Posts

গল্প

বৃষ্টির পরে রোদ

May 13, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

10
View

শিরোনাম: বৃষ্টির পরের রোদ
রাহাত ঘড়ির দিকে তাকাল। সকাল সাড়ে সাতটা। ঢাকার মিরপুরের ছোট ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখা গেল আকাশটা এখনও মেঘলা। গতকাল রাতের বৃষ্টিতে রাস্তা এখনও ভেজা। সে দ্রুত চা বানিয়ে নিল। দুধ কম, চিনি এক চামচ। অভ্যাস।
রাহাতের বয়স তেত্রিশ। সাত বছর ধরে একটা বেসরকারি কোম্পানিতে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভের চাকরি করছে। বেতন পঁয়ত্রিশ হাজার। বোনাস মিলিয়ে কোনোমতে পঁয়তাল্লিশ। মিরপুর-১০ এর এই এক রুমের ফ্ল্যাটের ভাড়া আট হাজার, খাওয়া-দাওয়া, যাতায়াত, বাবা-মার হাতখরচ—সব মিলিয়ে প্রতি মাসে শেষ হয়ে যায়। বিয়ের কথা উঠলেই বাবা বলেন, “আগে স্থির হ।” কিন্তু স্থির হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সকালের নাস্তা শেষ করে সে বেরিয়ে পড়ল। বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ল আজ অফিসে একটা বড় প্রেজেন্টেশন আছে। ক্লায়েন্ট হলো একটা নতুন মোবাইল ব্র্যান্ড। যদি ডিলটা ধরতে পারে, তাহলে ইনসেনটিভ পাবে। কিন্তু টিম লিডার সোহেল ভাইয়ের মেজাজ খারাপ থাকলে কোনো কথাই শুনবে না।
বাসে উঠে রাহাত জানালার পাশে একটা সিট পেয়ে গেল। পাশে একজন মধ্যবয়স্ক আংকেল বসলেন। তিনি ফোনে কথা বলছিলেন, “না রে, ছেলেটার তো কোনো দোষ নেই। চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে কারণ বসের সাথে ঝগড়া হয়েছে। এখন বাড়িতে বসে আছে। আমি কী করব?”
রাহাত মনে মনে হাসল। তারও তো একই অবস্থা। চাকরি ছাড়ার সাহস নেই, থাকারও আর সহ্য হয় না।
অফিসে পৌঁছে দেখল সোহেল ভাই ইতিমধ্যে চিৎকার শুরু করেছেন। “কে প্রেজেন্টেশনটা তৈরি করেছে? এটা তো একদম ফালতু!” রাহাত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। প্রেজেন্টেশনটা আসলে তারই তৈরি। সারা রাত ধরে করেছে। কিন্তু বলার সাহস হলো না। শেষ পর্যন্ত টিমের আরেকজন, নাদিয়া, এগিয়ে এসে বলল, “স্যার, আমি একটু চেঞ্জ করে দিচ্ছি।”
নাদিয়া। বয়স সাতাশ। দুই বছর আগে জয়েন করেছে। চোখে চশমা, হাসলে গালে টোল পড়ে। রাহাতের সাথে তার কথা হয় মাঝে মাঝে। কফি মেশিনের কাছে দাঁড়িয়ে দু’একটা কথা, প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা। রাহাত জানে নাদিয়া বিয়ে করতে চায় না এখনই। সে বলে, “আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।”
দুপুরে লাঞ্চের সময় নাদিয়া তার টেবিলে এসে বসল। “রাহাত ভাই, প্রেজেন্টেশনটা আপনার ছিল তো? স্যারকে বলিনি।”
রাহাত অবাক হয়ে তাকাল। “তুমি জানলে কী করে?”
“আমি দেখেছি আপনি কাল রাত পর্যন্ত কাজ করছিলেন।” নাদিয়া হাসল। “আর সোহেল স্যারের তো অভ্যাস। যার কাজ ভালো হয়, তার উপরেই চাপ বেশি।”
সেদিন বিকেলে প্রেজেন্টেশনটা ভালোই গেল। ক্লায়েন্ট খুশি। সোহেল ভাইয়ের মুখও একটু হাসি হাসি। অফিস থেকে বেরিয়ে রাহাত দেখল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ছাতা নেই। নাদিয়া পাশে এসে দাঁড়াল। “চলুন, একসাথে রিকশা নিই। আমারও মিরপুরের দিকে।”
রিকশায় বসে দুজনে চুপচাপ। বৃষ্টির ফোঁটা রিকশার ছাদে আঘাত করছে। নাদিয়া হঠাৎ বলল, “রাহাত ভাই, আপনার কখনো মনে হয় না যে আমরা শুধু সময় কাটাচ্ছি? চাকরি, বাড়ি, টাকা—এর বাইরে আর কিছু নেই?”
রাহাত জবাব দিল, “হয়। প্রতিদিন। কিন্তু কী করব? বাবা-মা আছেন। বোনের পড়াশোনা। আমি ছাড়া তো কেউ নেই।”
নাদিয়া চুপ করে গেল। তারপর বলল, “আমার বাবা-মাও একই কথা বলেন। কিন্তু আমি ভাবি, যদি সবাই শুধু ‘দায়িত্ব’ নিয়ে বেঁচে থাকি, তাহলে স্বপ্নগুলো কোথায় যাবে?”
সেদিন রাতে ফ্ল্যাটে ফিরে রাহাত অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে রইল। বৃষ্টি থেমে গেছে। রাস্তায় পানি জমে আছে। তার মোবাইলে নাদিয়ার একটা মেসেজ এলো: “আজকের প্রেজেন্টেশনটা সত্যি ভালো ছিল। ধন্যবাদ।”
পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে দুজনের কথা বাড়তে লাগল। অফিসের পর কখনো কফি, কখনো হাঁটতে হাঁটতে কথা। নাদিয়া বলত তার স্বপ্নের কথা—একটা ছোট বুটিক খুলতে চায় সে। হস্তশিল্পের জিনিস, স্থানীয় ডিজাইন। রাহাত বলত তার ছোটবেলার কথা। গ্রামের বাড়ি, বাবার কষ্ট করে চাষাবাদ, মায়ের অসুস্থতা।
একদিন অফিসে বড় ধাক্কা এলো। কোম্পানি বলল, খরচ কমাতে হবে। কয়েকজনকে ছাঁটাই করা হবে। রাহাতের নাম লিস্টে ছিল না, কিন্তু সোহেল ভাইয়ের সাথে তার ঝগড়া হয়ে গেল। সোহেল বললেন, “তোমার অ্যাটিটিউড ঠিক নেই।” রাহাত আর চুপ করে থাকতে পারল না। “স্যার, আমি সাত বছর ধরে কাজ করছি। প্রতি প্রজেক্টে আমার কন্ট্রিবিউশন আছে। আপনি শুধু চিৎকার করেন।”
সেদিনই রাহাতকে বাড়ি চলে যেতে বলা হলো। “দুই মাস নোটিস।”
বাড়ি ফিরে সে প্রথমবারের মতো কাঁদল। বাবাকে ফোন করে বলতে পারল না। মাকে বলল, “কোনো সমস্যা নেই।” কিন্তু রাতে ঘুম এলো না।
পরদিন নাদিয়া তার ফ্ল্যাটে এলো। হাতে খাবারের প্যাকেট। “শুনেছি। কাঁদবেন না। আমরা নতুন কিছু শুরু করব।”
রাহাত অবাক। “আমি?”
“হ্যাঁ। আমি আমার জমানো টাকা দিয়ে ছোট একটা অনলাইন স্টোর শুরু করতে চাই। আপনি মার্কেটিং জানেন। আমরা একসাথে পারব।”
প্রথমে রাহাত রাজি হয়নি। “তোমার বাবা-মা কী বলবেন? আমি তো চাকরিহীন।”
নাদিয়া হেসে বলল, “আমি তাদের বলেছি। তারা বলেছে, ছেলেটা যদি সৎ হয়, তাহলে দেখো।”
পরের ছয় মাস ছিল কঠিন। রাহাতের নোটিস পিরিয়ড শেষ হলো। সে পুরোপুরি নাদিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়ল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রোডাক্ট সোর্সিং, ফটোগ্রাফি, ফেসবুক অ্যাড, ডেলিভারি। প্রথম মাসে লোকসান। দ্বিতীয় মাসে সামান্য লাভ। তৃতীয় মাসে বৃষ্টির মতো অর্ডার আসতে শুরু করল।
একদিন সন্ধ্যায় তারা দুজনে মিরপুরের ছাদে বসে চা খাচ্ছিল। নাদিয়া বলল, “রাহাত, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি চাই না তুমি শুধু দায়িত্বের জন্য আমার সাথে থাকো।”
রাহাত তার হাত ধরল। “আমিও তোমাকে ভালোবাসি। এটা দায়িত্ব নয়। এটা আমার নতুন শুরু।”
বাবা-মা প্রথমে রাগ করেছিলেন। কিন্তু যখন দেখলেন ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তখন মেনে নিলেন। নাদিয়ার বাবা-মাও। বিয়েটা হলো সাধারণভাবে। কোনো বড় আয়োজন নয়। শুধু কাছের মানুষজন।
দুই বছর পর।
রাহাত এখন তার নিজের ছোট অফিসে বসে। তিনজন কর্মচারী। অনলাইন স্টোরটা এখন বেশ বড়। নাদিয়া তার বুটিক চালায়। তাদের একটা ছোট ফ্ল্যাট হয়েছে মিরপুরেই। জানালা দিয়ে বিকেলের রোদ এসে পড়ে।
একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। রাহাত জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নাদিয়া পাশে এসে বলল, “কী ভাবছ?”
“ভাবছি, যদি সেদিন চাকরিটা না যেত, তাহলে হয়তো আমরা আজও অফিসের কফি মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু কথা বলতাম। কখনো সাহস করতাম না।”
নাদিয়া হাসল। “বৃষ্টির পরেই তো রোদ ওঠে।”
রাহাত তার কাঁধে হাত রাখল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। ভেতরে দুজনের হৃদয়ে একটা শান্ত, উষ্ণ আলো।
জীবনটা এমনই। কখনো হারিয়ে যাওয়া, কখনো নতুন করে খুঁজে পাওয়া। শুধু ধৈর্য আর একটু সাহস লাগে। আর একজন মানুষ, যে বিশ্বাস করে।
গল্প শেষ।

Comments

    Please login to post comment. Login