Story

বার্গার

May 8, 2026

268 views

সিকদার সাহেব সকালে নাস্তার টেবিলে বসেছেন। বিলেতি ডিগ্রিধারী ডক্টরেট আজকাল খুব স্বাভাবিক বিষয় হালেও ৮৪ বছর বয়সের ডক্টর সিকদার চৌধুরি এ দেশে যখন পিএইচডি অর্জন করে ফিরেছেন তখন কার বাস্তবতায় তা ছিল গৌরবের। তৎকালীন সমাজে সুশিক্ষিত বা শিক্ষিত গোয়ারের সংখ্যা বা দাপট এখনকার মতো মোটেই ছিল না। এদেশে শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা সে সময় ভঙ্গুর থাকলেও সমাজে দুই শ্রেণির মানুষ ছিল বেশি, এক  স্বশিক্ষিত আর আরেক সুশিক্ষিত।  সে যাইহোক নাস্তার টেবিলের দিকে ঠান্ডা কিন্তু কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে তিনি যা যা দেখলেন সেটা অনেকটা এরকম : নাস্তার আজকের মেনু হচ্ছে টোস্ট পাউরুটি (ব্রাউন ব্রেড) এবং মার্জারিন,  কমলার জুস, স্ক্রিমবেল এগ, আপেল, কোলা ও পেঁপে।  সব শেষে তার জন্য বিশেষ যত্ন করে কড়া ব্লেক টি এবং বাকিদের জন্য হট কফি।

এই শেষ বয়সে এসে তিনি জীবনে প্রায় সবকিছুই পেয়েছেন এমনটা বলা হলে ভুল হবে, অ্যাকাডেমিক জীবনে প্রচণ্ড সফল হলেও নিজ পারিবারিক জীবনে তাঁর কিঞ্চিৎ আক্ষেপ রয়ে গেছে। তাঁর দুই ছেলে আর এক মেয়ে। ছোট ছেলে ব্যাংকিং সেক্টরে বেশ নাম করেছে, ছোট মেয়ে রীতিমতো বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট কিন্তু তাঁর সব চিন্তা তার বড়ো ছেলেকে নিয়ে। ভাইবোনদের মধ্যে সবথেকে মেধাবী ইয়ামিন নাসার চাকরি ছেড়ে ঠিক তাঁর মতোই দেশে ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু দেশে ফিরে বাবার মতো নিজ পেশায় মনোযোগ না দিয়ে ট্রেক বদলিয়ে ইদানীং গানবাজনা আর বই লেখা নিয়ে নিজ ঘরে ডুব দিয়েছে। তার নিজের এরকম একটা ধারণা যে তার ছেলে সম্ভবত নেশা করছে কেননা সেটা না করলে কখনোই নাসার মতন অবস্থা সম্পূর্ণ চাকরি ছেড়ে দেশে এসে কেউ কি আর এসব হাবিজাবি নিয়ে মনোনিবেশ করে আজকাল!

আজকের পত্রিকার পৃষ্ঠা আনমনে উল্টোতে উল্টোতে তিনি এসবই ভাবছিলেন। অপেক্ষা তার কফি আসার। অপেক্ষার ফাঁকে ফাঁকে আমরা নিজেদের উপেক্ষা করার ক্ষমতার ধার পরীক্ষা করি ~ নিজেই নিজের চিন্তা অথবা দুশ্চিন্তা গুলো উপেক্ষা করেই মানুষ আনমনে ভাবতে পারে। অপেক্ষার আপেক্ষিক মুহূর্তে আমাদের ভাবনাগুলি আমাদের ভাবায়। ভাবার মাঝে হঠাৎ সম্রাট এসে উপস্থিত …  

খালু, আপনের লাইগ্গা কফি/বি আনছি ~ ধ্বনিটাতে আবেগের কোনো বাহুল্য টের না পেলেও তিনি স্পষ্ট নির্লিপ্ততার আমেজ দেখে বেশ অবাক হলেন। এইটুকু ছেলেটার মাঝে এত অল্প বয়সে এরকম নিষ্প্রাণ বিজ্ঞ ভঙ্গি সত্যি চমকপ্রদ এবং নিঃসন্দেহে শ্রষ্টার অবদান ছাড়া আর কীইবা হতে পারে সেটা ভাববার বিষয়।  

তিনি বললেন,

 - সম্রাট, তুই পড়াশোনা করিস ? 
 - জে খালু ,অ আ লিখবার পারি 
 - আর কি কি প্যারিশ তুই ? 
 - খালু আপনার কবি/ফি ঠান্ডা হওয়ান ধরসে, আমি জাইগা, খালাম্মায়ে বকোন দিবো দেরি হইলে, বড়ো বাইরেও ডাকওন লাগবো, ভাইয়ে কাইল রাইতেও খাইসেন


অনেকটাই ইচ্ছার বিপরীতে গিয়েই সিকদার সাহেব কেবলই মাথা দুলাল। তিনি অনেক দিন পর খামখেয়ালি অনেক কিছু চিন্তা করে নিলেন কিন্তু মাথা দুলিয়ে হাঁ বললেন নাকি না বললেন সেটা তিনি সেভাবে খেয়াল করলেন না। এক নাস্তার টেবিলে বসে এখন তার খুব বিরক্ত লাগছে, সাফকাতকে নিয়ে কি করা যায় সেটা তাকে ভাবতে হবে।  এভাবে এতো মেধাবী মানুষ এত সহজে নিজের লাইফ নিয়ে হেলাফেলা করবে তা কি করে হতে দেয়া যায়?

তার বড় ছেলের থেকে সম্রাটকে তার বেশি বুদ্ধিমান মনে হলো। নাস্তার টেবিলে আধঘণ্টা বসে থেকে তিনি নিজ ঘরে ফায়ার গেলেন। রান্না ঘরের পাশের বারান্দায় তিনি খেয়াল করে দেখলেন ময়লার ডাস্টবিনের পাশের দেয়ালে একটা ছবি এঁকেছে কেউ… ছবিটা দিনের বেলার ল্যান্ডস্কেপ।  আকাশে দিব্যি সূর্য উঠেছে দূরে পাহাড়ের মতো কিছু বাড়িঘর, একটা তাল গাছ আর তার নীচে একটা ছেলে বসে আছে, সম্ভবত ছেলেটি কিছু খাচ্ছে। একটা আধখাওয়া বার্গার।

সাফকাত গতরাতে যেই বার্গারটা সকাল পর্যন্ত না খেয়ে ফেলে রেখেছে এটা সেই বার্গার। 


সিকদার সাহেবের অনেক দিন আগের দেখা একটা স্বপ্নের কথা মনে পড়লো। তখন তিনি নিজ গ্রামে প্রতিদিন দুপুরে খাবার দাবার শেষে ভরপেটে  পীঠ পোড়া রোদের তাপ উপেক্ষা করে গ্রামের শেষ দিকে নদীর পারে বড় বুড়া গাছটার নীচে এক বসে বসে আপন মনেই হরেক রকমের স্বপ্ন দেখতো। কত অদ্ভুত অদ্ভুত বিষয় নিয়ে ভাবতো, কবে কখন কেন কি করবে সেসবের কত্তকিছু ভেবে ভেবে ঠিক করতো। সেসব স্বপ্নের প্রায় সবটুকুই তিনি বাস্তব জীবনে করতে পেরেছেন। সাফল্য নিজে থেকেই তার কাছে এসেছে আপন গীতিতে। তাঁর পেট ভরা স্বপ্ন দেখার বাস্তবতা সকলের জন্য সমান ভাবে এসে পৌঁছায় না হয়ত, প্রকৃতি এখানে কেমন অদ্ভুত বৈষম্য করেছে, কিন্তু তাঁর কি প্রকৃতির কাছে এই প্রশ্ন করার অধিকার আছে ?

সম্রাটের নির্লিপ্ত শীতল চোখের বিজ্ঞ ভাবের বহিঃপ্রকাশ কি শুধু একটা আধখাওয়া বার্গার দিয়ে অভিজ্ঞতার ক্ষুধা মেটাতে পারবে ? পারবেকী সম্রাটকে সত্যি করে সম্রাট করে গড়ে তুলতে ?

প্রশ্নগুলোই আমাদের উত্তরগুলো বলে দে, দিয়েছে এবং হয়তোবা উত্তর দিতে থাকবে, বাদবাকি কাজটা শুনতে পাড়ার কাজ।

কবির সুমনের গানের কথা তাঁর মনে পড়লো:-  

কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়
কতটা পথ পেরোলে পাখি জিরোবে তার দায়
কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়
প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা।।


কত বছর পাহাড় বাঁচে ভেঙ্গে যাবার আগে
কত বছর মানুষ বাঁচে পায়ে শিকল পড়ে
ক’বার তুমি অন্ধ সেজে থাকার অনুরাগে
বলবে তুমি দেখছিলে না তেমন ভালো করে।।


কত হাজার বারের পর আকাশ দেখা যাবে
কতটা কান পাতলে পরে কান্না শোনা যাবে
কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে,
বড্ড বেশী মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে ।।

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login