Posts

উপন্যাস

আলোর রাজকন্যা

May 4, 2026

Saima Islam

49
View

ঘন কুয়াশায় ঢাকা এক অজানা রাজ্য—নাম তার এলডোরিয়া। এই রাজ্যে সূর্য ওঠে, কিন্তু আলো পুরোপুরি ছড়ায় না। যেন অদৃশ্য কোনো অন্ধকার সবসময় আকাশে ভাসতে থাকে। মানুষজন ধীরে ধীরে ভুলে গেছে হাসতে, কারণ বহু বছর আগে “অন্ধকারের রাজা” নামে এক রহস্যময় শক্তি এই রাজ্যকে নিজের ছায়ায় ঢেকে ফেলেছে।
এই রাজ্যের এক ছোট্ট গ্রামে বাস করত একটি মেয়ে—নাম তার আরিবা। সে ছিল একেবারেই সাধারণ, কিন্তু তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক দীপ্তি। গ্রামের সবাই তাকে একটু আলাদা ভাবত। কারণ সে প্রায়ই এমন স্বপ্ন দেখত যেখানে আগুন, আলো আর এক বিশাল দরজা দেখা যেত।
এক রাতে, হঠাৎ ঝড় শুরু হলো। আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো, আর আরিবা স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে দেখল—তার ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত পাখি। পাখিটির শরীর নীল আগুনের মতো জ্বলছিল। সেটি কথা বলল—
“তুমি সেইজন… যে আলো ফিরিয়ে আনবে।”
আরিবা ভয় পেলেও অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল। সে জিজ্ঞেস করল, “আমি? আমি তো কিছুই পারি না!”
পাখিটি বলল, “তোমার ভেতরেই আছে সেই শক্তি। তুমি জানো না, কিন্তু সময় হয়ে গেছে জানার।”পরদিন সকালে, আরিবা সেই পাখির দেখানো পথ ধরে বেরিয়ে পড়ল। বন, পাহাড়, নদী—সব পেরিয়ে সে পৌঁছাল এক পুরনো ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গে। সেখানে সে দেখা পেল এক বৃদ্ধ জাদুকরের।
জাদুকর তাকে দেখে বলল, “আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
আরিবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি জানতেন আমি আসব?”
জাদুকর ধীরে মাথা নাড়লেন। “তোমার জন্মের দিন থেকেই জানা ছিল। তুমি ‘আলো-ধারক’। অন্ধকারের রাজাকে হারানোর একমাত্র আশা।”
এরপর শুরু হলো তার প্রশিক্ষণ। আগুন নিয়ন্ত্রণ, আলো সৃষ্টি, নিজের ভয়ের সঙ্গে লড়াই—সবই শিখতে লাগল আরিবা। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন ছিল নিজের ভেতরের সন্দেহকে জয় করা।
একদিন, জাদুকর তাকে একটি আয়না দেখালেন। সেই আয়নায় আরিবা নিজেকে দেখল—কিন্তু তার পেছনে ছিল এক বিশাল অন্ধকার ছায়া।
“এটাই তোমার শত্রু,” জাদুকর বললেন, “শুধু বাইরে নয়, তোমার ভেতরেও।”অনেকদিনের প্রস্তুতির পর, আরিবা যাত্রা শুরু করল অন্ধকারের রাজার দুর্গের দিকে। পথ সহজ ছিল না। ছায়ার প্রাণী, বিভ্রম, ভয়—সবকিছু তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু সে থামেনি।
অবশেষে সে পৌঁছাল সেই বিশাল দরজার সামনে—যেটা সে স্বপ্নে দেখত। দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতরে অন্ধকার এত ঘন ছিল যে শ্বাস নেওয়াও কঠিন। আর সেই অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল “অন্ধকারের রাজা”—এক বিশাল ছায়াময় অবয়ব।
“তুমি এসেছ,” গভীর কণ্ঠে বলল সে, “কিন্তু তুমি জিততে পারবে না।”
আরিবা কাঁপছিল, কিন্তু সে থামেনি। সে চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরের আলো খুঁজতে লাগল। তার মনে পড়ল তার গ্রাম, তার মানুষ, তাদের হারিয়ে যাওয়া হাসি।
হঠাৎ তার শরীর থেকে আলো বের হতে শুরু করল—প্রথমে ক্ষীণ, তারপর ধীরে ধীরে উজ্জ্বল। অন্ধকার পিছু হটতে লাগল।
অন্ধকারের রাজা চিৎকার করল, “এটা অসম্ভব!”আরিবা চোখ খুলে বলল, “অন্ধকার কখনো আলোকে হারাতে পারে না।”
এক প্রবল আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ছায়া ভেঙে গেল। অন্ধকার মিলিয়ে যেতে লাগল।
সব শেষ হলে, আরিবা দেখল—আকাশ পরিষ্কার। বহু বছর পর প্রথমবার সূর্যের আলো পুরো রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
মানুষজন আবার হাসতে শুরু করল। ফুল ফুটল, পাখিরা গান গাইল।
আরিবা আর সেই সাধারণ মেয়ে নয়। সে এখন এক নায়িকা—যে নিজের ভয়কে জয় করে পুরো এক রাজ্যকে মুক্ত করেছে।
কিন্তু সে জানত—এই যাত্রা শেষ নয়। কারণ আলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে, তাকে সবসময় শক্ত থাকতে হবে।
আর সেই নীল আগুনের পাখি, দূরে আকাশে উড়তে উড়তে শুধু একটা কথা বলল—
“এটা শুধু শুরু…”

Comments

    Please login to post comment. Login