প্রথম খণ্ড: কুয়াশার আবরণ
অধ্যায় ১: ডায়েরির পাতা এবং রাতজাগা শহরের মৃতদেহ
টপ... টপ... টপ।
জানালার শার্শিতে আছড়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর একটা নিজস্ব ছন্দ আছে। ছন্দের চেয়েও
বড় কথা, এর একটা বিরক্তিকর ধারাবাহিকতা আছে। রাত ঠিক তিনটে বেজে সতেরো মিনিট।
শহরের বুকে যখন সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আরিয়ান খানের বেডরুমে তখন সময় যেন
থমকে আছে।
আরিয়ান বিছানায় উঠে বসল। চোখ দুটো জ্বলছে, কপালে হালকা ঘামের বিন্দু। ইনসোমনিয়া বা
অনিদ্রা রোগটা গত পাঁচ বছর ধরে তার বিশ্বস্ত সঙ্গীর মতো সেঁটে আছে। মায়ার মৃত্যুর
পর থেকে কোনো রাতই আর শান্তিতে কাটে না তার। চোখ বন্ধ করলেই যেন অন্ধকারের ভেতর
থেকে কেউ ফিসফিস করে বলে ওঠে— "তুমি তো বাঁচাতে পারোনি আরিয়ান..."
টেবিলের ওপর রাখা ব্ল্যাক কফির মগটা পুরোপুরি জুড়িয়ে গেছে। আরিয়ান উঠে গিয়ে মগটা
হাতে নিল। ঘরের এক কোণে একটা প্রমাণ সাইজের আয়না রাখা, তবে তার ওপর একটা ভারী
কালো কাপড় চড়ানো। আয়নার দিকে তাকাতে আরিয়ানের প্রবল অনীহা। নিজের চোখের দিকে তাকালে
তার মনে হয়, ওপাশ থেকে অন্য কেউ তাকে দেখছে।
কফির মগটা নামিয়ে রেখে সে তার পুরোনো চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরিটা টেনে নিল। রাতে ঘুম
না এলে সে নিজের ভাবনাগুলো লেখে। এটা ড. সায়ন্তনের দেওয়া একটা থেরাপি। নিজের
মনকে শান্ত রাখার একটা ব্যর্থ চেষ্টা।
কলমটা হাতে নিয়ে ডায়েরি খুলতেই আরিয়ানের ভুরু কুঁচকে গেল।
আজকের তারিখের পাতায় স্পষ্ট গোটা গোটা অক্ষরে একটা লাইন লেখা। কালো কালির কলম দিয়ে।
"চোখ বন্ধ করলেই কি অপরাধের দাগ মুছে যায়, ডিটেকটিভ? আয়নার দিকে তাকাও, দেখবে রক্ত
কার হাতে।"
আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড শ্বাস নিতে ভুলে গেল। হাতের লেখাটা তার নিজের! প্রতিটি অক্ষরের
বাঁক, মাত্রার টান—সব অবিকল তার। কিন্তু সে তো এটা লেখেনি! সে স্পষ্ট মনে করতে
পারে, গতকাল রাতে সে শুধু মায়ার কথা লিখতে গিয়ে কলম থামিয়ে দিয়েছিল। তাহলে
এই লাইনটা কে লিখল? তার ফ্ল্যাটে তো দ্বিতীয় কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই।
আরিয়ানের মাথায় হঠাৎ একটা সূক্ষ্ম যন্ত্রণা চাড়া দিয়ে উঠল। ডান দিকের রগে কে যেন
হাতুড়ি পেটাচ্ছে। সে ডায়েরির পাতাটা ছিঁড়ে ফেলার জন্য হাত বাড়াল, ঠিক তখনই
নীরবতা খানখান করে বেজে উঠল তার সেলফোন।
কলার আইডিতে নাম ভাসছে— ইন্সপেক্টর রাশেদ।
আরিয়ান লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলাল। চোখের পলকে তার ভেতরের বিভ্রান্ত মানুষটা
লুকিয়ে পড়ল, আর বেরিয়ে এল ডিটেকটিভ আরিয়ান খান। ডিএমপির অন্যতম তীক্ষ্ণ,
বদমেজাজি এবং আত্মবিশ্বাসী এক অফিসার।
"বল রাশেদ। রাত সাড়ে তিনটেয় ফোন করেছিস, আশা করি কোনো মাতালকে নর্দমা থেকে তোলার
জন্য নয়," আরিয়ান ফোন ধরতেই তার স্বভাবসুলভ দাম্ভিক গলায় কথা বলে উঠল।
ওপাশ থেকে রাশেদের গলাটা বেশ ভারী শোনাল। "স্যার, আপনার আসতে হবে। এখনই। ধানমন্ডির
৩ নম্বর রোডের একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে একটা বডি পাওয়া গেছে।"
"মার্ডার?" আরিয়ান নিজের রূপালি রঙের ঘড়িটা ডান হাতে পরতে শুরু করল।
"হ্যাঁ স্যার। কিন্তু... সাধারণ মার্ডার না। আমি এর আগে এমন কিছু দেখিনি। আপনি
নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবেন না।"
"পনেরো মিনিট," বলেই ফোনটা কেটে দিল আরিয়ান।
ডায়েরির খোলা পাতাটার দিকে আরেকবার তাকাল সে। নিজের হাতের লেখার ওই অদ্ভুত বাক্যটা
যেন তাকে উপহাস করছে। ডায়েরিটা ড্রয়ারে ছুড়ে ফেলে নিজের প্রিয় কালো রেইনকোটটা
গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়ল আরিয়ান।
বৃষ্টির তোড় ততক্ষণে আরও বেড়েছে। পরিত্যক্ত বাড়িটার বাইরে পুলিশের দুটো জিপ থেকে
লাল-নীল আলো ঘুরছে। আরিয়ান গাড়ি থেকে নামতেই রাশেদ ছাতা নিয়ে এগিয়ে এল।
"ছাতা লাগবে না," হাত নেড়ে রাশেদকে থামিয়ে দিল আরিয়ান। ক্রাইম সিনে ঢোকার সময়
আরিয়ান সবসময় কথা বলে বেশি। এটা তার মনোযোগ ধরে রাখার একটা টেকনিক।
"বডি কে পেয়েছে? আর ওই কনস্টেবলকে বল বুট দিয়ে কাদার ছাপগুলো নষ্ট না করতে। ও
কি এখানে ফুটবল খেলতে এসেছে নাকি ইনভেস্টিগেট করতে?"
রাশেদ তাড়াতাড়ি কনস্টেবলকে সরিয়ে দিয়ে আরিয়ানকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। "স্যার, একজন নাইট
গার্ড প্রথমে বডিটা দেখে। সে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে আছে।"
"অজ্ঞান হওয়ার মতো কী এমন..." কথাটা শেষ করতে পারল না আরিয়ান।
পুরোনো বাড়িটার বিশাল ড্রয়িংরুমের ঠিক মাঝখানে মৃতদেহটা রাখা। না, ফেলে রাখা নয়—খুব
যত্ন করে সাজিয়ে রাখা।
মৃত ব্যক্তি একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ। তার পরনে একটা দামি সুট, তবে সেটা রক্তে ভেজা।
লোকটাকে একটা কাঠের চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। হাত দুটো দুদিকে প্রসারিত করে
ছাদের কড়িকাঠের সাথে নাইলনের সুতো দিয়ে বাঁধা। অনেকটা পাপেট বা পুতুলের মতো
দেখাচ্ছে তাকে।
কিন্তু আরিয়ানের চোখ আটকে গেল লোকটার মুখের দিকে। লোকটার চোখ দুটো সেলাই করে খোলা
রাখা হয়েছে। আর তার ঠোঁট দুটোকে ব্লেড দিয়ে চিরে এমনভাবে প্রসারিত করা হয়েছে,
যেন লোকটা বিভৎসভাবে হাসছে।
আর ঠিক লাশের পেছনের দেওয়ালে, ভিকটিমের রক্ত দিয়েই নিপুণ হাতে আঁকা হয়েছে একটা
বিশাল প্রতিসম (symmetrical) জ্যামিতিক নকশা। পুরো দৃশ্যটা কোনো খুনের
নয়, যেন কোনো বিকারগ্রস্ত শিল্পীর ক্যানভাস।
"দেখলেন স্যার?" রাশেদ ফিসফিস করে বলল। "খুনি লোকটাকে মারার পর অন্তত দুই ঘণ্টা
এখানে বসে এই আর্টওয়ার্ক করেছে। কোনো মোটিভ নেই, কোনো চুরি-ডাকাতি হয়নি।
জাস্ট... একটা এক্সিবিশন।"
আরিয়ান লাশের চারপাশে খুব ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। তার চোখ মেঝেতে, দেওয়ালে,
লাশের আঙুলে। সে অনর্গল কথা বলতে শুরু করল, "খুনি অত্যন্ত পারফেকশনিস্ট।
ভিকটিমের হাতে কোনো ধস্তাধস্তির দাগ নেই, তার মানে খুনি তাকে আগে ড্রাগ দিয়ে
প্যারালাইজড করেছে। সুতোর গিঁটগুলো খেয়াল কর, এগুলো প্রফেশনাল মেরিনার বা সার্জন
ছাড়া কেউ এত নিখুঁতভাবে দিতে পারবে না।"
আরিয়ান যখন এই চমৎকার ডিডাকশনগুলো দিচ্ছিল, তার ভেতরের ডিটেকটিভ সত্তা তখন পুরো
ফর্মে। কিন্তু হঠাৎ দেওয়ালের ওই রক্তের নকশাটার দিকে তাকাতেই তার কানের
কাছে একটা তীক্ষ্ণ শোঁ শোঁ শব্দ শুরু হলো। মাথার ডান দিকের রগের যন্ত্রণাটা
ফিরে এসেছে।
খুব অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল। নকশাটার দিকে তাকিয়ে আরিয়ানের মনে হলো, এই নকশাটা তার
খুব পরিচিত। তার হাত নিশপিশ করতে লাগল। অবচেতনভাবেই সে নিজের পকেটে হাত ঢোকাল, যেন
সেখানে কোনো তুলি বা ব্লেড রাখা আছে।
আরিয়ান চমকে উঠে হাত সরিয়ে আনল। তার হঠাৎ মনে পড়ে গেল নিজের টেবিলে ফেলে আসা
ডায়েরির পাতাটার কথা।
তুমি ঘুমালে আমি জাগি।
আরিয়ান ঢোক গিলল। খুনি কি বাইরের কেউ? নাকি এই শহরে এমন কোনো সাইকোপ্যাথ ঘুরে
বেড়াচ্ছে, যাকে আরিয়ান খুব ভালো করেই চেনে... আয়নার ওপাশ থেকে?
[অধ্যায় ১ সমাপ্ত]
(পাঠকের জন্য প্রশ্ন: আরিয়ানের ডায়েরিতে লেখা লাইনটি কি তার অবচেতন মনের ইঙ্গিত,
নাকি কেউ সত্যিই তার সাথে সাইকোলজিক্যাল গেম খেলছে? খুনের এই অদ্ভুত
প্যাটার্ন কি আরিয়ানকে কোনো বিশেষ বার্তা দিচ্ছে?)