Posts

উপন্যাস

The Final Equation

May 3, 2026

Zihad Sheikh

Original Author জিহাদ শেখ

50
View

তৃতীয় অধ্যায়: ভগ্ন সমীকরণ

পরদিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিট, মিরপুর-১২ এর পুরনো বাসা

রোদ উঠেছে, কিন্তু মিরপুরের এই সরু গলিতে রোদ পৌঁছায় দুপুরে। বাসাটি তিনতলা—একদম সাধারণ, হলুদ রঙের পিলিং পড়া দেয়াল। নিচে একটি মুদি দোকান, উপরে দুই তলা ফাঁকা। বাইরের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। ফাইরুজ সাবধানে পা বাড়ালেন, সিঁড়িতে শ্যাওলা ধরে গেছে।

“এটাই ওই বাসা?” জেরিন প্রশ্ন করল। চোখে ঘুমের রেশ রয়েছে, কিন্তু সতর্কতা অটুট। রাতে খুব কম ঘুমিয়েছে—সে স্বীকার করবে না, তবে আরেফিন বুঝতে পেয়েছে।

“হ্যাঁ,” আরেফিন বলল, “ইমরান আহমেদের শেষ ঠিকানা। ধানমন্ডিরটা ভাড়া বাসা ছিল, এটা নিজের। মৃত্যুর পর কেউ আসেনি। আমি… আসতে চাইনি অনেক দিন।”

ফাইরুজ হালকা গলায় বললেন, “অতীতের কফিন খুলতে বাজে লাগে, আমি জানি। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে দরকার।”

তারা দ্বিতীয় তলায় পৌঁছাল। দরজায় মোটা তালা। আরেফিন ব্যাগ থেকে সরঞ্জাম বের করল, কিন্তু ফাইরুজ এগিয়ে এসে বললেন, “দাঁড়াও। আমার ছেলের শখের কাজ।” তিনি পকেট থেকে এক সেট লকপিক বের করলেন। ত্রিশ সেকেন্ডে তালা খুলে ফেললেন।

“চমৎকার। রিশাদকে জানাব যে বাবার দক্ষতা কাজে লাগল?” আরেফিন জিজ্ঞেস করল।

“ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। আর লকপিক শেখায় ও-ই আমাকে,” ফাইরুজ হাসলেন।

দরজা খুলতেই বেরোল ধুলো আর পুরনো কাগজের গন্ধ। ঘরটি ছোট। একপাশে ভাঙা বইয়ের আলমারি, মাঝখানে একটি ডেস্ক, দেয়ালে চকবোর্ড। চকবোর্ডে এখনো অর্ধসমাপ্ত একটি সমীকরণ, ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।

জেরিন ডেস্কের কাছে গেল। চোখ পড়ল একটি ফ্রেমবন্দি ছবির ওপর—যুবক আরেফিন (বয়স আনুমানিক সাত) তার বাবার সাথে দাঁড়িয়ে। বাবা এক হাতে চক, অন্য হাতে ছেলের কাঁধ। আরেফিনের মুখে তখন হাসি ছিল।

জেরিন ছবিটি তুলে আস্তে করে আরেফিনের দিকে বাড়াল। “তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে গর্বিত ছিলেন।”

আরেফিন ছবির দিকে তাকাল, তারপর মুখ ফিরিয়ে নিল। “আমরা এখানে এসেছি ফাইল খুঁজতে, স্মৃতির গুদাম ঘাটতে না।”

ফাইরুজ চোখ টিপে জেরিনকে ইশারা করলেন—ছেড়ে দাও এখন। জেরিন বুঝল। সে ছবি রেখে আলমারি খুলতে লাগল।

আলমারির ভেতর নানা জিনিস: পুরনো রিসার্চ পেপার, ক্যাসেট, একটি ল্যাপটপের ভাঙা অংশ, আর একটি লাল রঙের ডায়েরি। আরেফিন ডায়েরিটি নিল। প্রথম পৃষ্ঠাতেই লেখা: *“জেরিন সুলতানার কাছে—যদি আমি না থাকি”**। আরেফিন থমকে গেল, ডায়েরিটি জেরিনের দিকে বাড়াল।

“এটা আমার জন্য?” জেরিন অবাক। “তোমার বাবা আমাকে চিনতেন না। আমি তখন ছোট।”

আরেফিন বলল, “তিনি জানতেন... যে কেউ একদিন এই ফাইলগুলো উদ্ধার করবে। তুমি যখন অনুসন্ধান শুরু করলে, তখন আমার বাবার পুরনো সহকর্মীরা তোমার নাম জানত।” সে থামল। “তবে ডায়েরি পরে পড়ো। আগে হার্ডডিস্ক খুঁজি।”

জেরিন ডায়েরিটি সযত্নে ব্যাগে রাখল। পরে পড়ার কথা মনে মনে ট্যাগ করল।

আলমারির নিচের তাকে এক পুরনো টিনের বাক্স। আরেফিন সেটা খুলতেই কয়েকটি সিডি, একটি ইউএসবি ড্রাইভ আর একটি ভাঁজ করা কাগজ বেরোল। কাগজটিতে হাতের লেখা—ইমরান আহমেদের।

লেখাটি অসম্পূর্ণ:

“যে সূত্র মানুষকে শূন্য বিন্দুতে পৌঁছে দেয়, সেই সূত্রের নাম ‘প্রাইম নম্বর জেনারেটর’। আমি আবিষ্কার করেছি সব অপরাধীকে একটি নির্দিষ্ট প্রাইম সংখ্যার গুণিতকে সাজানো যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এই সূত্রের বিপরীত প্রয়োগ—নির্দোষ ব্যক্তিকেও অপরাধী বানাতে পারে।”

নিচে আরেকটি লাইন, দাগ কেটে দেওয়া: “আমার ছেলে আরেফিন, তুই যদি এই কাগজ পড়িস, তবে জেনে রাখিস—শূন্য বিন্দু শুধু গণিতে না, জীবনেরও অংশ।”

আরেফিন কাগজটি বারবার পড়ল। মুখে কোনো ভাব নেই, কিন্তু ডান হাতের আঙুল কাঁপছে। জেরিন তা দেখতে পেল। সে আরেফিনের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।

“আমি এখানে আছি। আর ফাইরুজ স্যার আছেন। আমরা একসঙ্গে মোকাবিলা করব।”

আরেফিন হাত সরিয়ে নিল। “আমার দরকার নেই। শুধু তথ্য চাই। চলো, ইউএসবি আর সিডি ল্যাবে নিয়ে যাই।”

ফাইরুজ মধ্যবয়সী লোকটির মতো ধৈর্য ধরে বললেন, “হ্যাঁ, যাই। তবে পথে এক জায়গায় থামতে হবে।”

“কোথায়?”

“আমার বাসায়। রিশাদ রেগে গেছে—‘বাবা, তোমার জন্য ম্যাথের একটি প্রবলেম সলভ করে রেখেছি।’ ওর ম্যাথের বই আমি বুঝি না, তুই বোঝাতে পারিস। পথের পাঁচ মিনিট সময় নেব।” 


বাবা ছেলের সম্পর্কটা বন্ধুর মত। মা না থাকায় ওসি ফায়রউজ তার ছেলেকে বন্ধুর মত করে গড়ে তুলেছেন।

জেরিন মুচকি হাসল। “আরেফিন গণিত বোঝাবে—সে তো অসম্ভব”

“তোমাদের ওসি সাহেবের কথায় রাজি,” আরেফিন বলল। “আমি শুধু দেখব ওর ছেলের সল্যুশন।”

ফাইরুজের বাসা: রিশাদ ও গাণিতিক সংযোগ

ফাইরুজের বাসা মিরপুরের একটি শান্ত রোডে। ওসি হওয়ার পরও তিনি সরল জীবনযাপন করেন। ঢুকতেই চিৎকার করে উঠল এক কিশোর—রিশাদ খান, বয়স ১৯-২০। পরনে টি-শার্ট, হাতে চকলেট-বিস্কুট। চোখ চকচক করছে।

“বাবা! তুমি তো বলেছিলে দুপুরে আসবে,” রিশাদ তারপর আরেফিন আর জেরিনকে দেখে একটু লজ্জা পেল।

“এই যে… তোমার আরেফিন ভাই আর জেরিন আপু। ওদের সাথে ছিলাম বলে-”

জেরিন হাত বাড়াল। “সাংবাদিক জেরিন। রিশাদ, তোমার বাবা অনেক তোমার কথা বলে। তুমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছো শুনলাম?”

“হ্যাঁ আপু। কিন্তু বাবার অফিসের কেস নিয়ে কিছু জানতে পারি?”

“পারিস না,” ফাইরুজ কড়া গলায় বললেন। “যা বলার আরেফিন ভাইকে বল।”

রিশাদ টেবিলে ছড়িয়ে থাকা কাগজের স্তূপ থেকে একটা খাতা বের করে আরেফিনকে দিল।

“ভাই, দেখেন। ক্লাসে প্রাইম নাম্বার (মৌলিক সংখ্যা) থিওরি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আমি বুঝলাম না—কীভাবে কোন প্রাইম সংখ্যা ‘সুপার প্রাইম’ (যার সূচক সংখ্যাও প্রাইম)? মানে ধরে নিলাম, ২ Superprime? কিন্তু ২-এর সূচক ১, ১ প্রাইম না। তাহলে কী নিয়ম?”

আরেফিন খাতাটি উল্টালো। রিশাদের চিন্তা কাঠামো কিছুটা এলোমেলো, কিন্তু ভিত্তি ভালো। সে চোখ বন্ধ করে সমীকরণ মনে মনে সাজাল।

 তারপর চোখ খুলে দ্রুত বলল, “দেখো, Superprime মানে শুধু প্রাইম নাম্বার যার পজিশনও প্রাইম। যেমন ৩—এটা তৃতীয় প্রাইম । ২, ৩, ৫—এখানে ৩ এর পজিশন ২, যা প্রাইম। সুতরাং ৩ Superprime। আবার ৫—পঞ্চম প্রাইম? ২,৩,৫,৭,১১—এখানে পঞ্চম প্রাইম ১১। ১১ প্রাইম, তাহলে ৫ ও Superprime? না। মনে হয় তুই পজিশন (index) আর ভ্যালু (value) গুলিয়ে ফেলেছিস।”

রিশাদ চোখ বড় করে শুনছিল।

আরেফিন একটি কাগজে লিখে দিল:


Superprime = pk, যেখানে k প্রাইম এবং pk নিজেও প্রাইম।
উদাহরণ: 
• p1=2 → 1 প্রাইম নয় → তাই ২ Superprime নয়
• p2=3 → 2 প্রাইম → তাই ৩ Superprime
• p3=5 → 3 প্রাইম → তাই ৫ Superprime 
• p5=11 → 5 প্রাইম → তাই ১১ Superprime

“তাইলে ২ কেন না, ভাই?”

“২-এর পজিশন প্রথমে অর্থাৎ ১, এবং ১ প্রাইম সংখ্যা না। তাই ২ Superprime না।” আরেফিন কাগজে লিখে বুঝাতে লাগল।

জেরিন পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল। এই আরেফিন—যে কিনা অফিসে সবার সাথে খাপ খায় না, বাজে ব্যবহার করে—ছেলেটিকে এত ধৈর্য ধরে বোঝাচ্ছে। তার মনের মধ্যে একটু টান পড়ল। ‘এই মানুষটা সত্যিই অন্যরকম।’

রিশাদ যখন “আচ্ছা! এখন বুঝেছি” বলে উঠল, ফাইরুজ গর্বিত মনে মাথা নাড়লেন। “বেটা, ওদের কাজে যেতে দে।”

রিশাদ আরেফিনকে জড়িয়ে ধরতে গেল, আরেফিন পিছিয়ে গেল। “না, দরকার নেই। তবে তুই যদি প্রাইম নাম্বার নিয়ে আরও জানতে চাস, আমার লাইব্রেরি থেকে বই নিতে পারিস।”

জেরিন হেসে রিশাদের কানে ফিসফিস করে বলল, “এটাই আরেফিনের ‘আবেগ’ দেখানোর উপায়। বই দান!”

রিশাদ হাসল।

বাইরে বেরিয়ে ফাইরুজ বললেন, “ছেলেটাকে বুঝিয়ে দেবার জন্য ধন্যবাদ। তোমার সময় নষ্ট করালাম?”

(চলবে)

Comments

    Please login to post comment. Login