Posts

নন ফিকশন

স্মার্টফোনের অভিশাপ

May 8, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

20
View

প্রিয় দর্শক, গল্প শুরু করার আগে আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করছি, আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আপনি সবসময় নতুন গল্প ও খবর পেতে পারেন! চলুন, তাহলে শুরু করা যাক আজকের গল্প!”

ইউটিউব চ্যা সাবস্ক্রাইব করুন, এবং 10 হাজার টাকা জিতুন, চ্যানেলের ভিডিও তে কমেন্ট করুন, আমরা 3 জন বিজয়ী বেছে নেব।

https://youtube.com/@mrtempestis-q7f?si=g3B45DE2WFSjYpOi

স্মার্টফোনের অভিশাপ
রাজশাহীর ছোট্ট এক গ্রামে জন্ম নিয়েছিল নাঈম। শান্ত স্বভাবের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই সে খুব মেধাবী ছিল। গ্রামের সবাই বলত, “এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় হবে।” বাবা আব্দুল কাদের ছিলেন একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষক। মা রহিমা বেগম সংসার সামলাতেন। সংসারে খুব বেশি টাকা ছিল না, কিন্তু শান্তি ছিল।
নাঈমের একটা ছোট বোনও ছিল—মিম। ভাইকে সে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত।
নাঈম যখন কলেজে উঠল, তখন তার জীবনে প্রথম স্মার্টফোন আসে। বাবা নিজের বহুদিনের জমানো টাকা দিয়ে ছেলেকে ফোন কিনে দেন।
“পড়াশোনার কাজে লাগবে,” বাবা হেসে বলেছিলেন।
সেদিন নাঈম ফোন হাতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল। শুরুতে সে সত্যিই পড়াশোনার কাজে ফোন ব্যবহার করত। ইউটিউব দেখে পড়ত, নোট বানাত, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করত।
কিন্তু ধীরে ধীরে সব বদলাতে শুরু করল।
একদিন তার বন্ধু রিফাত বলল, “দোস্ত, একটা গেম খেলবি? দারুণ মজা।”
নাঈম বলল, “আমি এসব খেলি না।”
“আরে একবার খেল। দেখবি মাথা ঘুরে যাবে।”
সেদিনই নাঈম প্রথম মোবাইল গেম খেলেছিল।
প্রথম দিন মাত্র আধাঘণ্টা খেলেছিল। তারপর এক ঘণ্টা। তারপর দুই ঘণ্টা।
কিছুদিনের মধ্যেই গেম তার নেশা হয়ে দাঁড়াল।
রাতে পড়াশোনা বাদ দিয়ে সে গেম খেলতে শুরু করল। ক্লাসে ঘুমাত। পরীক্ষার ফল খারাপ হতে লাগল।
বাবা একদিন রিপোর্ট কার্ড হাতে নিয়ে চুপ করে বসে ছিলেন।
“নাঈম, তোর কী হয়েছে?”
নাঈম বিরক্ত হয়ে বলল, “কিছু হয়নি।”
“আগে তো এমন ছিলি না বাবা।”
“আপনারা সবসময় বকা দেন!”
সেদিন প্রথমবার সে বাবার সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলেছিল।
রহিমা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “ফোনটা একটু কম ব্যবহার কর বাবা।”
নাঈম রাগে ফোন ছুড়ে বিছানায় ফেলে বেরিয়ে গেল।
এরপর শুরু হলো আরও ভয়ংকর অধ্যায়।
গেমে নতুন নতুন স্কিন, ডায়মন্ড, অস্ত্র কিনতে টাকা লাগত। শুরুতে নাঈম বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার নিত। তারপর নিজের টিফিনের টাকা জমাত।
কিন্তু তাতেও তার চাহিদা মিটছিল না।
একদিন সে মায়ের ব্যাগ থেকে দুই হাজার টাকা চুরি করল।
টাকা হারিয়ে রহিমা বেগম পুরো ঘর খুঁজলেন।
“কোথায় গেল টাকা?”
নাঈম চুপ করে ছিল।
সেদিন রাতে সে সেই টাকা দিয়ে গেমে ডায়মন্ড কিনেছিল।
স্ক্রিনের আলোয় তার মুখে হাসি ছিল। কিন্তু বাস্তব জীবনে অন্ধকার নেমে আসছিল।
ধীরে ধীরে সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল।
কলেজে যাওয়া বন্ধ। বন্ধুদের সঙ্গে মিশা বন্ধ। পরিবারের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ।
সারাদিন দরজা বন্ধ করে গেম খেলত।
মিম একদিন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলল, “ভাইয়া, একটু আমার সঙ্গে কথা বলো না?”
“যা এখান থেকে!”
মেয়েটা চুপচাপ চলে গিয়েছিল।
একসময় নাঈম অনলাইন টুর্নামেন্টে অংশ নিতে শুরু করল। সেখানে টাকা দিয়ে অংশ নিতে হতো। কেউ কেউ জিতত, কেউ হারত।
প্রথমে সে কিছু টাকা জিতল।
এই জয় তার সর্বনাশের শুরু ছিল।
সে ভাবল, “আমি তো এখান থেকে লাখ টাকা আয় করতে পারব!”
এরপর শুরু হলো আসল পতন।
সে বাবার মানিব্যাগ থেকে টাকা নিতে শুরু করল। মায়ের সোনার কানের দুল বিক্রি করে দিল। মিথ্যা বলল, “চোর নিয়ে গেছে।”
রহিমা বেগম সেদিন অনেক কেঁদেছিলেন।
কিন্তু নাঈমের হৃদয় তখন মোবাইলের স্ক্রিনে বন্দী।
রাতে সে গেম খেলত আর স্বপ্ন দেখত বড় গেমার হওয়ার।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল নিষ্ঠুর।
টুর্নামেন্টে সে একের পর এক হারতে লাগল।
হারানো টাকা তুলতে আবার টাকা লাগত।
এভাবে সে ঋণের মধ্যে ডুবে গেল।
একদিন কয়েকজন ছেলে বাড়িতে এসে দরজায় ধাক্কা দিল।
“নাঈম কোথায়?”
আব্দুল কাদের অবাক হয়ে বললেন, “কেন?”
“আপনার ছেলে আমাদের কাছে চল্লিশ হাজার টাকা পাবে।”
বাবার মুখ শুকিয়ে গেল।
“চল্লিশ হাজার?”
নাঈম ঘর থেকে বের হতে পারছিল না।
সেদিন বাবা প্রথম ছেলেকে থাপ্পড় মেরেছিলেন।
“তুই আমাদের মুখ শেষ করে দিলি!”
নাঈম চিৎকার করে বলল, “আমি ফিরিয়ে দেব!”
কিন্তু সে ফেরাতে পারেনি।
ঋণ বাড়তেই থাকল।
একসময় সে অনলাইনে অবৈধ বাজির মতো গেম খেলতে শুরু করল। সেখানে টাকা দ্বিগুণ হওয়ার লোভ দেখানো হতো।
সে নিজের ফোন বিক্রি করেও আবার নতুন ফোন কিনল কিস্তিতে।
কারণ সে গেম ছাড়তে পারছিল না।
তার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেল। চুল এলোমেলো। মুখ শুকিয়ে গেল।
মিম একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ভাইয়া, তুমি আগের মতো হয়ে যাও না?”
নাঈম উত্তর দেয়নি।
তার কানে তখন শুধু গেমের শব্দ বাজছিল।
“Victory!” “Headshot!” “Winner!”
কিন্তু বাস্তবে সে সব হারাচ্ছিল।
একদিন কলেজ থেকে চূড়ান্ত নোটিশ এল।
দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
আব্দুল কাদের চুপচাপ চিঠিটা পড়লেন।
তারপর ধীরে ধীরে বসে পড়লেন।
সেদিন প্রথমবার নাঈম বাবার চোখে ভাঙা মানুষ দেখেছিল।
রহিমা বেগম বললেন, “আমার ছেলেটাকে ফোন শেষ করে দিল।”
এরপর বাড়ির অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল।
ঋণ শোধ করতে বাবাকে জমি বিক্রি করতে হলো।
ছোট্ট যে জমিটা নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখতেন, সেই জমিও চলে গেল।
মিমের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল।
কারণ সংসারে আর টাকা ছিল না।
এক রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল।
অন্ধকার ঘরে বসে নাঈম ফোনের আলোয় গেম খেলছিল।
হঠাৎ সে শুনল পাশের ঘর থেকে মায়ের কান্না।
“আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়ালাম?”
বাবা ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন, “আমার ছেলেকে আমি আর চিনতে পারি না।”
সেই কথা শুনেও নাঈম ফোন নামায়নি।
নেশা মানুষকে অন্ধ করে দেয়।
তারপর এল সবচেয়ে ভয়ংকর দিন।
ঋণের টাকা না দিতে পারায় কয়েকজন লোক তাকে রাস্তায় ধরে মারধর করল।
রক্তাক্ত অবস্থায় সে বাড়ি ফিরল।
মিম ছুটে এসে কাঁদতে লাগল।
“ভাইয়া!”
রহিমা বেগম তার মাথায় পানি ঢালছিলেন।
কিন্তু নাঈমের চোখ তখনও ফোন খুঁজছিল।
“আমার ফোন কোথায়?”
বাবা হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন।
একজন মানুষ কতটা বদলে গেলে এমন হতে পারে?
কয়েকদিন পর আব্দুল কাদের স্ট্রোক করলেন।
ডাক্তারের কাছে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত টাকা ছিল না।
হাসপাতালের করিডোরে বসে নাঈম প্রথমবার নিজের জীবন নিয়ে ভাবল।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল— বাবার কষ্ট, মায়ের কান্না, বোনের ভাঙা স্বপ্ন।
সে মনে করার চেষ্টা করল শেষ কবে পরিবারের সঙ্গে বসে খেয়েছিল।
মনে পড়ল না।
ডাক্তার এসে বললেন, “রোগীর অবস্থা ভালো না।”
রহিমা বেগম চুপচাপ কাঁদছিলেন।
সেদিন নাঈম হাসপাতালের বারান্দায় বসে নিজের ফোনটা হাতে নিল।
গেমের নোটিফিকেশন আসছিল। “New Event!” “Limited Offer!”
তার মনে হলো, এই ছোট্ট স্ক্রিনটাই তার জীবন ধ্বংস করেছে।
রাগে, ঘৃণায়, অনুতাপে সে ফোনটা মাটিতে ছুড়ে মারল।
ফোন ভেঙে টুকরো হয়ে গেল।
নাঈম ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
“আমি শেষ হয়ে গেছি...”
কিন্তু ভাঙা ফোন জোড়া লাগানো যায়, ভাঙা পরিবার নয়।
কয়েক মাস পর বাবা কিছুটা সুস্থ হলেও আগের মতো আর ছিলেন না।
নাঈম ছোটখাটো কাজ শুরু করল। কখনো দোকানে, কখনো ডেলিভারির কাজ।
সে চেষ্টা করছিল ঋণ শোধ করতে।
কিন্তু হারানো সময় আর ফিরে আসছিল না।
একদিন রাতে মিম বলল, “ভাইয়া, তুমি এখন আর গেম খেলো না?”
নাঈম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কিছু জিনিস মানুষকে আনন্দ দেয় না, ধীরে ধীরে শেষ করে দেয়।”
মিম চুপ করে শুনছিল।
নাঈম আকাশের দিকে তাকাল।
তার জীবনটা একসময় স্বপ্নে ভরা ছিল। আজ শুধু অনুশোচনা।
সে বুঝেছিল— স্মার্টফোন খারাপ নয়, কিন্তু ভুল ব্যবহার মানুষের জীবন ধ্বংস করতে পারে।
একটি গেম, একটি নেশা, একটি ভুল আসক্তি—
একটি পুরো পরিবারকে শেষ করে দিতে পারে।
আর সেই অভিশাপের নাম— স্মার্টফোনের অভিশাপ।

Comments

    Please login to post comment. Login