Posts

নন ফিকশন

ক্ষুধার্ত প্রবাসী

May 6, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

31
View

প্রিয় দর্শক, গল্প শুরু করার আগে আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করছি, আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আপনি সবসময় নতুন গল্প ও খবর পেতে পারেন! চলুন, তাহলে শুরু করা যাক আজকের গল্প!”

ইউটিউব চ্যা সাবস্ক্রাইব করুন, এবং 10 হাজার টাকা জিতুন, চ্যানেলের ভিডিও তে কমেন্ট করুন, আমরা 3 জন বিজয়ী বেছে নেব।

https://youtube.com/@mrtempestis-q7f?si=g3B45DE2WFSjYpOi

ক্ষুদার্ত প্রবাসী
রহিম মিয়া গ্রামের বাড়ির উঠানে বসে ছিল। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। তার তিন বিঘা জমি—যেখানে সে ছোটবেলা থেকে ধান চাষ করেছে, আম-কাঁঠালের গাছ লাগিয়েছে—সবই বিক্রি হয়ে গেছে। এজেন্টের লোক এসে বলেছিল, “কুয়েতে ভালো চাকরি। মাসে কমপক্ষে ৭০-৮০ হাজার টাকা। খাওয়া-থাকা ফ্রি। দু-তিন বছরে সব লোন শোধ করে নতুন বাড়ি বানাতে পারবেন।”
রহিমের বাবা আব্দুল মজিদ, বয়স ষাটের ওপর, হার্টের রোগী। তিনি কাঁপা গলায় বলেছিলেন, “বাবা, বিদেশ যাওয়া ঠিক হবে তো? আমরা বুড়ো-বুড়ি, তোর মা চোখে কম দেখে। রেহানা একা সব সামলাবে কী করে?” মা ফাতেমা বেগম চোখের পানি মুছে বলেছিলেন, “খোকা, সাবধানে যাস। টাকা পয়সা সব দিয়ে যাস না। কিছু রেখে যা।”
রেহানা, রহিমের বউ, দুই সন্তান রিয়াদ (১০) আর রিয়া (৭) নিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। রিয়াদ বাবার গলা জড়িয়ে বলেছিল, “বাবা, তুমি তাড়াতাড়ি আসিও। আমাকে নতুন সাইকেল কিনে দিও।” রিয়া ছোট্ট হাতে বাবার আঙুল ধরে বলেছিল, “বাবা, আমার জন্য লাল ফ্রক আনিও।” রহিম চোখ মুছে বলেছিল, “তোরা চিন্তা করিস না। বাবা সব ঠিক করে দিয়ে আসবে।”
সাড়ে চার লাখ টাকা জোগাড় করতে জমি, গরু, ছাগল, সোনার গয়না—সব বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। ধার করা হয়েছিল আরও এক লাখ। রহিম ঢাকায় গিয়ে এজেন্টের অফিসে ভিসা, টিকিট সব করে কুয়েতের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। এয়ারপোর্টে রেহানা আর বাচ্চারা শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরেছিল।
কুয়েতের বিমানবন্দরে পা রেখেই রহিমের স্বপ্ন ভেঙে যেতে শুরু করল। এজেন্টের লোক এসে বলল, “ভাই, আপনার ভিসা কনস্ট্রাকশনের জন্য, কিন্তু কোম্পানি এখন লোক নিচ্ছে না। দুই মাস অপেক্ষা করতে হবে। এখানে ক্যাম্পে থাকুন।” প্রথম মাসে খাওয়া দিলেও দ্বিতীয় মাস থেকে সব বন্ধ। রহিমের সাথে নিয়ে যাওয়া টাকা শেষ হয়ে গেল। এজেন্টের ফোন বন্ধ। কোম্পানির অফিসে গেলে বলে, “টাকা দাও, নইলে পুলিশে দেব। তোমার পাসপোর্ট আমাদের কাছে।”
তিন মাস পর কোনোমতে একটা ছোট কাজ পেল রহিম। কিন্তু মাইনে মাত্র ৫০ দিনার। সেটাও তিন মাস পর পেল। ততদিনে সে রাস্তায়। কোনো থাকার জায়গা নেই। একটা পার্কের বেঞ্চে, মসজিদের বাইরে, কখনো পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের নিচে ঘুমাত। কুয়েতের গরমে দিনে ৪৫-৫০ ডিগ্রি, রাতে শীত লাগে। বৃষ্টি এলে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে রাত কাটাত।
রাস্তার প্রথম কষ্ট
প্রথম যেদিন খেতে না পেয়ে দুই দিন কাটল, সেদিন রহিম একটা বাংলাদেশি দোকানের সামনে বসে ভিক্ষা চেয়েছিল। দোকানদার বলল, “ভাই, আমরাও কষ্টে আছি।” রাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল। পুলিশ এসে ধরল। তিন দিন জেল। জেল থেকে বেরিয়ে শরীর আরও দুর্বল। কোনো কাজ পেলে একদিন-দুইদিন করে, তারপর “তোমার কাগজ নেই” বলে তাড়িয়ে দেয়। পা কেটে গেলে ওষুধ কিনতে পারে না। ঘা শুকায় না।
একদিন সাইটে কাজ পেয়েছিল। সারাদিন ইট বয়ে শরীর ভেঙে গেল। বিকেলে বস বলল, “আজকের টাকা কাল দিব।” পরদিন আর কাজে ডাকল না। রহিমের পকেটে দুই দিনারও নেই। পেটের ক্ষুধায় পেট চুপসে গেছে। সে একটা ডাস্টবিন থেকে খাবারের অবশিষ্ট কুড়িয়ে খেয়েছিল। সেই রাতে জ্বর এল। কাঁপতে কাঁপতে একটা মসজিদের সামনে শুয়ে রইল।
দেশে পরিবারের ধ্বংস
গ্রামে রেহানা এখন শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে। জমি নেই, আয় নেই। রেহানা অন্যের বাড়িতে ঘর ঝাড়ু দেয়, বাসন মাজে, ধান ভানে। দিনে ১৫০-২০০ টাকা পায়। সেটা দিয়ে চারজনের খাবার চলে না। অনেক দিন শুধু ভাত আর লবণ-পানি। রিয়াদ স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। সে এখন গ্রামের চায়ের দোকানে কাজ করে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চা বানায়, বাসন ধোয়। তার ছোট হাতে কড়া পড়ে গেছে। রিয়া অপুষ্টিতে ফুলে গেছে, চোখ বসে গেছে। প্রায়ই জ্বর হয়। ওষুধ কেনার টাকা নেই।
রহিমের বাবা আব্দুল মজিদের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেনি রেহানা। গ্রামের ডাক্তার এসে বলল, “টাকা লাগবে।” শেষে ধার করে ওষুধ কিনল। মা ফাতেমা চোখের ছানি নিয়ে বসে থাকে। বলে, “আমার খোকাটা কোথায়? ও কি খায়?” প্রতিবেশীরা কথা বলে, “রহিম বিদেশে গিয়ে বিয়ে করেছে নাকি? বউকে না খাইয়ে মারছে।” কেউ কেউ রেহানাকে বলে, “আরেকটা বিয়ে করো, নইলে কীভাবে চলবে?”
রেহানা রাতে একা বসে রহিমের পুরনো জামা জড়িয়ে কাঁদে। বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলে বলে, “আল্লাহ, আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দাও। আমরা আর পারছি না।”
ফোনের যন্ত্রণা
রহিম কখনো কখনো দোকান থেকে ফোন চার্জ করে কল করে।
রেহানা: “রহিম, আজ রিয়ার জ্বর ১০৩। ওষুধ কিনতে পারিনি। বাবার অবস্থা খুব খারাপ। তুমি কোথায় আছো? টাকা পাঠাও।”
রহিম গলা কাঁপিয়ে: “রেহানা, আমি রাস্তায় শুই। খাইতে পাই না। কাজ নাই। পাসপোর্ট আটকা। আমি নিজেই মরছি। তুমরা কীভাবে আছো?”
রেহানা চিৎকার করে কাঁদে: “তাহলে ফিরে আয়! আমরা সবাই মিলে না খেয়ে মরব। বাবা-মা তোর জন্য অপেক্ষা করে মরছে।”
একদিন রহিমের মা ফোনে বললেন, “খোকা, আমি আর বাঁচব না। তোর বাবা চলে গেলে আমি কী করব? তুই ফিরে আয়।” রহিম ফোন কেটে দিয়ে রাস্তায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁদল।
আরও গভীর সংকট
এক শীতের রাতে রহিম একটা নির্জন রাস্তায় শুয়ে ছিল। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে থামল। কয়েকজন লোক নেমে তাকে মারধর করে টাকা চাইল। যা ছিল—কয়েক দিনার—সব নিয়ে গেল। শরীরে রক্ত জমাট বেঁধে গেল। পরদিন সকালে উঠতে পারল না। এক বাংলাদেশি ভাই কামাল তাকে দেখে একটা অস্থায়ী ক্যাম্পে নিয়ে গেল। সেখানে আরও ১০-১২ জন রানওয়ে প্রবাসী। সবার গল্প এক: জমি বিক্রি, প্রতারণা, রাস্তায় জীবন।
কামাল বলল, “ভাই, অনেকে এখানে মারা যায়। কেউ দেশে ফিরতে পারে না। পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়।” রহিম সেখানে কয়েকদিন থেকে আবার কাজ খুঁজতে বের হলো। কিন্তু শরীর আর সাড়া দেয় না। পা ফুলে গেছে, জ্বর লেগেই আছে।
দেশে তার বাবা মারা গেলেন। খবর পেয়ে রহিম পাগলের মতো হয়ে গেল। কোনো টাকা পাঠাতে পারল না কাফনের জন্যও। মা ফোনে শুধু কাঁদল। রেহানা বলল, “রহিম, তোমার বাবা চলে গেছে। তুমি ফিরে এসো। নইলে আমরাও একে একে চলে যাব।”
একাকীত্ব ও আশার আলো
রহিম এখনো কুয়েতের রাস্তায় ঘুরে। কখনো দোকানে সাহায্য করে দুটো রুটি পায়, কখনো না খেয়ে থাকে। সে প্রায়ই গ্রামের কথা ভাবে—পুকুরপাড়, আমগাছ, বাচ্চাদের হাসি। চোখ বন্ধ করলেই রেহানার কান্না, মায়ের দোয়া, বাবার শেষ কথা ভেসে ওঠে।
সে জানে, তার জীবন আর ফিরবে না আগের মতো। জমি নেই, টাকা নেই, শরীর নেই, সম্মান নেই। তবু সে বেঁচে আছে। কারণ বাচ্চাদের মুখ মনে পড়লে লাফ দিতে পারে না। প্রতি রাতে সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, “হয় আমাকে ফিরিয়ে দাও, নয়তো সবাইকে শান্তিতে মৃত্যু দাও।”
এটাই বাস্তবের কঠিন ছবি। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ এমন স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ যায়। কেউ ফিরে আসে ধনী হয়ে, কিন্তু হাজার হাজার রহিম রাস্তায়, জেলে, অজানা কবরে শেষ হয়। পরিবারগুলো ধ্বংস হয়। সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়। মা-বাবা চোখের জলে ভাসে।
রহিম আজও কুয়েতের কোনো এক রাস্তায় বসে আছে। চোখে শুধু ক্ষুধা, হতাশা আর অপূর্ণ স্বপ্ন। তার গল্প এখনো শেষ হয়নি।
সমাপ্ত

Comments

    Please login to post comment. Login