হোমো সেপিয়েন্সের স্পেসিসটার মধ্যে নারীর চেয়ে পুরুষকে দুইটা কারণে হাজার বছর পিছিয়ে রেখেছে। প্রথমত পুরুষের ধর্ষকামিতা এবং নারীকে অধস্তন দাস করে রাখতে পুরুষ কর্তৃক বানানো বিচিত্র আইন। নারীকে দার্শনিক হয়ে উঠতে দেয়া হয় না। নারী বিজ্ঞানী খুব বেশি নেই। নারী রাজনীতিকও হাতেগোনা। কোনো নারীই ঐশী নীতিশাস্ত্র পৃথিবীতে আনবার সক্ষমতা অর্জন করে না। নারীকে আইন গড়তে দেয়া হয় না। যদিও মা আমেনা, রানী ময়ামায়া কিংবা মেরির মতো মহিয়সি নারীরাই হযরত মুহাম্মদ(সা.), গৌতম বুদ্ধ কিংবা যিশুর মতো মহামানবের জন্মদাতা।
নারী কখনোই ধর্ষক হয় না। এই তকমাটা পুরুষের একার। পুরুষের লালসা থেকে না রক্ষা পায় ছেলেশিশু, কন্যাশিশু কিংবা রজস্বলা নারী। নারীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। বিচ্ছিন্ন দু একটি ঘটনা উদাহরণযোগ্য না।
গতকাল রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। আল-বেরুনী এক্সটেনশন হলের রাস্তায় হেঁটে যাওয়া এক নারী শিক্ষার্থীকে এক বহিরাগত জঙ্গলি গলায় জাল পেঁচিয়ে ঝোপের আড়ালে নিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটির সাহস ও দৃঢ়তা তাকে এযাত্রা বর্বর কাপুরুষের হাত থেকে রক্ষা করেছে। পুরো ক্যাম্পাস এবং আমরা সাবেক জাহাঙ্গীরনগরিয়ানরা এই কন্যার পক্ষে আছি। দুর্বৃত্ত তার কুৎসিত চেহারার ছবি সিসিটিভিতে রেখে গেছে। ক্যাম্পাসে সমন্বিত প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রশাসনও ওই হায়েনাকে ধরতে নিশ্চয়ই মুখিয়ে আছে।
এর আগেও গেল ৩০ এপ্রিল বিকেলে রোকেয়া হলের সামনে এক দুশ্চরিত্র যুবক নারী শিক্ষার্থীদের সামনে অশ্লীল আচরণ করছিল। সে ধরা খেয়ে উত্তম মধ্যম খেয়েছে।
সামগ্রিক ঘটনায় ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। গেল পহেলা বৈশাখে স্থানীয়রা জোরজবরদস্তিতে ক্যাম্পাসে ঢুকে যা খুশি তাই করবার অধিকার চেয়েছে। সেটি কতটা বিপজ্জনক -উল্লেখিত দুইটি ঘটনা তার বড় উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয় পাবলিক পার্কিং এর জায়গা না। এটি শিক্ষার্থীদের পবিত্র আশ্রম। বহিরাগত অবুঝ কারো উৎপাতে ওই আশ্রমের ধ্যানভঙ্গের অধিকার কারোরই থাকা উচিত না। সর্বোচ্চ কঠোর হওয়ার বিকল্প প্রশাসনের কাছে নাই। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা আমাদের সবার দাবি।
বহিরাগত তথাকথিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা সবচেয়ে ভয়ানক। তারা যাচ্ছেতাই ছাইপাশ ভিডিও করে একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালায়। যথারীতি এই কাজটি করে যুবক ক্রিয়েটররা। কোনো নারীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আসে না।
পুরুষ সবখানে তার আধিপত্য বজায় রাখতে চায়। ওই আধিপত্য দেখাতে গিয়ে সমস্ত নৈতিকতা, জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেক খোয়ায়। ফাইনালি নিজেরে সভ্যতা ও ভব্যতার তলানিতে নিয়ে যায়।
বিষয়গুলো কেবলমাত্র জাহাঙ্গীরনগরে আটকে নেই। পুরো দেশটার অধিকাংশ পুরুষ এখন ধর্ষকামী, মর্ষকামী, হিংসুক, পরশ্রীকাতর এবং বিচিত্র অপরাধে জর্জরিত। এই দেশ এখন নারীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এর মূল কারণটা কী? রাষ্ট্রীয়ভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রচারণা না থাকা এবং জন্মনিরোধকের সরবরাহ নিশ্চিত না করায় হাজারে বিজারে অযোগ্য মানুষে ভরে উঠছে বাংলাদেশ। তার ওপর এইসব অশিক্ষিত মূর্খ মানুষদের বড় অংশ এখন মাদকাসক্ত। ইয়াবা ঘরে ঘরে গ্রামে শহরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এবং এই মাদকাসক্তের ৯০ ভাগই পুরুষ। নারী থাকতে পারে সেটি ওই পুরুষেরই দাস বা বশংবদ।
ইয়াবা মূলত মেথঅ্যামফেটামিন (methamphetamine) ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ -একটি শক্তিশালী স্নায়ু উত্তেজক মাদক। এটি শরীর ও মস্তিষ্কে খুব দ্রুত এবং বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একজন ইয়াবাখোর উদ্বেগ, আতঙ্ক, খিটখিটে মেজাজ, সন্দেহপ্রবণতা (paranoia), হ্যালুসিনেশন (অবাস্তব জিনিস দেখা/শোনা) বা হঠাৎ আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে।
তিন বছরের শিশু ধর্ষিত হচ্ছে, কামুকের বিকৃতি থেকে ছেলেশিশুর পায়ুপথও রেহাই পাচ্ছে না, নিজের সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যা করছে পাষণ্ড পিতা। এর প্রায় সবটাই ইয়াবার ইফেক্ট।
আমি যে গ্রামে বড় হয়েছি -ওই গ্রামটা আগে উপজেলায় সবচেয়ে সুশিক্ষিতের গ্রাম বলে পরিচিত ছিল। ওখানে অধ্যাপক, মিলিটারি অফিসার, এমবিবিএস চিকিৎসক, সাংবাদিক, ট্যাক্স কর্মকর্তা সব আছে। এখন ওই গ্রাম থেকে গেল ৫ বছরে তেমন কেউ নজর কাড়তে পারেনি। এইসময় এসে শুনছি -ওই গ্রামটির ৮/৯ বছরের শিশু থেকে ৬০ বছরের বয়োজ্যেষ্ঠ পর্যন্ত ইয়াবা গ্রহণ করে, ইয়াবা কারবার করে এবং রীতিমতো গ্রামের হোমড়া-চোমড়াদের গৃহাভ্যন্তরে আসর বসায়। ওই শিশুদের কেউ কেউ কিশোর গ্যাং সেজে বিভিন্নজনকে হুমকি ধামকি দিয়ে অর্থ ও অবৈধ সুবিধা আদায় করে। প্রতিবেশিদের বাড়িতে চুরি করার এন্তার অভিযোগও উঠছে। যাদের কথা বলছি তারা সবাই অহংকারী শিশ্নধারী। এরা ভবিষ্যতে কী কী করবে কল্পনা করে রাখতে পারেন।
এখন বলেন একটা গ্রামেরই যেখানে এমন অধঃপতন সেখানে মফস্বল শহরের কী অবস্থা? বস্তুত বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম ও শহর এখন মাদকের বাড়াবাড়িতে ভাসছে। সামাজিক অবক্ষয়ের বিস্ফোরণ হতে আর বাকি নাই। আমরা যারা প্রাকৃতিক স্বেচ্ছা সিলেকশনে পুরুষ নাম নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি -কন্যা, জায়া ও জননীর কাছে মুখ দেখাতে পারছি না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল ১৫ দিনে দুইটি ঘটনা আমাদের পুরুষ নামের কলঙ্ককে আরো বেশি কালিমালিপ্ত করেছে। অমাবস্যার অন্ধকারে নিপতিত করেছে।
আমরা ভালো হবো না?
হতে পারি। অমানুষের জন্মনিয়ন্ত্রণ করেন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার বদান্যতায়
যেসব অর্থগৃধ্নু ও আত্মস্বার্থনিমগ্ন কাপুরুষেরা ইয়াবাসহ বিচিত্র মাদক নিয়ন্ত্রণ করে তাদের টুটি চেপে ধরেন। অন্যথায় বিশ্বসভায় নিকৃষ্ট ও বিচ্ছিন্ন জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয় অমর-অক্ষয় করাটা কেউ ঠেকাতে পারবে না।
লেখক: সাংবাদিক
১৩ মে ২০২৬
35
View