Posts

গল্প

শেষ চিঠির শহর

May 14, 2026

hmaburayhan

Original Author মোঃ আবু রায়হান রাকিব

12
View

 “শেষ চিঠির শহর”
শহরটা তখন বৃষ্টিতে ভিজে ছিল। রাস্তাগুলো কাঁচের মতো চকচক করছিল, আর ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো কুয়াশার ভেতর কাঁপছিল।
এই শহরে প্রতিদিন অনেক গল্প জন্মায়, আবার হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু গল্প থাকে—যেগুলো সময়ও মুছতে পারে না।
রাহাত ঠিক তেমনই এক গল্পের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার হাতে একটা পুরোনো চিঠি। কাগজটা হালকা ভিজে গেছে, কালি একটু ছড়িয়ে পড়েছে। তবুও প্রতিটা শব্দ সে চিনতে পারছিল।
চিঠিটা লিখেছিল “মেহজাবিন”।

* প্রথম দেখা *
_____________
তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে।
রাহাত বই খুঁজছিল—হঠাৎ একটা বই তার হাত থেকে পড়ে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে মেহজাবিন সেটা তুলে দিয়েছিল।
“আপনি কি সবসময় বইয়ের সাথে লড়াই করেন?”—হেসে বলেছিল সে।
রাহাত একটু লজ্জা পেয়ে বলেছিল,
“না… আজকে বইটা আমার সাথে লড়াই করছিল।”
সেই একটুকু হাসি—রাহাতের মনে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছিল, যেন বহুদিনের চেনা কেউ।

* ধীরে ধীরে কাছাকাছি *
______________________
দিন যেতে লাগল। লাইব্রেরির নির্দিষ্ট টেবিলটা যেন তাদের ছোট দুনিয়া হয়ে গেল।
মেহজাবিন কবিতা পড়তে ভালোবাসত, আর রাহাত ভালোবাসত গল্প লিখতে।
একদিন মেহজাবিন বলল,
“তুমি কখনো আমাকে নিয়ে কিছু লিখবে?”
রাহাত একটু চুপ করে থেকে বলল,
“তুমি যদি থেকে যাও… তাহলে আমি লিখতেই থাকব।”
সেই কথাটা তখন শুধু কথা ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সেটা একটা প্রতিশ্রুতিতে বদলে গেল।

* বৃষ্টির বিকেল *
________________
এক বিকেলে হঠাৎ শহরে প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো। লাইব্রেরির ছাদে বৃষ্টির শব্দ এমনভাবে পড়ছিল, যেন কেউ আকাশে ঢোল বাজাচ্ছে।
মেহজাবিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ভেজা চুল, হালকা হাসি—সব মিলিয়ে সে যেন কোনো কবিতার লাইন।
রাহাত বলল,
“তুমি বৃষ্টিকে এত ভালোবাসো কেন?”
সে বলল,
“কারণ বৃষ্টি সবকিছু নতুন করে দেয়… মনটাকেও।”
সেদিন রাহাত প্রথম বুঝেছিল—সে শুধু মেহজাবিনকে পছন্দ করে না, সে তাকে অনুভব করতে শুরু করেছে।

* দূরত্বের শুরু *
______________
হঠাৎ করেই সব বদলে গেল।
মেহজাবিনের পরিবার তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। কিছুই বলা গেল না, কিছুই আটকানো গেল না।
শেষ দিনে লাইব্রেরির সেই টেবিলে সে বসেছিল।
হাতে একটা চিঠি রেখে গিয়েছিল।
“রাহাত, আমি জানি না আমরা আবার দেখা করব কিনা… কিন্তু তুমি যাই লিখো, কোথাও না কোথাও আমি থাকব।”

* হারিয়ে যাওয়া *
__________________
এরপর থেকে দিনগুলো অন্যরকম হয়ে গেল।
রাহাত লিখত, কিন্তু আর কাউকে নিয়ে না—শুধু শূন্যতা নিয়ে।
তার লেখা গল্পে এখন বৃষ্টি ছিল, কিন্তু রঙ ছিল না।
সে প্রতিদিন লাইব্রেরিতে যেত, সেই টেবিলে বসত, যেখানে একসময় হাসি ছিল।

✉️ শেষ চিঠি
_______________
বছর কেটে গেল।
একদিন হঠাৎ ডাকপিয়ন একটা চিঠি দিল।
পুরোনো কাগজ, পরিচিত হাতের লেখা।
“আমি ফিরে এসেছি। যদি তুমি এখনও লেখো, তাহলে আমাকে একটা গল্প দিও—যেটার শেষ আমি ঠিক করতে পারি।”

* আবার দেখা *
_____________
রাহাত লাইব্রেরিতে অপেক্ষা করছিল।
বাইরে আবার বৃষ্টি।
দরজা খুলতেই সে থেমে গেল।
মেহজাবিন দাঁড়িয়ে আছে।
আগের মতোই… কিন্তু চোখে একটু অন্যরকম সময়ের ছাপ।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর মেহজাবিন হেসে বলল,
“তুমি কি এখনও লিখো?”
রাহাত ধীরে বলল,
“তুমি চলে যাওয়ার পর থেকেই লিখি… শুধু তোমার জন্য।”
* গল্পের শেষ নয় *
__________________
সে দিন তারা অনেক কথা বলেছিল। হারানো সময়, নীরবতা, অপেক্ষা—সব।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়নি।
রাত নামছিল।
লাইব্রেরির বাইরে বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল।
মেহজাবিন চুপচাপ বলল,
“আমাদের গল্পটা কি শেষ?”
রাহাত জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
“যদি তুমি থাকো, তাহলে কোনো গল্প শেষ হয় না।”
সে চিঠিটা আবার হাতে নিল।
আর এবার সে লিখল—
“শেষ বলে কিছু নেই, যদি কেউ অপেক্ষা করে…”

Comments

    Please login to post comment. Login