Posts

উপন্যাস

ভালোবাসার আবদার ৮

May 9, 2026

সামিরা আক্তার ইন্নি

22
View

পুরো বাড়ি জুরে উত্তেজনা বিরাজমান। বিয়ে বাড়ির আনন্দে সবাই মেতে আছে। তেমন বড় করে না হলেও কিছু মানুষ বিয়েতে উপস্থিত। তোহান সারাকে বাড়ি থেকে বের করে জলদি করে বাড়ির সামনের দিকে আসে। কেউ তাকে পিছন সাইডে দেখলেই সন্দেহ অরতে পারে। জলদি গিয়ে ভাইয়ের পাশে বসে পড়ে। খাওয়া দাওয়ার পর্ব ঘুচিয়ে কাজি বিয়ের পড়ানোর আয়োজন শুরু করে। রুবিনা বেগম আর শারমিন বেগম আর মিনু আপু গেল কনের রুমে। কনের রুমের দরজা খুলতেই তারা অবাক হন। রুম জুরে শূন্যতা। রুবিনা বেগম জলদি করে রুমের ওয়াশরুম চেক করলো। না নেই। বুক কেপে ওঠে তিনজনের। শারমিন বেগম হতবুদ্ধি হয়ে ছুটে বাইরে যায়। সারাবাড়ি ছরিয়ে পড়ে কনে পালিয়েছে।একনিমিষেই সব স্তব্ধ হয়ে যায়।

নোহান সারার পালানোর কথা শুনে সাথে সাথে ওঠে দাড়ায়। সে একমিনিটও সময় নষ্ট না করে ছুটে সারার রুমে যায়। পুরো রুমে পাগলের মতো ঘুরে বিছানার নিচে, পর্দার পিছনে, আলমারির ভিতরে খুজতে থাকে আর বিরবির করে বলতে থাকে।

“সারা, সারা, কোথায় আপনি? আমি খুজছি আপনাকে সারা। বেরিয়ে আসুন। আমি পাগল হয়ে যাবো সারা বেরিয়ে আসুন। সবাই মিথ্যে বলছে সারা। আমি জানি, আপনি আমায় ভালো না বাসলেও এতো বড় শাস্তি দিতে পারেন না সারা। আমি আপনাকে চাই সারা। হোক সেটা আপনার ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। আমার আপনাকে চাই সারা। আপনি পালাতে পারেন না। আপনি কিছুতেই পারেন না। কোথায় আপনি? এখন লুকোচুরি খেলতে চাইনা আমি সারা, বিয়েটা হয়ে যাক আপনি আমার হলে সারাজীবন লুকোচুরি খেলতে রাজি আমি। এখন ভালো মেয়ের মতো বেরিয়ে আসুন।”

তনু বাবার বাড়িতেই ছিলো। ছেলের বিয়েতে মায়েদের থাকতে নেই বলে সে এই বাড়িতে আসেনি। কিন্তু সারার পালানোর খবর কানে আসতেই ছুটে এলো সে। এই কদিনে তনু এটা বুঝে গেছে ছেলে তার সারার জন্য পাগল। যা খুশি করতে পারে সারার জন্য।নোহান সারার রুম তন্নতন্ন করে সারাকে খুজছে। তোহান আর ইকবাল শেখ নোহানকে থামানোর চেষ্টা করছে। তনু ছুটে এসে ছেলেকে আগলে নিতে চাই। তবে তার ছেলে এখন  পাগল হয়ে গেছে সারাকে খুজতে। নোহানকে তনু জরিয়ে ধরে বলে:

“শান্ত হ আব্বা। প্লিজ শান্ত হ। সারা এই রুমে নেই আব্বা। ও চলে গেছে। তুই পাগলামো করিস না। এই রুমে সারা নেই।”

“আম্মু আমাকে ছাড়ো। আমার সারা পালাতে পারেনা। আমার সারা পালাতে পারেনা আম্মু। ও আমার হবেই। ওকে আমি আমার করবো আম্মু। প্লিজ ছাড়ো ওকে আমি খুজছি তো। সারা আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে আম্মু। মেয়েটা ছোট থেকে শুধু লুকোচুরিই খেলে যাচ্ছে। এতো প্রিয় কেন এ খেলা তার কাছে?"

নোহানকে থামানো আর কষ্টের হয়ে পড়ছে। তোহান ভাইকে দেখছে। তার ভিতরটা ফেটে যাচ্ছে। সে না সারার কষ্ট দেখতে পেরেছে না এখন নোহানের কষ্ট সহ্য করতে পারছে। এর মধ্যে ইকবাল শেখ সফিক আহমেদসহ আরো কিছু মানুষ বেরিয়ে পড়ে সারাকে খুজতে।মিনু গিয়ে ধরে তোহানকে।

“তুই তো সারার সাথে থাকবি বলেছিলি তাহলে ও পালালো কি করে?”

মিনুর কথায় তোহানের গলা শুকিয়ে যায়। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। নোহানের পাগলামো কমেছে খানিক।সে ছোট ভাইয়ের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তোহান আমতা আমতা করে বলে:

“আমি খালাম্মা কাছেই ছিলাম তখন খালাম্মা বলল ও একা থাকতে চাই তাই আমি ভাইয়ের কাছে চলে যায়।”

“সারা খালাম্মা না তোর ভাবি হয় বুঝেছিস? ভাবি বলবি।”

তোহান মাথা ঘামালো না। সে এতো নীচ নয় যে মায়ের মামাতো বোনকে ভাবি ডাকবে যতোটা নীচ হয়ে নোহান খালাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো।সবাই সারাদিন পুরো গ্রামে খুজেছে তবে সারাকে পেলনা। কিছু মানুষ সারাকে দৌড়ে যেতেও দেখছে। সবাই বুঝলো সারা এর মাঝে এই গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর নোহান সবাই ফিরে আসে। নোহান স্থির হয়ে বসে আছে। রাতটা নির্ঘুমই কাটলো।

সারা আসফির সামনে বসে আছে। আসফি অনেকক্ষনের নীরবতা ঘুচিয়ে গলা পরিষ্কার করে বলে:

“আমি নিজের সম্পর্কে আগে বলবো নাকি আপনি বলবেন?”

“আপনি নিজের টাই বলুন মন চাইলে!"

“আমি আসফিয়ার আহমেদ আসফি। বর্তমানে বাবার বিজনেস দেখাশোনা করছি। বয়স ঊনত্রিশ চলমান।তার বাইরে কিছু জানতে চান?"

সারা আসফির বয়স শুনে বিরবির করে ‘বুড়ো' বলে।

“না আমার কিছু জানার নেই।”

“এবার আপনার সম্পর্কে বলুন যদি মন চাই!”

“না মন চাইলোনা। দুঃখিত!”

আসফি হা হয়ে যায়। এভাবে মুখের উপর না করে দিলো। মেয়েটা না এতক্ষন লজ্জা পাচ্ছিলো। সারা লোকটার মুখের অবস্থা দেখে হাসতে মন চাইলো। খুব কষ্টে নিজের হাসি আটকে রাখলো। আসফি মুখ ছোট করে বলল:

“ওহ, আচ্ছা ঠিক আছে বলতে হবেনা। আপন.”

“টাটা দ্যা রাস্তা, আপনি আমার ব্যাপারে জেনে কি করবেন?”

“হোয়াট?”

“কি হোয়াট?”

আসফি দমে যায়। মেয়েটা তার সাথে দুষ্টামি করছে। 

“তুমি আমার সাথে সহজ হচ্ছো দেখে খুশি হলাম। তুমি আমাকে নিজের বন্ধু ভেবে সব বলতে পারো। আর তুমি বিয়ে থেকেই বা কেন পালিয়েছো সেটাও এখনো জানা হলোনা।”

আসফি এবার আর মেয়েটা আপনি সম্মোধন করলোনা।সারা কিছুক্ষন ভাবলো হয়তো ভাবছে লোক একটা বিশ্বাস যোগ্য তা নিয়ে। তারপর ধীরে বললো:

“আমি গ্রামে থাকি। তবে জীবনের বেশিরভাগ সময়ই এখানে থেকেছি ঢাকায়। আমার বাবার গ্রামে একটা ফার্মেসী আছে। ছোট বেলা থেকেই বাবা-মায়ের থেকে আমার দূরত্ব অনেক। আসলে তারা আমাকে কখনো চাইনি। আমার বাবা-মায়ের বিয়ের অনেক বছর পর আমার জন্ম। অনেক চাওয়ার পর আমাকে পেয়েছে তারা। তবে তারা আমাকে নয় বরং একটা ছেলে চাইতো। মেয়ে মানুষ অন্যের ঘরে ছলে যাবে তাই ছেলে দিয়েই তো বংশ আগাবে। আমার জন্মে কেউই তেমন খুশি হয়নি। কারণ আমি মেয়ে।”

সারা থামলো। তার গলা কেমন ধরে আসছে। চোখ জোরা বেইমানি করছে। কই সে তো এসব ব্যাপারে কখনো হয়তো বুঝের হওয়ার পর চোখের পানি ফেলেনি তবে আজ এমন করছে কেন? আসফি আগ্রহ নিয়ে বলে:

“তারপর..”

“ওহ, তারপর আমায় কেউ ভালোবাসলোনা। দাদির মুখে মুখ পুড়ি ছাড়া ডাক শুনিনি। খুব তিক্ততা নিয়েই ডাকতো। বাবা কখনো মা বলে আগলে নেয়নি। মাও ছিলো ভীষণ উদাসীন আমার প্রতি। তারও যে মনে মনে ছেলের শখ ছিলো।আমার পাচঁবছর বয়স। উরন্ত আমি। সারাদিনই দুই ভাগিনার সাথে লাফালাফি দৌড়াদৌড়ি করি।কিন্তু ছয়বছর বয়সে আমার পরিবার আমার প্রতি একটু বেশিই অনিহা দেখালো এবং আমার মা তার খালাতো বোনের কাছে আমায় দিয়ে দিলো। আমি খেতাম না, চুপচাপ হয়ে গেলাম। বাবা-মায়ের জন্য কাদতাম। পরে মায়ের খালাতো বোন মানে মামনির আদর পেয়ে আহ্লাদী হয়ে গেলাম। এই পৃথিবীতে সেই আমায় ভালোবাসলো। মামনির মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো আর স্বামীও ছিলোনা তাই তিনি একা থাকতেন। তার একলা জীবনের সঙ্গী হয়ে আমি এসেছিলাম। সে আমায় বড় করলো ভালোবেসে। বাবা প্রতি মাসেই আমার খরচ পাঠিয়ে দিতো। দুই ঈদে বাড়িতে মেহমানের মতো যেতাম। কিন্তু SSCর দুমাস আগেই আমায় ভালোবাসার মানুষটা চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে গেল। আমি সেই কষ্ট নিয়েই মামনির মেয়ের বাসায় থেকে SSC দিলাম। অতপর নিজের বাড়ি চলে গেলাম। সবার অনিহা থাকা সত্ত্বেও আমি বেহায়ার মতো সেখানেই থাকতাম। আমার দুই ভাগিনা আমার সঙ্গী ছিলো। বন্ধু ছিলো। তবে আমার বড় ভাগিনা প্রকাশ করলো সে আমায় ভালোবাসে। এ পৃথিবীতে দ্বিতীয় ভালোবাসা পেয়েও আমি খুশি হলাম না কারণ সে আমায় খালা হিসেবে ভালোবাসেনি। পরে সে উঠে পড়ে লাগে আমায় বিয়ে করতে। আমি তা কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না। তার বাবা তাকে অনেক ভাবে বুঝালো মারলো তবুও ছেলের আমাকেই চায়। অবশেষে বিয়েতে রাজি হলো সবাই ছেলের প্রাণ বাচাতে। আর এদিকে আমি প্রাণহীন হলাম। কিন্তু আল্লাহ আমার কাছে ছোট ভাগিনাকে পাঠালো। এবং সেই আমাকে পালাতে সাহায্য করলো।ভালোবাসা না পাওয়া মেয়েটা সবার মনে ঘৃণা ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে এলাম। ”

#চলবে

Comments

    Please login to post comment. Login