দুইদিন আগেও আমরা শিক্ষক তাশরিক হাবিবকে চিনতাম না। এখন চিনি। যেই দেশে অধিকাংশ মানুষ ড. আহমদ শরীফ কিংবা সরদার ফজলুল করিমের মতো দার্শনিকদের চেনে না সেখানে মিস্টার হাবিবকে চিনতে হবে এটা দায় বা না চিনতে পারাটা অজ্ঞতা নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিব নিজের সোশ্যালে হ্যান্ডেলে লাইভে এসে নির্লিপ্ত চোখ এবং ভাবলেশহীনভাবে গান গাইছেন, কবিতা আবৃত্তি করছেন এবং ফলোয়ারদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে বাতচিত করছেন। কথা ঠিক থাকলেও সঙ্গীতের তাল লয় সুর কিছুই হচ্ছে না, আবৃত্তির টেম্পু, পজ, স্পেলিং কিছুরই ঠিক ঠিকানা নাই -কিন্তু তিনি সেসব করে যাচ্ছেন। এতে ব্যাপকভাবে লোক হাসছে, তাকে নিয়ে ট্রল হচ্ছে, মিম, রিলস, শর্টস বানানো হচ্ছে। কিন্তু তিনি নির্বিকার থাকছেন। এমনকি তিনি ভুলেও হাসছেন না। কমেডিয়ানরা নিজেরা হাসে না -লোক হাসায়।
প্রথম যখন তার বেসুরো কন্ঠে গান শুনলাম, কোন বাছবিচার ছাড়াই আমরা তাকে বাতিলের খাতায় রেখে দিয়ে পাবনার পথ দেখতে বলছিলাম। কিন্তু অনুমান করছি ড. হাবিবের নিশ্চিত কোনো উদ্দেশ্য আছে। তিনি কি আজকের বাংলাদেশের সমাজকে বাজিয়ে দেখতে চাইছেন? উচ্ছৃঙ্খল সমাজের উদ্ভট মানুষেরা কী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় সেটির স্বরূপ সন্ধান করতে গিয়ে নিজেকেই পর্যবেক্ষণের অনুষঙ্গ করে তুলছেন তিনি? হয়ত তার পরবর্তী গবেষণার বিষয়, 'সোশ্যাল মিডিয়া, ভাইরাল টেন্ডেন্সি অ্যান্ড হিউম্যান বিং!' খুব শিগগিরই হয়ত এই গবেষণাপত্রটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে।
আমাদের সমাজে গভীর কাজের মূল্য কম, দৃশ্যমানতার মূল্য বেশি। একজন গবেষকের ২০ বছরের কাজ যত মানুষ দেখে না, তার ২০ সেকেন্ডের অদ্ভুত ভিডিও তার চেয়ে বেশি মানুষ দেখে। ফলে অনেক বুদ্ধিজীবীও এখন 'মনোযোগ কাড়ার ভাষা' শিখতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি এখন কেবল বাংলাদেশের একার সমস্যা -তা নয়; বরং বৈশ্বিক গোলযোগেরই এক দুঃখজনক পার্ট।
তাশরিক হাবিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে এমফিল ডিগ্রি ও ২০১৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর এমফিল গবেষণা অভিসন্দর্ভ 'বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পে প্রান্তজনের জীবনচিত্র' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রথম এমফিল গবেষণা অভিসন্দর্ভের গ্রন্থরূপ হিসেবে মর্যাদায় আসীন। মৌলিক ও ভিন্নধর্মী গবেষণা হিসেবে তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ 'বাংলাদেশের উপন্যাসে লোকজ উপাদানের ব্যবহার' বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সম্মানজনক 'রিসার্চ গ্র্যান্ট' পেয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘৩৬ জুলাই, ২০২৪’, ‘নাইয়র’, ‘গল্পকার শহীদুল জহির’, এবং ‘নজরুল যুগবাণী ও অন্যান্য’।
একজন শিক্ষকও মানুষ। তিনি গান গাইতে পারেন, লাইভে আসতে পারেন, রসিকতা করতে পারেন, এমনকি আত্মপ্রকাশের জন্য অদ্ভুত পারফরম্যান্সও করতে পারেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের একজন অধ্যাপকের ক্ষেত্রে সমাজ স্বাভাবিকভাবেই একটা বৌদ্ধিক মর্যাদা, সংযম ও রুচির প্রত্যাশা করে। কারণ তিনি শুধু ব্যক্তি নন, একটি জ্ঞান-প্রতিষ্ঠানের প্রতীকও।
তবে এখানেও একটা জটিলতা আছে। আমরা প্রায়ই 'গম্ভীরতা'কে জ্ঞানের একমাত্র ভাষা মনে করি। ফলে কেউ যদি প্রচলিত অধ্যাপকসুলভ ইমেজ ভাঙেন, মানুষ দ্রুত তাকে 'ভাঁড়' বলে দাগিয়ে দেয়। অথচ ইতিহাসে বহু বুদ্ধিজীবী ইচ্ছাকৃতভাবে eccentric বা unconventional আচরণ করেছেন -কখনও শিল্পীসুলভ প্রকাশ হিসেবে, কখনও সমাজের ভণ্ডামিকে ব্যঙ্গ করার মানসে।
আবার উল্টো দিকও আছে। যদি কেউ সচেতনভাবে শুধুই ভাইরাল হওয়ার জন্য নিজের বৌদ্ধিক পরিচয়কে সার্কাসে পরিণত করেন, তাহলে সমালোচনা হওয়াটাও স্বাভাবিক। কারণ তখন প্রশ্ন ওঠে -তিনি কি জ্ঞানচর্চাকে জনপ্রিয় করছেন, নাকি জনপ্রিয়তার জন্য জ্ঞানকে পণ্য বানাচ্ছেন?
আধুনিক মিডিয়া ইকোসিস্টেমে 'Attention economy'–তে দৃশ্যমান হওয়াটাই প্রথম শর্ত। একজন গবেষক যদি ২০–২৫টা বই লিখেও অদৃশ্য থাকেন, আর এক রাতের অদ্ভুত লাইভে হাজার মানুষ তাকে দেখে -তাহলে তিনি বুঝে যান, জ্ঞান নয়, দৃষ্টি আকর্ষণই মূল মুদ্রা। এখানে 'পাগলামি' আসলে একটা পারফরমেটিভ অ্যাক্ট তথা নিজেকে দৃশ্যমান করার কৌশল।
গভীর গবেষণা সময় চায়, মনোযোগ চায়। কিন্তু ভাইরাল কনটেন্ট দেয় তাৎক্ষণিক ডোপামিন। ফলে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নয়, তাৎক্ষণিক উত্তেজনা বেছে নেয়।
জামাল নজরুল ইসলাম, আল মাহমুদ, রফিকুন্নবী -এরা 'অভিজাত সাংস্কৃতিক পুঁজি'র প্রতিনিধি। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে এই পুঁজির জায়গা দখল করেছে 'attention capital' -যেখানে হিরো আলম বা সালমান মুক্তাদিররা এগিয়ে থাকেন।
মানুষ নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ খোঁজে অন্যের দৃষ্টিতে। সোশ্যাল মিডিয়া সেই আয়না। ভাইরাল হওয়া মানে -'আমি আছি, আমাকে দেখো।' মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ভাষায় এটা হলো Narcissism বা আত্মমুগ্ধতা। মানুষ কষ্টসাধ্য বৌদ্ধিক আনন্দের চেয়ে সহজ, তাৎক্ষণিক আনন্দ বেছে নেয়। নিজেকে প্রকাশ করার এক ধরনের তাড়না -যা সোশ্যাল মিডিয়ায় বাড়তি উৎসাহ পায়।
তাশরিক হাবিবের ব্যাপারটি স্ট্র্যাটেজিক ভাইরালিটি তথা সচেতনভাবে নিজেকে আলোচনায় আনা, কিংবা সামাজিক ব্যঙ্গ -সমাজকে আয়না দেখানো বা চপেটাঘাত করা অথবা হতে পারে সত্যিকারের ব্যক্তিগত বিচ্যুতি -এটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই শিক্ষকের নৈতিকস্খলন খতিয়ে দেখতে পারে।
বিকৃত সমাজের বোঝা বইতে গিয়ে বুদ্ধিমান মানুষও বাধ্য হয়ে 'অদ্ভুত' হতে পারে। এটা এক ধরনের সাংস্কৃতিক ট্র্যাজেডি -যেখানে জ্ঞান টিকে থাকতে চায়, কিন্তু টিকে থাকার জন্য তাকে চটুল বিনোদনের ছদ্মবেশ নিতে হয়।
তাশরিক হাবিব আপাতত জনপ্রিয়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই সময়ের ট্রেন্ড ধরে রেখেছেন। কিন্তু তার আসল অভিপ্রায় বা অভীপ্সা কী -সেটি দেখতে আরো কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক
১২ মে ২০২৬