Posts

গল্প

শেষ রাগ, নতুন শুরু

May 6, 2026

Zinnat ara Begum

Original Author Zinnat Ara Begum

15
View

নদীর ধারে একটা ছোট, শান্ত হোটেল। সন্ধ্যার নরম আলো ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। 

বাতাসে হালকা শীতলতা, নদীর ঢেউয়ের মৃদু শব্দ যেন চারপাশকে আরও নিঃশব্দ করে তুলেছে।

সেই নীরবতার মাঝেই পাশাপাশি বসে আছে আরিয়ান আর তানিয়া। একসময় যারা একে অপর ছাড়া কিছুই ভাবতে পারতো না, আজ তারা দুজনেই চুপ। যেন অনেক কথা আছে, কিন্তু কেউ বলছে না।


তানিয়া হঠাৎ ধীরে বলে উঠল,
“তুমি এখন আর আগের মতো নেই…”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“সবসময় একই থাকা যায় না…”


এই ছোট্ট কথাটাই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।


তানিয়ার চোখে পানি জমে উঠল।
“মানে? তুমি বদলে গেছো… তুমি আর আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না,” সে কাঁপা গলায় বলল।
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে তাকাল,


তুমিও তো আগের মতো বুঝো না আমাকে!”
কথা থেকে কথা বাড়তে লাগল।


অভিমান, অভিযোগ—সবকিছু একসাথে বেরিয়ে আসতে লাগল।


“তুমি এখন আমার সাথে সময় কাটাতে চাও না!”
“আমি ব্যস্ত! সবসময় তোমার মতো ফ্রি না!”
এই তর্ক একসময় এমন জায়গায় পৌঁছালো, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।


তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ঠিক আছে… আজ থেকেই সব শেষ!”
আরিয়ানও রাগে বলল,
“হ্যাঁ, শেষই ভালো!”


এই এক মুহূর্তের রাগ… তাদের সম্পর্ককে ভেঙে দিল।
দুজনেই উঠে চলে গেল।


কিন্তু কেউ জানত না—এই চলে যাওয়াটা কতটা ভয়ংকর হতে চলেছে।


তানিয়া একা নদীর ধারে এসে দাঁড়াল। চারপাশ নিঃশব্দ। শুধু তার ভেতরের ঝড়টা থামছে না।
সে ভাবতে লাগল—


“আমি ছাড়া ও ভালো থাকবে… আমি শুধু বোঝা…”
তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা।


“আমার আর থাকার কোনো মানে নেই…” সে ফিসফিস করে বলল।


একটা মুহূর্ত…
একটা ভুল সিদ্ধান্ত…


হঠাৎ করেই সে নদীর দিকে এগিয়ে গেল, আর কিছু না ভেবেই পানিতে ঝাঁপ দিল।


পানির ঠান্ডা স্পর্শে সবকিছু থেমে গেল—শব্দ, চিন্তা, অনুভূতি…
ওদিকে আরিয়ান হাঁটছিল। কিন্তু তার মনটা অদ্ভুতভাবে অস্থির লাগছিল।
হঠাৎ সে পেছনে তাকাল—মনে হলো কিছু একটা ঠিক নেই।


ঠিক তখনই সে পানির শব্দ শুনল।
“তানিয়া!!!” চিৎকার করে উঠল সে।


এক সেকেন্ডও দেরি না করে সে নদীতে ঝাঁপ দিল।
পানির নিচে অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
তবুও সে খুঁজে যাচ্ছে… শুধু একটাই চিন্তা—তানিয়াকে বাঁচাতে হবে।


কিছুক্ষণ পরে সে তানিয়ার হাতটা অনুভব করল।
সে শক্ত করে তাকে ধরে উপরে উঠতে লাগল।
কষ্ট করে, নিজের সব শক্তি দিয়ে, সে তাকে নদীর পাড়ে তুলে আনল।


তানিয়া অজ্ঞান… নিঃশ্বাস খুব দুর্বল।
আরিয়ান কাঁপতে কাঁপতে বলল,


“তুমি এটা কেন করলে!?


তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, কণ্ঠ কাঁপছে।
কিছুক্ষণ পরে তানিয়া ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
দুর্বল গলায় বলল,


“তুমি তো আর আমাকে চাও না…”
এই কথাটা শুনে আরিয়ান যেন ভেঙে পড়ল।
“কে বলেছে!? আমি শুধু রাগ করেছিলাম…
কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই না…”
তার গলায় সত্যিকারের ভয় আর ভালোবাসা মিশে ছিল।


তানিয়ার চোখে আবার পানি এল।
“আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম… তোমাকে হারানোর…”
আরিয়ান তার হাতটা ধরে বলল,


শোনো… রাগ মানে শেষ না  .... 


ভালোবাসা মানে শুধু ভালো সময় না…
খারাপ সময়েও পাশে থাকা…”
“আমি আছি… আর সবসময় থাকবো…”
এই কথাগুলো শুনে তানিয়া কাঁদতে কাঁদতে তাকে জড়িয়ে ধরল।


সেই রাতটা তাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিল—
রাগ, অভিমান… এগুলো সম্পর্কের শেষ না,
বরং বুঝে নেওয়ার একটা সুযোগ।


পরদিন সকালে, সূর্যের আলো আবার নদীর জলে পড়ল।
সবকিছু নতুন করে শুরু হওয়ার মতো লাগছিল।
আরিয়ান আর তানিয়া আবার সেই হোটেলে বসে আছে।


কিন্তু আজ তাদের চোখে কোনো রাগ নেই—
আছে শুধু শান্তি আর ভালোবাসা।
তারা একে অপরের হাত ধরে আছে…
যেন এবার আর কেউ কাউকে ছাড়বে না।
কারণ তারা বুঝে গেছে—
ভালোবাসা কখনো হারায় না…
যদি দুজনই ধরে রাখতে চায়।

Comments

    Please login to post comment. Login