Posts

চিন্তা

রেড স্যালুট: বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী!

May 14, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

103
View

মহান মুক্তিযুদ্ধকে ক্রমাগত আন্ডারমাইন করা প্রজন্ম বীরাঙ্গনা টেপরী রাণীকে চিনবে না। টেপরী রাণীর গল্প শুধু একজন মানুষের রোজকার খবর মাত্র নয় -তিনি ছিলেন এই জাতির বিবেকের আয়না।

মঙ্গলবার রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বুধবার সকালে রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়।

১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে টেপরী রাণীর বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। চারদিকে তখন যুদ্ধের ভয়াবহতা। এই অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা ছিলেন মৃত্যু আতঙ্কে। তখন স্থানীয় একজন রাজাকার টেপরী রাণীকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে তুলে দিয়ে পরিবারের সদস্যদের প্রাণ রক্ষার কথা বলেন।

রাজাকারের কথায় অসহায় মধুদাস রায় নিজের মেয়েকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তুলে দিতে বাধ্য হন।

১৯৭১-এ যখন দেশ স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিচ্ছিল, তখন মাত্র ১৭ বছরের ওই কিশোরী নিজের জীবন, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ -সবকিছু উৎসর্গ করেছিলেন পরিবারের প্রাণ বাঁচাতে। ঘৃণ্য ওই রাজাকারের বিশ্বাসঘাতকতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে তুলে দেওয়া সেই মেয়েটি সাত মাস ধরে সহ্য করেছেন অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। আমরা স্বপ্নের স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু তিনি পেয়েছেন সমাজের অবহেলা, অপমান, আর চরম নিঃসঙ্গতা।

স্বাধীনতার পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ফিরে এসে তিনি শুধু যুদ্ধের স্মৃতি নয় -একটি নতুন জীবন বয়ে এনেছিলেন। সেই সন্তানকে নিয়েও সমাজ তাকে আঘাত করেছে বারবার। অথচ তার বাবা বলেছিলেন, 'এই সন্তানই হোক তোর বেঁচে থাকার অবলম্বন মা!' ট্রাজিক এই বাক্যটিই যেন টেপরী রাণীর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ, সবচেয়ে বড় মানবিক বিজয়।

দীর্ঘ অবহেলার পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্র তাকে ‘বীরাঙ্গনা’ স্বীকৃতি দিলে দেশজুড়ে আলোচিত হন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ওই স্বীকৃতিটা কি তার সমস্ত কষ্টের যথাযথ প্রতিদান দিতে পেরেছিল?

আজ তিনি নেই। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় নিয়েছেন -গার্ড অব অনার পেয়েছেন। কিন্তু আমাদের সমাজ কি সত্যিই তাকে সম্মান দিতে শিখেছে? আমরা কি তার চোখের জল, তার নীরব আর্তনাদ এবং তার অদম্য বেঁচে থাকার লড়াই বুঝতে পেরেছি?

টেপরী রাণী শুধু একজন বীরাঙ্গনা নন -তিনি ইতিহাসের এক নীরব আর্তনাদ ও আহাজারি, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় -স্বাধীনতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে জেতা হয় না, এর মূল্য চুকাতে হয় মানুষের জীবন দিয়ে, বিশেষ করে নারীদের শরীর ও আত্মা দিয়ে।

বীরাঙ্গনার ছেলে সুধীর বর্মনের পিছু ছাড়েনি সমাজের কটূক্তি। ছোটবেলা থেকেই সুধীরকে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে অপমান করা হত। বর্তমানে তিনি পেশায় একজন ভ্যানচালক।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, 'টেপরী রাণী শুধু একজন বীরাঙ্গনা নন, তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার জীবন দেশের স্বাধীনতার জন্য নারীদের আত্মত্যাগের গভীরতা স্মরণ করিয়ে দেয়।'

ছেলে সুধীর বর্মন বলেন, 'আমাকে নিয়ে মাকে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু দেশের জন্য মায়ের যে ত্যাগ, সেটা কখনও ভোলার নয়। ২০১৭ সালে মা বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পাওয়ার পর আমাদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি আসে।'

গেল দেড়বছর একাত্তরে হানাদার বাহিনীর সাথে কোলাবোরেট করাদের রাজাকার বলা যায়নি। এখন অবশ্য সংসদেই আইনপ্রণেতারা মাথা উঁচু করে রাজাকার সমর্থকদের পোটেনশিয়াল রাজাকার বলতে পারে। একজন রাজাকারের পরিচয় কী -টেপরী রাণী তার জীবনের দর্পণে প্রতিবিম্বিত করে দেখিয়ে গেছেন।

শ্রদ্ধা, মহাত্মা টেপরী রাণী।
আপনার ত্যাগ আমাদের শক্তি ও সাহস জোগায়।

লেখক: সাংবাদিক 
১৪ মে ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login