Posts

গল্প

অপূর্ণ পরিবার

May 8, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

22
View

প্রিয় দর্শক, গল্প শুরু করার আগে আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করছি, আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আপনি সবসময় নতুন গল্প ও খবর পেতে পারেন! চলুন, তাহলে শুরু করা যাক আজকের গল্প!”

ইউটিউব চ্যা সাবস্ক্রাইব করুন, এবং 10 হাজার টাকা জিতুন, চ্যানেলের ভিডিও তে কমেন্ট করুন, আমরা 3 জন বিজয়ী বেছে নেব।

https://youtube.com/@mrtempestis-q7f?si=g3B45DE2WFSjYpOi

অপূর্ণ পরিবার
বৃষ্টির শব্দটা যেন কখনো থামে না। টিনের চালে ঝমঝম করে পড়ছে, আর সেই শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছে রান্নাঘরের কাঠের উনুনের ফ্যাঁসফ্যাঁস আওয়াজ। ছোট্ট একটা টিনের ঘর, দুই কামরা। সামনের উঠোনে একটা আমগাছ, যার পাতাগুলো এখন ভিজে কালো হয়ে গেছে। এই বাড়িতে থাকে হাসান মিয়া, তার স্ত্রী রহিমা, ছেলে রাকিব আর মেয়ে নাফিসা। চারজন মানুষ। কিন্তু পরিবারটা অপূর্ণ।
হাসান মিয়া পঞ্চাশ পেরিয়েছে। শরীরটা আর আগের মতো শক্ত নেই। সকাল ছয়টায় উঠে সে চা দোকানে যায়। দোকানটা তার নিজের নয়, ভাড়া করা। সারাদিন চা বানায়, বিস্কুট দেয়, খদ্দেরদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করে। কিন্তু হাসিটা কখনো চোখ পর্যন্ত পৌঁছায় না। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা। হাতে দুইশ-তিনশ টাকা। কখনো কখনো দেড়শ।
রহিমা পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। তার শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়েছে তিন বছর আগে। প্রথমে বাঁ-পাশের স্তনে ছোট্ট একটা গাঁট। ডাক্তার বলেছিল অপারেশন করতে। টাকা কোথায়? হাসান ধার-দেনা করে প্রথম কেমো দিয়েছিল। তারপর আর পারেনি। এখন রহিমা বেশিরভাগ সময় বিছানায়। মাথার চুল প্রায় সব উঠে গেছে। চোখের নিচে কালি। কিন্তু সে হাসে। ছেলেমেয়েদের সামনে হাসে।
“আজকে একটু ভাত রান্না করবি নাফিসা। তোর বাবা এসে খাবে,” বলে সে কাশতে কাশতে উঠে বসে।
নাফিসা আঠারো। এইচএসসি পাস করেছে গত বছর। গ্রামের কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু মায়ের অসুখ, বাবার আয়—সব মিলিয়ে পড়া বন্ধ। সে এখন সেলাই মেশিন চালায়। পাশের বাড়ির তিনজনের জন্য জামা-কাপড় সেলাই করে দেয়। হাতে ফোসকা পড়ে। রাতে ঘুমাতে পারে না। মায়ের কাশির শব্দ শুনতে শুনতে চোখের জল ফেলে।
রাকিব ছাব্বিশ। বড় ছেলে। একসময় ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করত। সেখানে একটা মেয়ের সাথে প্রেম হয়েছিল। মেয়েটা বিয়ে করতে চেয়েছিল। রাকিবও চেয়েছিল। কিন্তু বাড়িতে টাকা পাঠানো বন্ধ হয়ে গেলে হাসান ফোন করে বলেছিল, “তোর মা মরতে বসেছে। ফিরে আয়।” রাকিব ফিরে এসেছিল। মেয়েটা আর অপেক্ষা করেনি। এখন রাকিব বাড়িতে বসে। কখনো রিকশা চালায়, কখনো মাছের আড়তে কাজ করে। কিন্তু কোনো কাজ টেকে না। রাগ তার ভিতরে জমে আছে। সে কথা বলে কম।
পরিবারের অপূর্ণতা শুরু হয়েছিল দশ বছর আগে। তখন তাদের আরেকটা ছেলে ছিল—রাহাত। ছয় বছরের। খুব দুষ্টু। একদিন বিকেলে খেলতে গিয়ে রাস্তায় গাড়ির নিচে পড়ে মারা যায়। সেই থেকে বাড়িতে কোনো উৎসব হয় না। ঈদে নতুন জামা কেনা হয় না। রহিমা প্রতি বছর রাহাতের জন্মদিনে চুপচাপ কাঁদে। হাসান দেখেও দেখে না।
সকাল।
নাফিসা উঠে মায়ের মুখ মুছিয়ে দেয়। রহিমার জ্বর এসেছে। শরীর গরম।
“মা, ডাক্তারের কাছে যাবে?”
“না রে। ওষুধের দাম কত জানিস? তোর বাবা কাল রাতে বলছিল, আর টাকা নেই।”
নাফিসা চুপ করে যায়। তার হাত কাঁপে। সে রান্নাঘরে গিয়ে ভাত চড়ায়। চালের মধ্যে পোকা। সে হাত দিয়ে বেছে ফেলে।
হাসান দোকানে বসে আছে। আজ খদ্দের কম। বৃষ্টির জন্য। পাশের দোকানের আলী মিয়া জিজ্ঞেস করে, “কেমন আছে রহিমা?”
হাসান শুধু মাথা নাড়ে। কথা বলতে ইচ্ছে করে না। তার মনে হয়, সবাই জানে তার সংসার শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু কেউ সাহায্য করে না। দুই বছর আগে যখন রহিমার অপারেশনের কথা উঠেছিল, গ্রামের মাতব্বররা বলেছিল “চাঁদা তুলে দেব”। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকাও ওঠেনি।
দুপুরে রাকিব বাড়ি ফেরে। হাতে কয়েকটা টাকা। মাছের আড়তে কাজ করছিল, কিন্তু বৃষ্টিতে মাছ নষ্ট হয়েছে বলে মালিক অর্ধেক দিয়েছে।
“নাফিসা, মা কেমন আছে?”
“জ্বর। খেতে চায় না।”
রাকিব চুপ করে বসে থাকে। তার মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। যখন রাহাত ছিল। তখন বাড়িতে হাসি ছিল। রহিমা রান্না করে সবাইকে খাওয়াত। হাসান বিকেলে ফিরে ছেলেদের নিয়ে খেলত। এখন সব ফাঁকা। রাকিব নিজেকে দোষ দেয়। সে যদি ঢাকায় ভালো চাকরি করতে পারত, যদি মায়ের চিকিৎসা করাতে পারত... কিন্তু পারেনি। তার রাগটা এখন নিজের ওপরই ঘুরে ফিরে আসে।
বিকেলে রহিমা ডাকল সবাইকে।
“বোস সবাই। আজকে আমার ভালো লাগছে।”
চারজন একসাথে বসল। ছোট্ট ঘরে। রহিমা ধীরে ধীরে বলল, “আমি জানি আমার সময় হয়ে আসছে। তোমরা ঝগড়া করো না। নাফিসা, তুই পড়াশোনা চালিয়ে যাস। রাকিব, তোর বাবার পাশে থাকিস। হাসান, তুমি আরেকটা বিয়ে করো। একা থেকো না।”
হাসানের চোখে পানি চলে আসে। সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। “চুপ করো। তুমি সেরে উঠবে।”
রহিমা হাসে। “সেরে উঠলে তো ভালোই। কিন্তু না উঠলে... আমি রাহাতের কাছে চলে যাব। ও তো একা আছে ওখানে।”
সেই রাতে বৃষ্টি আরও জোরে পড়তে থাকে। রহিমার কাশি বাড়ে। নাফিসা পাশে শুয়ে তার হাত ধরে থাকে। রাকিব বাইরের ঘরে বসে সিগারেট খায়। হাসান চুপ করে বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
পরদিন সকালে রহিমা আর উঠল না।
হাসান প্রথমে বুঝতে পারেনি। ডাকল, “রহিমা, চা খাবে?” কোনো সাড়া নেই। হাত ছুঁয়ে দেখল শরীর ঠান্ডা। তখন চিৎকার করে উঠল।
নাফিসা দৌড়ে এসে মায়ের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল। রাকিব দরজায় দাঁড়িয়ে পাথরের মতো হয়ে গেল। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, কিন্তু সে কাঁদছে না। শুধু কাঁপছে।
গ্রামের লোকজন এসে জড়ো হল। কাফনের কাপড় কেনা হল ধারে। হাসানের হাত কাঁপছিল যখন সে স্ত্রীর লাশ ধুয়ে দিচ্ছিল। রাকিব কবর খুঁড়ছিল। নাফিসা মায়ের শাড়ি ভাঁজ করছিল। সবাই কাজ করছিল, কিন্তু কেউ কথা বলছিল না।
কবরস্থানে যখন মাটি ফেলা হচ্ছিল, হাসান প্রথমবারের মতো ভেঙে পড়ল। “রহিমা, আমি তোকে বাঁচাতে পারলাম না। রাহাতের পর তোকেও হারালাম। আমি কী করব এখন?”
রাকিব বাবাকে জড়িয়ে ধরল। এই প্রথম সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল অনেক বছর পর। নাফিসা মাটিতে বসে পড়ল। তার স্বপ্ন, তার ভবিষ্যৎ—সব যেন মাটির সাথে মিশে গেল।
সন্ধ্যায় তিনজন ফিরে এল খালি বাড়িতে। রান্নাঘরে কোনো আওয়াজ নেই। উনুন ঠান্ডা। আমগাছের নিচে জল জমে আছে।
হাসান বলল, “রাকিব, তুই ঢাকায় ফিরে যা। নাফিসা, তোকে পড়তে হবে। আমি একা চালিয়ে নেব।”
রাকিব মাথা নিচু করে বলল, “না বাবা। আমরা একসাথে থাকব। পরিবার তো অপূর্ণই থাকবে। কিন্তু যতদিন আছি, একসাথে থাকব।”
নাফিসা চুপ করে কাঁদছিল। সে জানে, এই অপূর্ণতা আর কখনো পূর্ণ হবে না। মা চলে গেছে। রাহাত চলে গেছে। শুধু তিনজন বাকি। তিনজন অসম্পূর্ণ মানুষ, একটা অসম্পূর্ণ সংসার নিয়ে বেঁচে থাকবে। প্রতিদিন সকালে উঠে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে করবে—আমরা একসময় পাঁচজন ছিলাম।
রাতে বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশে তারা ফুটল। কিন্তু টিনের ঘরের ভিতর অন্ধকারই রয়ে গেল। কারণ আলো জ্বালানোর মতো কেউ আর নেই।
এই অপূর্ণ পরিবারটা এখনও বেঁচে আছে। কষ্ট করে, দুঃখ নিয়ে, একে অপরকে আঁকড়ে ধরে। হয়তো এটাই জীবন। পূর্ণতা খুব কম মানুষের ভাগ্যে জোটে। বেশিরভাগই অপূর্ণতা নিয়েই বেঁচে থাকে। শুধু মনে মনে একটা আশা রাখে—যেন আর কাউকে না হারাতে হয়।
কিন্তু জীবন তো সেই আশা পূরণ করে খুব কমই।

Comments

    Please login to post comment. Login