Posts

চিন্তা

মহাঋষি: Grand prophet of Islam!

May 9, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

51
View

যারা রবিঠাকুরকে ধারণ করবার উপযুক্ত হতে চান না, রবীন্দ্রপাঠে মন না দিয়ে কেবলই নিন্দামন্দের আত্মপ্রসাদে ভোগেন -সেই তাদের উদ্দেশ্যে কিছু রবীন্দ্রপাঠ উপস্থাপন জরুরি বিবেচনায় কর্তব্যজ্ঞান করছি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯১ সালে, অর্থাৎ ৩০ বছর বয়সে পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদেশে কুষ্টিয়ার শিলাইদহে জমিদারি তদারকি বা পরিচালনা করতে আসেন। এসে দেখেন তাঁর প্রজাদের অধিকাংশই মুসলিম। এবং মুসলমানের অন্নে যেহেতু কবিমন পরিপুষ্ট তিনি তাদেরকে ভালোবাসার কোনোই কমতি রাখেন নাই।

কুষ্টিয়ার শিলাইদহে রবিঠাকুর দাতব্য চিকিৎসালয় এবং নওগাঁর পতিসরে বড় হাসপাতাল তৈরি করেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘পতিসরে আমি কিছুকাল হইতে পল্লীসমাজ গড়িবার চেষ্টা করিতেছি যাহাতে দরিদ্র চাষী প্রজারা নিজেরা একত্র মিলিয়া দারিদ্র্য, অস্বাস্থ্য ও অজ্ঞান দূর করিতে পারে -প্রায় ৬০০ পল্লী লইয়া কাজ ফাঁদিয়াছি...আমরা যে টাকা দিই ও প্রজারা যে টাকা উঠায়..এই টাকা ইহারা নিজে কমিটি করিয়া ব্যয় করে। ইহারা ইতিমধ্যে অনেক কাজ করিয়াছে।’

তৎকালীন নোবেলের পুরস্কারমূল্য ছিল ১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা। ১৯১৩ সালে এই টাকা এইসময় কত টাকা হতে পারে তা আমাদের কল্পনার বাইরে। রবীন্দ্রনাথ পুরস্কারের প্রায় সিংহভাগ দিয়ে দিলেন পতিসরের কালীগ্রাম কৃষিব্যাংকে। বাকি যা থাকল, ঢেলে দিলেন বিশ্বভারতী তৈরির কাজে। এরপরও যদি ধরে নেয়া হয় কবির মন মুসলমানের জন্য কাঁদে নাই -সেই ধারণা এক বিরাট অশ্বডিম্ব বই আর কিছুই হয় না।

বেশ কয়েকবার ইসলাম ধর্মের প্রবর্তককে নিয়ে বাণী দিয়েছেন এবং নিজের লেখা প্রবন্ধেও নবীচরিত বিশ্লেষণ করেছেন কবি।

১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লির জামে মসজিদ থেকে প্রকাশিত 'দ্য পেশওয়া' পত্রিকার নবী সংখ্যার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উদ্দেশ্যে এই বিশেষ বাণীটি পাঠিয়েছিলেন।
'যিনি বিশ্বের মহত্তমদের অন্যতম, সেই পবিত্র পয়গম্বর হজরত মহম্মদের উদ্দেশে আমি আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। যিনি মানব ইতিহাসে একটি নতুন ও সুপ্ত জীবনীশক্তি এনেছেন, ধর্মে পবিত্রতার এক জোরালো আদর্শ স্থাপন করেছেন। আমি আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করি যে, যাঁরা তাঁর পথ অনুসরণ করেন, তাঁরা যেন তাঁদের জীবনে তাঁদের প্রভুর মহৎ শিক্ষার প্রতিফলন ঘটান এবং আধুনিক ভারতের ইতিহাসে সভ্যতা প্রতিষ্ঠায় ও আমাদের জাতীয় জীবনে শান্তি ও পারস্পরিক সদিচ্ছা বজায় রাখতে সাহায্য করেন।'
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শান্তিনিকেতন, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬)

হযরত মোহাম্মদ (সা.)'র জন্মদিন উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ বাণী পাঠিয়েছিলেন স্যার আব্দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দিকে। ১৯৩৪ সালের ২৫ জুন ওই বাণীটি হযরত মোহাম্মদের জন্মদিনে আকাশবাণীতে প্রচারিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-
'ইসলাম পৃথিবীর মহত্তম ধর্মের মধ্যে একটি। এই কারণে উহার অনুবর্তিগণের দায়িত্ব অসীম, যেহেতু আপন জীবনে এই ধর্মের মহত্ত্ব সম্বন্ধে তাহাদিগকে সাক্ষ্য দিতে হইবে। ভারতে যে-সকল বিভিন্ন ধর্মসমাজ আছে তাহাদের পরস্পরের প্রতি সভ্য জাতিযোগ্য মনোভাব যদি উদ্ভাবিত করিতে হয় তবে কেবলমাত্র রাষ্ট্রীক স্বার্থবুদ্ধি দ্বারা ইহা সম্ভবপর হইবে না। তবে আমাদিগকে নির্ভর করিতে হইবে সেই অনুপ্রেরণার প্রতি, যাহা ঈশ্বরের প্রিয় পাত্র ও মানবের বন্ধু সত্যদূতদিগের অমর জীবন হইতে চির উৎসারিত। অদ্যকার এই পূর্ণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে মুসলিম ভ্রাতাদের সহিত একযোগে ইসলামের মহাঋষির উদ্দেশ্য আমার ভক্তি-উপহার অর্পণ করিয়া উৎপীড়িত ভারতবর্ষের জন্য তাঁহার আশীর্বাদ ও সান্ত্বনা কামনা করি।'

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়র রবীন্দ্রজীবনীর ৩য় খণ্ডে উল্লেখ আছে, বাণীটির ইংরেজি পাঠ রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছিলেন। বাংলা পাঠে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মোহাম্মদকে মহাঋষি হিসাবে অভিহিত করেছিলেন কবি। কিন্তু ইংরেজি ভাষ্যে তিনি মহাঋষি শব্দটির অনুবাদ করেছিলেন Grand Propfet of Islam.

জাস্টিস আমির আলীর বরাতে প্রাচ্যসমাজ প্রবন্ধে রবিঠাকুর লিখেন, 'য়ুরোপের মধ্যযুগে স্ত্রীলোক সদাসর্বদাই উৎপীড়িত, বলপূর্বক অপহৃত, কারামধ্যে বন্দীকৃত, এবং পরমখৃস্টান য়ুরোপের উপরাজগণের দ্বারা কশাহত হইত। খৃস্টানগণ তাহাদিগকে দগ্ধ করিতে, জলমগ্ন করিতেও কুণ্ঠিত হইত না।

এমন সময় মহম্মদের আবির্ভাব হইল। মর্তলোকে স্বর্গরাজ্যের আসন্ন আগমন প্রচার করিয়া লোকসমাজে একটা হুলস্থূল বাধাইয়া দেওয়া তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল না। সে-সময়ে আরব সমাজে যে-উচ্ছৃঙ্খলতা ছিল তাহাই যথাসম্ভব সংযত করিতে তিনি মনোনিবেশ করিলেন। পূর্বে বহুবিবাহ, দাসী সংসর্গ ও যথেচ্ছ স্ত্রীপরিত্যাগের কোনো বাধা ছিল না; তিনি তাহার সীমা নির্দিষ্ট করিয়া দিয়া স্ত্রীলোককে অপেক্ষাকৃত মান্যপদবীতে আরোপণ করিলেন। তিন বার বার বলিয়াছেন, স্ত্রীবর্জন ঈশ্বরের চক্ষে নিতান্ত অপ্রিয় কার্য। কিন্তু এ প্রথা সমূলে উৎপাটিত করা কাহারো সাধ্যায়ত্ত ছিল না। এইজন্য তিনি স্ত্রীবর্জন একেবারে নিষেধ না করিয়া অনেকগুলি গুরুতর বাধার সৃষ্টি করিলেন।'

১৯৩২ সালের মে মাসে কবিগুরু ইরাকের একটি বেদুইন শিবিরে গিয়েছিলেন। সেখানে এক মুসলিম উপজাতি নেতা তাঁকে বলেন, 'আমাদের মহানবী বলেছেন, তিনিই সত্যিকারের মুসলমান, যাঁর বাক্য বা কর্মের দ্বারা তাঁর ভ্রাতৃপ্রতিম মানুষগুলোর ন্যূনতম ক্ষতিসাধনও হয় না।’
এমন কথায় বিস্মিত হয়ে কবি তাঁর ডায়েরিতে লিখে নিয়েছিলেন, ‘চমকে উঠলুম। বুঝলুম তাঁর কথাগুলোই মানবতার মূল কথা।’

১৯৩১ সালে ৬ সেপ্টেম্বর হেমন্তবালা দেবীকে একটি চিঠি লিখেছিলেন রবিঠাকুর। চিঠিতে তিনি একটি ঘটনা উল্লেখ করেছিলেন।
...'একদিন আমার একজন মুসলমান প্রজা অকারণে আমাকে এক টাকা সেলামি দিয়েছিল। আমি বললুম, আমি তো কিছু দাবি করি নি। সে বললে, আমি না দিলে তুই খাবি কী? কথাটা সত্য। মুসলমান প্রজার অন্ন এতকাল ভোগ করেছি। তাদের অন্তরের সঙ্গে ভালবাসি, তারা ভালবাসার যোগ্য।'

এ চিঠিতে মুসলমান প্রজাদের প্রতি কবির দায় ও কৃতজ্ঞতা এবং প্রজাদের কর্তৃক কবির প্রতি অকুন্ঠ প্রেমে রাজা ও প্রজা দুইপক্ষই দুইজনের কাছে যোগ্যতম অভিধায় অভিষিক্ত হয়ে ওঠে। মহত্তম এই সম্পর্কের তুল্যমূল্য বিচার্য হতে পারে ঠিক কী দিয়ে?

এরপরও যদি এই উচ্চারণে আপনাদের ভিমরতিতে আকীর্ণ মগজের নিউরণে ক্ষণে ক্ষণে চাগাড় দিয়ে উঠে যে -রবিঠাকুর মুসলমানের জন্য কিছু করেন নাই অথবা মুসলিম মানস নিয়ে ইতিবাচক কিছু বলেন নাই -তবে আপনাদের অজ্ঞতার প্রতি একরাশ করুণা ছাড়া তো আর কিছুই দেবার থাকে না।

লেখক: সংবাদিক  
২৫ বৈশাখ ১৪৩৩

Comments

    Please login to post comment. Login