অপয়া। রাতে সে ছাদে উঠে একা বসে থাকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “আল্লাহ, আমাকে নিয়ে নাও। আমি আর পারছি না।”
কিন্তু মরতেও পারে না। সাহস নেই। বোনটার কথা মনে পড়ে। মায়ের কথা মনে পড়ে। তাই শুধু বেঁচে থাকে। খায়, ঘুমায়, কাজ করে—কিন্তু ভিতরে মরে যায় প্রতিদিন।
দিনগুলো কাটে। বর্ষা আসে। রাহাতের জামা ভিজে যায়। জ্বর হয়। মা ওষুধ কিনতে পারে না। বাবা রাগ করে বলে, “অসুখ তো করবেই। শরীর তো খাটায় না, শুধু মাথা খাটায়।”
রাহাত চুপ করে ওষুধ খায়। জ্বরের ঘোরে স্বপ্ন দেখে—সে পাস করেছে, ডাক্তার হয়েছে, মাকে নতুন শাড়ি কিনে দিচ্ছে, বোনকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে। ঘুম ভাঙলে বাস্তবতা আরও বেশি কষ্ট দেয়।
একদিন পাড়ার একটা ছেলে, রবি—যে রাহাতের সাথে একই ক্লাসে পড়ত—এসে বলল, “শোন, আমার দোকানে লোক লাগবে। কিন্তু তোকে কেউ বিশ্বাস করে না। তুই তো চুরি-টুরি করবি।”
রাহাত কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ভাই, আমি চুরি করব না। বিশ্বাস কর।”
রবি হেসে চলে গেল।
সেই রাতে রাহাত আর সহ্য করতে পারল না। সে একটা চিঠি লিখল। মায়ের নামে। “মা, আমি তোমাদের বোঝা। আমি চলে যাচ্ছি। ক্ষমা করে দিও।” চিঠিটা লুকিয়ে রাখল।
পরদিন সকালে সে বের হলো। কোথায় যাবে জানে না। শুধু হাঁটছে। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। ক্লান্ত হয়ে একটা পার্কে বসল। সেখানে কয়েকটা ছেলে মদ খাচ্ছিল। তারা রাহাতকে দেখে ডাকল।
“এই, বস। খা।”
রাহাত প্রথমে না বলল। কিন্তু তারপর ভাবল—আর কী হবে? সে খেল। প্রথমবার। মাথা ঘুরতে লাগল। ছেলেগুলো হাসতে লাগল। তাদের একজন বলল, “তোর তো অনেক কষ্ট, দেখি তোর পকেটে কী আছে?”
রাহাতের পকেটে ছিল মাত্র পঞ্চাশ টাকা। তারা সেটা নিয়ে নিল। তারপর মারতে শুরু করল। “ফালতু ছেলে! বাড়ি থেকে পালাইয়া আইছস?”
রাহাত চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না। তারা লাথি মারল, ঘুষি মারল। একজন তার মাথায় ইট মারল। রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
রাহাতের চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে গেল। সে দেখল—মা হাসছে, বোন তার হাত ধরে আছে, বাবা তাকে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে। সে হাসল। শেষবারের মতো।
ছেলেগুলো ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল। রাহাত পড়ে রইল পার্কের কোণে। তার শরীর নড়ছে না। কিন্তু চোখ দুটো খোলা। বৃষ্টি পড়ছে। পানিতে তার রক্ত মিশে যাচ্ছে।
সকালে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করল। কেউ চিনতে পারল না প্রথমে। পরে পাড়ার লোক এসে বলল, “এ তো রাহাত। ওই ফেল করা ছেলেটা।”
বাড়িতে খবর গেল। মা অজ্ঞান হয়ে গেল। বাবা কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে পড়ে গেল। বোনটা শুধু বলল, “দাদা... দাদা তো আমাকে পড়াত...”
রাহাতের লাশটা যখন কবরে নামানো হচ্ছিল, তখন আকাশে মেঘ ডাকছিল। যেন স্বয়ং আল্লাহও কাঁদছেন।
কিন্তু রাহাত তো আর কষ্ট পায় না। তার শরীরটা মরেছে, কিন্তু তার আগেই তার আত্মা মরে গিয়েছিল। সে অনেক আগেই জীবিত লাশ হয়ে গিয়েছিল।
পৃথিবীটা চলতে থাকে। পাড়ার লোকেরা কয়েকদিন বলে, “খুব খারাপ ছেলে ছিল।” তারপর ভুলে যায়। শুধু একটা টিনের ঘরে একজন মা আর একটা ছোট মেয়ে প্রতিরাতে কাঁদে। আর একজন বাবা রিকশা চালাতে চালাতে চোখ মোছে।
রাহাতের গল্প শেষ।
কিন্তু এমন অনেক রাহাত এখনো বেঁচে আছে—জীবিত লাশ হয়ে।
তোমার চোখে যদি পানি এসে থাকে, তাহলে জেনো—রাহাতের কষ্টটা সত্যি। আমাদের সমাজে প্রতিদিন এমন কত ছেলে মরে যায়, ভিতরে ভিতরে।
জীবিত লাশ
—শেষ।

Comments

    Please login to post comment. Login