প্রিয় দর্শক, গল্প শুরু করার আগে আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করছি, আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আপনি সবসময় নতুন গল্প ও খবর পেতে পারেন! চলুন, তাহলে শুরু করা যাক আজকের গল্প!”
ইউটিউব চ্যা সাবস্ক্রাইব করুন, এবং 10 হাজার টাকা জিতুন, চ্যানেলের ভিডিও তে কমেন্ট করুন, আমরা 3 জন বিজয়ী বেছে নেব।
https://youtube.com/@mrtempestis-q7f?si=g3B45DE2WFSjYpOi

শূন্য পৃথিবী
রাত তখন অনেক। ঢাকা শহরের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের সবচেয়ে উঁচু ফ্লোরে, বিশাল জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাহাত হোসেন। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, গায়ে সিল্কের পাজামা। নিচে শহরের আলো ঝলমল করছিল—যেন অসংখ্য ছোট ছোট তারা মাটিতে নেমে এসেছে। কিন্তু রাহাতের চোখে সেই আলো আর পৌঁছাচ্ছিল না।
তাঁর হাতে এক গ্লাস হুইস্কি। বারো বছরের পুরনো। দাম যা দিয়েছিলেন, তাতে একটা গ্রামের এক বছরের খরচ চলে যায়। কিন্তু আজ স্বাদ লাগছিল না। মুখে তেতো।
“সবই তো আমার,” ফিসফিস করে বললেন তিনি নিজেকে। “এই বাড়ি, এই কোম্পানি, এই গাড়ি, এই টাকা... সব আমার। তাহলে এত খালি লাগে কেন?”
পিছনে তাঁর স্ত্রী নাদিয়া ঘুমিয়ে ছিলেন। ছেলে রিয়ান আমেরিকায় পড়তে গেছে। মেয়ে আনিকা বিয়ে করে সিঙ্গাপুরে। সবাই সফল। সবাই দূরে।
রাহাতের জীবন ছিল একটা সফলতার মডেল। গ্রামের ছেলে, ঢাকায় এসে ছোট একটা ট্রেডিং কোম্পানি শুরু করেছিলেন। আজ তাঁর গ্রুপ অফ কোম্পানির টার্নওভার কয়েক হাজার কোটি টাকা। পাঁচটা বাড়ি, তিনটা বিদেশি গাড়ি, দুবাইয়ে ফ্ল্যাট, লন্ডনে অফিস। কিন্তু আজ রাতে, এই নিঃশব্দ মুহূর্তে, সবকিছু অর্থহীন মনে হচ্ছিল।
তিনি টেবিলের ওপর রাখা একটা পুরনো খাতা তুলে নিলেন। তাঁর বাবার লেখা। বাবা মারা যাওয়ার আগে শেষ কয়েকটা লাইন লিখে গিয়েছিলেন:
“বাবা, এই পৃথিবীতে কিছুই তোমার নয়। একদিন কবরে যেতে হবে। আর কবরে কোনো কিছু নিয়ে যাওয়া যায় না।”
রাহাত খাতাটা বন্ধ করে দিলেন। বিরক্ত লাগছিল। “বুড়ো মানুষের কথা। জীবন তো উপভোগ করার জন্য।”
কিন্তু সেই রাত থেকে কিছু একটা বদলে যেতে শুরু করল।
পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে তিনি দেখলেন, তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ম্যানেজার আসিফ চুরির অভিযোগে ধরা পড়েছে। কয়েক কোটি টাকা। রাহাত রাগে ফেটে পড়লেন। “আমি তোমাকে এত কিছু দিয়েছি! এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা?”
আসিফ মাথা নিচু করে বলল, “স্যার, আপনিও তো একই কাজ করেছেন। বড় কোম্পানিগুলোকে ঠকিয়ে, ছোটদের সর্বনাশ করে এই সাম্রাজ্য গড়েছেন। আমি শুধু আপনারই শিষ্য।”
সেদিন প্রথমবার রাহাতের মনে হলো, তাঁর সাফল্যের ভিত্তি হয়তো নড়বড়ে।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখলেন নাদিয়া কাঁদছেন। “ডাক্তার বলেছে, তোমার হার্টে ব্লকেজ। অপারেশন লাগবে।”
রাহাত হেসে উড়িয়ে দিলেন। “টাকা দিয়ে সব হয়। আমেরিকায় নিয়ে যাব।”
কিন্তু টাকা সবকিছু পারে না। অপারেশনের পরও ব্যথা থেকে গেল। রাতে ঘুম ভাঙত ঘাম দিয়ে। আর প্রতি রাতে সেই একই স্বপ্ন।
স্বপ্নে তিনি একটা বিশাল শূন্য মাঠে দাঁড়িয়ে। চারদিকে কিছু নেই। না বাড়ি, না গাড়ি, না টাকার স্তূপ। শুধু একটা কবর। খোলা। আর তাঁর শরীরটা ধীরে ধীরে সেই কবরের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। তিনি চিৎকার করেন, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না।
একদিন তিনি গ্রামে গেলেন। ছোটবেলার বাড়িটা এখনও আছে। ভাঙাচোরা। পাশের মসজিদে গিয়ে বসলেন। পুরনো ইমাম সাহেব তাঁকে চিনতে পেরে হাসলেন।
“রাহাত, বড় হয়েছিস। কিন্তু চোখ দুটো একই রকম ভয়ার্ত।”
রাহাত বললেন, “ইমাম সাহেব, আমার সব আছে। তবু মনে হয় কিছুই নেই। কবরে কি সত্যি কিছু নিয়ে যাওয়া যায় না?”
ইমাম সাহেব শান্ত গলায় বললেন, “কিছুই না। শুধু দুটো জিনিস—এক, তোমার কর্মের ফল। দুই, যাদের তুমি ভালোবেসেছিলে, তাদের দোয়া। বাকি সব এখানেই থেকে যায়। টাকা, বাড়ি, খ্যাতি—সব শূন্য। এই পৃথিবী আসলে শূন্য পৃথিবী। আমরা শুধু ভর্তি করে ফেলি নিজের অহংকার দিয়ে।”
সেই কথা রাহাতের মনে গেঁথে গেল।
ফিরে এসে তিনি একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর সম্পত্তির একটা বড় অংশ দান করে দিতে শুরু করলেন। প্রথমে একটা হাসপাতাল, তারপর একটা স্কুল গ্রামে। ছেলে-মেয়েকে ডেকে বললেন, “আমি যা রেখে যাব, তা তোমাদের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আমি আর জমা করতে চাই না।”
নাদিয়া প্রথমে আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখলেন, স্বামীর চোখে একটা শান্তি ফিরে এসেছে।
রাহাত এখন প্রতিদিন সকালে গ্রামের স্কুলে যান। বাচ্চাদের সাথে বসেন। তাদের গল্প শোনান। বলেন, “টাকা অনেক কিছু কিনতে পারে, কিন্তু মনের শান্তি কিনতে পারে না।”
একদিন রিয়ান ফোন করে বলল, “বাবা, তুমি পাগল হয়ে গেছ? অর্ধেক সম্পত্তি দান করে দিয়েছ?”
রাহাত হেসে বললেন, “বাবা, আমি পাগল হয়ে গেছি বলে এখন প্রথমবার সুস্থ লাগছে।”
সময় গড়িয়ে গেল।
দশ বছর পর।
রাহাত এখন শয্যাশায়ী। হার্ট আর কাজ করছে না। হাসপাতালের বেডে শুয়ে তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। আকাশ নীল। একটা পাখি উড়ে যাচ্ছে।
নাদিয়া পাশে বসে কাঁদছেন। ছেলে-মেয়ে এসেছে।
রাহাত ধীরে ধীরে বললেন, “কাঁদিস না। আমি তো শূন্য হয়ে যাচ্ছি। আর শূন্যতাই তো সবচেয়ে হালকা। কোনো বোঝা নেই।”
তিনি তাঁর হাতে ধরা ছোট একটা কাগজ তুলে দিলেন নাদিয়ার হাতে। তাতে লেখা:
“এই পৃথিবীতে কিছুই আমার নয়।
একদিন ওই কবরে যেতে হবে।
কবরে কোনো কিছু নিয়ে যাওয়া যাবে না।
এত সুখ, এত টাকা, এত সম্পত্তি—কোনো কিছুই সাথে যাবে না।
তাহলে যা যাবে, তাই জমা করি।
ভালোবাসা। করুণা। সততা। শান্তি।”
শেষ নিশ্বাসের আগে রাহাত হাসলেন। চোখ বন্ধ করলেন।
তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নাদিয়া কাঁদছিলেন। কিন্তু সেই কান্নার মধ্যেও একটা অদ্ভুত শান্তি ছিল। কারণ তিনি জানতেন, রাহাত এবার সত্যিই হালকা হয়ে গেছেন।
কবরের উপর ছোট একটা ফলকে লেখা ছিল:
শূন্য পৃথিবী
রাহাত হোসেন
(যিনি শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলেন—
সবকিছু ছেড়ে দিলেই সবকিছু পাওয়া যায়)
আর দূরে, গ্রামের সেই স্কুলের বাচ্চারা প্রতিদিন দোয়া করে—
“আল্লাহ, রাহাত চাচাকে জান্নাত দাও।”
কারণ তারা জানে, যিনি তাদের জন্য কিছু রেখে গেছেন, তিনি কখনো শূন্য হয়ে যাননি।