আল্লাহর রহমত
আমাদের জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপ আল্লাহর রহমত ছাড়া সম্ভব নয়। আমরা ভাবি আমরা নিজেরা অনেক কিছু করতে পারি, কিন্তু সত্যি বলতে কি, ছোট্ট একটা ভুল, একটা অসাবধানতা বা এক মুহূর্তের অসতর্কতায় আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে যেতে পারে। তবু আমরা বেঁচে থাকি, চলতে থাকি। এটা শুধুই আল্লাহর অসীম রহমত। রেদোয়ানের জীবনও ছিল এমনই।
রেদোয়ান মিরপুর-১০ নম্বরের একটা ছোট ফ্ল্যাটে থাকত। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। স্ত্রী সালমা, ছেলে আরাফ আর মেয়ে নুসরাতকে নিয়ে তার সংসার। সকালে ফজরের নামাজ পড়ে চা খেয়ে ধানমন্ডির একটা ছোট কোম্পানিতে চাকরি করতে যেত। বেতন তেমন বেশি ছিল না, কিন্তু কোনোমতে চলে যেত। রেদোয়ান খুব কম কথা বলত। শুধু মাঝে মাঝে বলত, “আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।”
সেদিন সকালে বৃষ্টি পড়ছিল ঝমঝম করে। রেদোয়ান ছাতা খুঁজে পেল না। মোবাইলের ব্যাটারি মাত্র বারো শতাংশ। তাড়াহুড়ো করে বাস ধরতে বেরিয়ে পড়ল। বাসে উঠে দাঁড়িয়ে ছিল। ভিড়ের মধ্যে ড্রাইভার যেন একটু বেশিই জোরে চালাচ্ছিল। আগারগাঁওয়ের কাছে হঠাৎ সামনে একটা বড় ট্রাক বেরিয়ে এল। বাসটা প্রায় ধাক্কা খেতে যাচ্ছিল। রেদোয়ানের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল নিচে। ঠিক তখন পেছনের সিট থেকে এক বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন, “ভাই, আস্তে চালান!” ড্রাইভার চমকে ব্রেক কষলেন। বাসটা কেঁপে থেমে গেল। আরেকটু হলে বড় দুর্ঘটনা হয়ে যেত। রেদোয়ান কাঁপা হাতে ফোনটা কুড়িয়ে নিল। অফিসে পৌঁছে চুপচাপ দুই রাকাত নামাজ পড়ল। বিকেলে বাড়ি ফিরে সালমাকে বলল, “আজ আল্লাহ বাঁচিয়েছেন।”
সালমা হেসে বলল, “তুমি তো প্রতিদিন এটা বলো।” রেদোয়ান শুধু হাসল।
কয়েক মাস পর এক রাতে ছোট ছেলে আরাফের হঠাৎ জ্বর এল। শরীর পুড়ে যাচ্ছে, ১০৩ ডিগ্রি। সালমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “এখনই হাসপাতালে নিতে হবে।” রেদোয়ানের পকেটে তেমন টাকা ছিল না। তবু আরাফকে কোলে নিয়ে রিকশা করে মিরপুরের একটা ছোট ক্লিনিকে ছুটল। ডাক্তার দেখে বললেন, “ডেঙ্গু টেস্ট করতে হবে। এখনই অ্যাডমিট করুন।” রেদোয়ান বাইরে এসে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে হাত তুলল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার পুরনো বন্ধু জাহাঙ্গীরের ফোন এল। বছর তিনেক যোগাযোগ ছিল না। জাহাঙ্গীর জিজ্ঞাসা করল, “রেদু, কেমন আছিস ভাই?” রেদোয়ান কাঁপা গলায় সব বলল। জাহাঙ্গীর বলল, “আমি তো ক্লিনিকের খুব কাছেই আছি। দশ মিনিটের মধ্যে আসছি।”
জাহাঙ্গীর এসে সমস্ত খরচ বহন করল। টেস্টে ডেঙ্গু বের হলো না, শুধু ভাইরাল জ্বর। তিন দিন পর আরাফ সুস্থ হয়ে উঠল। রেদোয়ান রাতে শুয়ে ভাবছিল, আল্লাহ কীভাবে ঠিক সময়ে মানুষ পাঠিয়ে দেন।
অফিসে তখন কাটব্যাকের ঢেউ চলছিল। একদিন বস ডেকে বললেন, “রেদোয়ান, তোমার পারফরম্যান্স এবার কম। পরের মাসে না বাড়লে সমস্যা হবে।” রেদোয়ানের বুক শুকিয়ে গেল। বাড়িতে দুই সন্তান, সালমার প্রেশারের ওষুধ, ভাড়া—সবকিছু। সেদিন বাড়ি ফিরে সে চুপ করে বসে রইল। সালমা সব শুনে বলল, “তুমি তো সবসময় বলো আল্লাহ দেখবেন। এবারও দেখবেন।”
পরের সপ্তাহে অফিসের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের ফাইল গুলিয়ে গেল। সবাই রেদোয়ানকে সন্দেহ করছিল। সে রাত জেগে নিজে সব ফাইল আবার ঠিক করে দিল। বস দেখে অবাক হয়ে বললেন, “তুমি তো এটা না করলেও পারতে।” সেই মাসেই তার প্রমোশন হয়ে গেল। বেতন একটু বাড়ল। খুব বেশি নয়, কিন্তু যথেষ্ট। রেদোয়ান বুঝল, আল্লাহ ছোট ছোট সুযোগ দিয়ে বড় রহমত দেখান।
২০২৪ সালের সেই ভয়ংকর বন্যার সময় ঢাকা পানিতে ডুবে গিয়েছিল। অফিস ছুটি। বাড়িতে খাবার প্রায় শেষ। রেদোয়ান ঠিক করল হেঁটে বাজার থেকে কিছু নিয়ে আসবে। পথে পানি কোমর সমান হয়ে গেল। এক জায়গায় পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা কুড়ি-বাইশ বছরের ছেলে এসে তার হাত ধরে টেনে তুলল। “চাচা, আমার সাথে আসেন।” ছেলেটা তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল, গরম চা আর খাবার দিল, পরে রিকশা ঠিক করে দিল। বাড়ি ফিরে রেদোয়ান সালমাকে বলল, “যদি ওই ছেলেটা না থাকত, হয়তো আর ফিরতে পারতাম না।”
এক রাতে হঠাৎ তার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা উঠল। ঘাম দিচ্ছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। সালমা ভয়ে চিৎকার করে উঠল। পাশের বাড়ির ডাক্তার সাহেব সাধারণত রাতে বের হন না। কিন্তু সেদিন তার কুকুরটা অদ্ভুতভাবে ডেকে উঠল। ডাক্তার বাইরে বেরিয়ে দেখলেন রেদোয়ানের অবস্থা। তিনি তাৎক্ষণিক চেক করে বললেন, “এটা হার্ট অ্যাটাক না, গ্যাসের ব্যথা।” ওষুধ দিলেন। পরদিন হাসপাতালে গিয়ে চেকআপ করালে ডাক্তার বললেন, “আরেকটু দেরি হলে বড় সমস্যা হতো। সময়মতো ধরা পড়েছে।”
রেদোয়ান এখন পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েছে। চুলে পাক ধরেছে। ছেলে-মেয়ে বড় হচ্ছে। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর জানালার পাশে বসে চা খায়। সালমা জিজ্ঞাসা করে, “কী ভাবো?”
রেদোয়ান হাসে। বলে, “ভাবি, আমার জীবনে কোনো বড় অলৌকিক ঘটনা ঘটেনি। কোনো স্বপ্নে আল্লাহ এসে কথা বলেননি। কিন্তু প্রতিদিন ছোট ছোট জিনিসে তিনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। একটা বৃদ্ধের চিৎকার, একটা পুরনো বন্ধুর ফোন, একটা ছেলের হাত, একটা কুকুরের ডাক—এগুলোই তো আল্লাহর রহমত। যে চোখ দিয়ে দেখতে চায়, সে সব জায়গায় এই রহমত দেখতে পায়।”
আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, আল্লাহর রহমত ছাড়া এক মুহূর্তও চলতে পারি না। রেদোয়ানের জীবন এই সত্যেরই সাক্ষী।
শেষ
18
View