Posts

চিন্তা

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি: কেমন হবে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক?

May 4, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

20
View

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে। ওখানে নির্বাচনী প্রচারণায় এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১০ টাকার ঝালমুড়ি খেয়েছিলেন। ওই ঝালমুড়িওয়ালার আশীর্বাদ চাওয়ালার খুব কাজে লেগেছে। আসলে মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে একঘেয়েমিতে ভুগছিল কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গবাসী। খসখসে গলায় সেই একই রাম্বা কম্বা ওপাং ঝপাং আর কাহাতক ভাল্লাগে? মোটের ওপর শুভেন্দুর বিজেপি এসে যে কলকাতার খুব বেশি কিছু বদলে দেবে এমন না। যেই লাউ সেই কদুই থাকবে। শুধু কেন্দ্রে মোদির ক্ষমতার ভিত আরেকটু পোক্ত হলো এবং বাংলাদেশেও ওদের মতো করে উগ্রবাদ খানিকটা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হলো -এই যা। 

কলকাতায় বিজেপি ফিরল বলে ক্ষমতাচ্যুত আ.লীগের কোনো লাভ হলো? এক কথায় উত্তর হলো না। হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সাথে সখ্যতা হবে ডানপন্থী জামায়াতের। ওই একই বাস্কেটে রেখে দেবে আ. লীগকে। বস্তুত নরেন্দ্র মোদির টার্গেট হলো শুভেন্দু অধিকারী ও বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত সিনিয়র বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীর মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সাথে আপনা স্বার্থে মিত্রতা করা। আমরা সেখান থেকে দেশের মানুষের জন্য ফায়দা তুলে নিতে পারব কি না -সেটি নির্ভর করবে আমাদের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও পারঙ্গমতার ওপর। 

কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আ. লীগকে অন্তত ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরতে। এবং ফেরাটা হবে আ. লীগ ও জামায়াত এলায়েন্স সমভিব্যাহারে। সেটি হবে বিএনপি যদি শাসনতান্ত্রিকভাবে বড় কোনো ভুলের বিপর্যয়ে পড়ে তার ওপর ভর করে। আর বিএনপি যদি অতীত আ.লীগের গণতন্ত্রবিরোধী কার্যক্রম থেকে শিক্ষা নিয়ে আইনানুগ সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখে, গণমনে স্বস্তি ফেরায় এবং একদিকে আমেরিকা-ভারত ও অপরদিকে চায়না -রাশিয়া বেল্ট ঠিক রাখতে পারে তবে বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে নামানো সহজ হবে না। 

এটা ভেবে নিলেও অত্যুক্তি হবে না যে, এই মুহূর্তে বিজেপির কাছে আ. লীগের আবেদন ফুরিয়েছে। সেটা ঘটেছে ২৪'র ৫ আগস্টের আগে থেকেই। তারা যেমন করে চাইছে ঠিক তেমনভাবেই ক্ষমতাচ্যুত দলের শীর্ষ নেতারা ভারতের আশ্রয়ে রয়েছে। তারা সেখানে স্বাধীনতা নিয়ে বসবাস করছে -এমনটা নাও হতে পারে। 

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর থেকে তারেক রহমান ক্ষমতায় আসীন হওয়া পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদির বিএনপির প্রতি যে কনসার্ন -সেটি অ্যানালিসিস করলে ক্লিয়ারলি অনুধাবন করা যায় বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে সানন্দে কাজ করতে আগ্রহী ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি। 

ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মূলত নির্ধারিত হয় দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিতে, শুধু কলকাতার রাজ্য সরকার দিয়ে খুব বেশি হেরফের হবে না। তবু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে -বিশেষ করে সীমান্ত, পানি ও জনমত–রাজনীতিতে। 

পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরায় বিজেপির উত্থান সীমান্ত রাজনীতিকে আরও “সিকিউরিটাইজড” করতে পারে। অবৈধ অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব (CAA-নাগরিক সংশোধন আইন -২০১৯/NRC-জাতীয় নাগরিকপঞ্জি), এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে কড়াকড়ি বাড়তে পারে। পশ্চিমবঙ্গ যদি সেই একই রাজনৈতিক লাইনে চলে, তাহলে স্থানীয় প্রশাসনও কঠোর অবস্থান নেবে -যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনে। 

পানি বণ্টন ইস্যু -বিশেষ করে তিস্তা নদীর ব্যাপারটিতে পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তিস্তা চুক্তি আটকে রেখেছিলেন রাজ্যস্বার্থের যুক্তিতে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে দুই ধরনের সম্ভাবনা আছে: একদিকে, কেন্দ্র-রাজ্য একই দলে হলে চুক্তি এগোনোর সুযোগ বাড়তে পারে; অন্যদিকে, বিজেপির নিজস্ব আঞ্চলিক রাজনীতি ও কৃষি-জলনীতি তিস্তা ইস্যুকে আরও জটিলও করতে পারে -এটা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। বাংলাদেশের 'টোন' বা ভাষা কেমন হবে সেটির ওপরও তিস্তা ইস্যুটি ঝুলে থাকতে পারে। 

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল নতুন জনমত ও রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনীতি অনেকাংশে পরিচয়ভিত্তিক (identity politics) -বিশেষ করে 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ' ইস্যুকে কেন্দ্র করে। ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বয়ান বাড়তে পারে, যা জনমনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটাও সত্য, কূটনৈতিক সম্পর্ক সাধারণত আবেগ নয়, বরং অর্থনীতি ও নিরাপত্তার বাস্তবতায় পরিচালিত হয়। 

ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য, ট্রানজিট, কানেক্টিভিটি -এসব প্রকল্পে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রবণতাই বেশি থাকে, যে দলই ক্ষমতায় থাকুক। ভারত এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি -দুই পক্ষই স্থিতিশীল সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চরম ভারত বিরোধিতা এইসময় কিছুটা শিথিল হওয়ায় দুই দেশের ভিসা ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের সময় ভারত বাংলাদেশকে চাহিদামাফিক ডিজেল সাপোর্ট দিয়েছে। 

তারপরও চূড়ান্ত বিচারে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আসলে কেমন হবে সে ব্যাপারে এই তথ্যটুকু সংযোজন করা যায়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার অনেকটা অংশ বেশ দুর্গম। এর কিছু অংশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। অবৈধ অভিবাসন ও চোরাচালান ঠেকাতে বাংলাদেশ সীমান্তে কুমির ও বিষাক্ত সাপ ছাড়ার মতো এক বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। মূলত নদীবেষ্টিত যেসব এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া কঠিন, সেখানেই প্রাকৃতিক পাহারাদার হিসেবে এসব প্রাণী ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। 

কল্পনা করতে পারেন -কোনো সভ্য সমাজে এমনটা করা সম্ভব? সেজন্যই নিবন্ধের শুরুতেই বলা হলো -মমতা ব্যানার্জি কিংবা শুভেন্দু অধিকারীতে আসলে সম্পর্কের দেয়ালে রক্তাক্ত গ্রাফিতি বদলাবে না। যেমনটা আছে তেমনই রবে। সম্পর্ককে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবার দায় দুই দেশের জনগণ ও সরকারের। 

লেখক: সাংবাদিক 
৪ মে ২০২৬
 

Comments

    Please login to post comment. Login