প্রিয় দর্শক, গল্প শুরু করার আগে আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করছি, আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আপনি সবসময় নতুন গল্প ও খবর পেতে পারেন! চলুন, তাহলে শুরু করা যাক আজকের গল্প!”
ইউটিউব চ্যা সাবস্ক্রাইব করুন, এবং 10 হাজার টাকা জিতুন, চ্যানেলের ভিডিও তে কমেন্ট করুন, আমরা 3 জন বিজয়ী বেছে নেব।
https://youtube.com/@mrtempestis-q7f?si=g3B45DE2WFSjYpOi

নিঃস্ব মেহরাব নাফিস
বর্ষার এক ভারী সকালে গ্রামের মাটির ঘরে কান্নার শব্দে ভরে উঠল চারপাশ। মেহরাব নাফিসের জন্ম হয়েছিল সেদিন। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল আর ঘরের ভিতরে তার মা রহিমা বেগম ক্লান্ত শরীরে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। ঠিক সেই সময় পুলিশ এসে তার বাবা নাফিস উদ্দিনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কেউ বলেছিল জমি নিয়ে পুরনো শত্রুতা কেউ বলেছিল রাজনৈতিক মামলা। কেউ আবার ফিসফিস করে বলেছিল ছেলেটা জন্ম নিয়েই বাবাকে জেলে পাঠিয়েছে। অপয়া। সেই কথা গ্রামের হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি।
রহিমা বেগম একা হয়ে গেলেন। সকাল না হতেই অন্যের বাড়িতে ঝি’য়ের কাজে যেতেন। মেহরাবকে পাশের বাড়ির দাদির কাছে রেখে যেতেন। ছোট্ট মেহরাব ঘরের দাওয়ায় বসে মায়ের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকত। যখন মা ফিরতেন তখন তার হাতে থাকত কিছু ভাত আর ডাল। মা ক্লান্ত গলায় বলতেন খা বাবা। মেহরাব খেত আর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করত বাবা কবে আসবে। মা চোখ সরিয়ে নিয়ে বলতেন শিগগিরই। কিন্তু বছর গড়িয়ে যেত আর বাবার খবর আসত না।
স্কুলে যাওয়া শুরু করতেই তার জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠল। প্রথম দিনেই শিক্ষক তার নাম লিখতে গিয়ে বললেন নাফিস উদ্দিনের ছেলে। ক্লাসের ছেলেরা ফিসফিস করে হাসল। বৃষ্টি হলে ছাদ চুঁইয়ে পড়ত আর সবাই বলত মেহরাব এসেছে তাই। কেউ ফুটবল খেলতে গিয়ে পা মচকে গেলে দোষ তার। একবার স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় তার খাতা হারিয়ে গেল। সবাই বলল মেহরাব লুকিয়েছে। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। প্রতিবাদ করল না। বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে কাঁদল। মা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন তুই অপয়া না বাবা। দুনিয়া অপয়া। কিন্তু গ্রামের লোকজনের কথা থামল না। তারা তাকে দেখলেই বলত অপয়া ছেলে আসছে সরে যা।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেহরাব শক্ত হয়ে উঠল। সকালে মাঠে কাজ করত। দুপুরে স্কুল। বিকেলে আবার কাজ। তারপর রাতে মায়ের সাথে বসে পড়াশোনা। একদিন নদীর পাড়ে রুমির সাথে দেখা হল। রুমি পাশের গ্রামের মেয়ে। সাদা শাড়ি পরে হেঁটে যাচ্ছিল। হাসলে তার গালে ছোট্ট টোল পড়ত। মেহরাব প্রথমবার কোনো মেয়ের সামনে এতটা অস্বস্তিতে পড়ল। কথা বলতে গিয়ে জিভ আটকে যেত। ধীরে ধীরে তাদের দেখা হতে লাগল। নদীর ধারে বসে তারা অনেক কথা বলত। রুমি বলত তোমার চোখে এত দুঃখ কেন মেহরাব। সে হেসে বলত দুঃখ তো সবারই আছে। তুমি হাসলে আমার দুঃখ কমে যায়।
রুমি তার হাত ধরে বলেছিল তুমি খুব ভালো মানুষ। আমি তোমাকে ভালোবাসি। মেহরাবের বুকের ভিতর আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। সে স্বপ্ন দেখত রুমিকে বিয়ে করবে। ছোট একটা ঘর বানাবে। মাকে নিয়ে সুখে থাকবে। কিন্তু একদিন হঠাৎ খবর এল রুমির বিয়ে হয়ে গেছে ঢাকার এক বড় ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে। টাকা আর সোনা-দানার লোভে। মেহরাব নদীর পাড়ে একা বসে অনেক রাত কাঁদল। তার চোখের জল নদীর পানিতে মিশে গেল। কাউকে কিছু বলল না। শুধু মনে মনে ভাবল হয়তো আমিই অপয়া। যাকে ভালোবাসি সেও চলে যায়।
এর কয়েক মাস পর আরেকটা আঘাত এল। তার ছোট ভাই রাজু নদীতে ডুবে মারা গেল। মেহরাব সেদিন মাঠে কাজ করছিল। খবর পেয়ে ছুটে এসে দেখল গ্রামের লোকজন তার দিকে আঙুল তুলছে। বলছে তুই নিয়ে গিয়েছিলি রাজুকে নদীতে। তুই অপয়া। তুই মেরেছিস তোর ভাইকে। মেহরাব চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল কিন্তু সে কোনো কথা বলল না। মায়ের কোলে মাথা রেখে সারারাত কাঁদল। মা তার চুলে হাত বুলিয়ে বললেন তুই দোষী না বাবা। কিন্তু গ্রামের লোকজন তাকে আর দেখতে পারছিল না। তারা তাকে দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নিত।
মেহরাব সিদ্ধান্ত নিল গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে। মাকে বলল আমি ঢাকায় যাব মা। কাজ করে টাকা পাঠাব। তুমি একা থেকো না। মা কাঁদতে কাঁদতে তাকে বিদায় দিলেন। ঢাকায় পা রেখেই সে বুঝল শহর কত নিষ্ঠুর। প্রথমে একটা রিকশা ভাড়া নিয়ে চালাতে শুরু করল। সকাল ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। গরমে শরীর পুড়ে যেত। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপত। পা ফুলে যেত। কখনো যাত্রী তাকে গালাগালি করত কখনো ভাড়া কম দিয়ে নেমে যেত। রাতে ছোট্ট একটা টিনের ঘরে শুয়ে সে মায়ের কথা ভাবত। রুমির হাসি মনে পড়ত। ভাইয়ের ছোট্ট মুখ মনে পড়ত। চোখের জল গোপনে মুছে ফেলত।
একদিন তার রিকশা চুরি হয়ে গেল। মালিক তাকে বেদম মারধর করল। বলল তোর জন্যই লোকসান। মেহরাব আবার নতুন করে শুরু করল। পরে একটা ছোট কারখানায় চাকরি পেল। সেখানে মেশিন চালাত। ধুলোয় ভরে যেত শরীর। শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যেত। সহকর্মীদের সাথে ভাগ করে খেত। কারো টাকার দরকার হলে নিজের পকেট থেকে দিয়ে দিত। তারা জিজ্ঞাসা করলে সে হেসে বলত পরে দিও। কিন্তু সে কখনো ফেরত চাইত না।
বছরের পর বছর কেটে গেল। মা মারা গেলেন। মেহরাব একা হয়ে গেল। কারখানায় তার পদোন্নতি হল। ছোট একটা দোকানও দিল। ধীরে ধীরে সে সফলতার মুখ দেখতে শুরু করল। গ্রাম থেকে কেউ কেউ তার খোঁজ করত। কেউ টাকা ধার চাইত কেউ ছেলের চাকরির জন্য সাহায্য চাইত। মেহরাব চুপচাপ দিয়ে দিত। কখনো নিজের কষ্টের কথা বলত না। রাতে একা বসে পুরনো ছবি দেখত। রুমির লেখা একটা চিঠি যা সে কখনো পাঠায়নি। ভাইয়ের ছোট জামা। মায়ের একটা পুরনো চুড়ি। চোখ ভিজে আসত।
একদিন হঠাৎ পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে গেল। কারখানার মালামাল চুরির মামলা। মেহরাব জানত সে নির্দোষ। কিন্তু সাক্ষীরা সবাই তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিল। যাদের সে সাহায্য করেছিল তারাই এখন তার বিরুদ্ধে। জেলে ঢোকার পর তার পুরনো স্মৃতি ফিরে আসতে লাগল। বাবার জেল। তার নিজের জীবনের সব অপবাদ। সে চুপ করে সব সহ্য করল। জেলের ভিতরে অন্য বন্দিদের সাথে কথা বলত। কেউ অসুস্থ হলে নিজের খাবার দিয়ে দিত। কেউ মন খারাপ করলে গল্প শোনাত। তারা বলত তুমি এখানে কেন। সে হেসে বলত হয়তো আমারই ভুল।
দীর্ঘদিন পর জেল থেকে বের হল। শরীর ভেঙে গেছে। চুল পেকে গেছে। তবু সে আবার কাজ শুরু করল। ছোট একটা ঘর ভাড়া করে থাকত। রাতে ঘুমাতে পারত না। একদিন রাতে ঘুমের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাকে চলে গেল। একা। কেউ জানল না।
মৃত্যুর পর তার ছোট ঘর খুলে সবাই অবাক হয়ে গেল। একটা পুরনো ডায়েরি পাওয়া গেল। তাতে লেখা ছিল অনেক নাম আর টাকার হিসাব। গ্রামের কোন মেয়ের বিয়ে দিয়েছে কোন ছেলের পড়াশোনার খরচ দিয়েছে কার চিকিৎসার টাকা পাঠিয়েছে। কখনো নিজের নাম বলেনি। শুধু লিখেছে এটা আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। জন্ম থেকে যে অপরাধ আমার ঘাড়ে চাপানো হয়েছে তার প্রায়শ্চিত্ত।
গ্রামের লোকজন যখন এই কথা জানল তখন অনেকে চুপ হয়ে গেল। কেউ কেউ কাঁদতে লাগল। যারা তাকে অপয়া বলে দূরে সরিয়ে রেখেছিল তারা এখন মাথা নিচু করে। রুমি অনেক পরে খবর পেয়ে এসে তার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁদল। কিন্তু মেহরাব আর ফিরে আসবে না।
সে চলে গেছে নিঃস্ব হয়েও অনেককে ভরিয়ে দিয়ে। সারাজীবন অন্যের দোষ নিজের কাঁধে নিয়ে বয়ে বেড়িয়েছে। কখনো প্রতিবাদ করেনি। শুধু নীরবে সহ্য করেছে আর ভালোবেসেছে। মানুষের নিষ্ঠুরতা আর ভুলের মাঝেও সে মানুষ হয়ে থেকেছে। তার জীবন ছিল এক অবিরাম প্রায়শ্চিত্তের গল্প। কিন্তু সেই প্রায়শ্চিত্তে সে অনেকের জীবনে আলো জ্বালিয়ে গেছে।
আজও গ্রামের নদীর পাড়ে বসে কেউ কেউ তার কথা বলে। বলে এমন মানুষ আর হয় না। হয়তো হয়ও না। কারণ এত বড় কাঁধ খুব কম মানুষেরই থাকে। যে কাঁধে পুরো দুনিয়ার দোষ আর দুঃখ নিয়ে নীরবে হেঁটে যায়। নিঃস্ব মেহরাব নাফিস চিরকালের জন্য চলে গেছে। কিন্তু তার গল্প থেকে গেছে। এক অসমাপ্ত প্রায়শ্চিত্তের গল্প।