Posts

গল্প

ফুলগুলো এখনো ক্ষুধার্ত

May 14, 2026

Sabit Hasan

19
View

ফুল আঁকা দেয়াল। পুরো রুমজুড়ে লাল, নীল আর কালো রঙের ফুলের নকশা। দূর থেকে দেখলে মনে হতো যেন দেয়ালের ফুলগুলো জীবন্ত—চুপচাপ তাকিয়ে আছে।

সেই বাড়িতেই থাকত এক ছেলে। নাম তার অর্ণব। বয়স দশ কিংবা এগারো।
বাড়িটা ছিল গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে। চারদিকে ঝোপঝাড়, পুরোনো গাছ আর ভাঙা রাস্তা। লোকজন বলত, ওই বাড়িতে আগে কেউ থাকত না। কিন্তু অর্ণব যেন কোথা থেকে হঠাৎ এসেই সেখানে থাকতে শুরু করেছিল।

বাসায় সে একাই থাকত।
কেউ জানত না তার বাবা-মা কোথায়।

একদিন গভীর রাতে তার ঘুম ভেঙে গেল।
কারণ—নিঃশ্বাসের শব্দ।

নিজের নয়।
অন্য কারও।

ধীরে ধীরে সে উঠে বসল। ঘরটা অন্ধকার। শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে দেয়ালের ফুলগুলোর ওপর পড়ছে।

ফুলগুলোকে কেমন যেন লাগছিল।
মনে হচ্ছিল, তারা হাসছে।

আবার সেই শব্দ।

“হহহহহহ…”

কেউ যেন ঠিক তার কানের পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।

অর্ণব কাঁপা গলায় বলল,
“কে?”

কোনো উত্তর নেই।

হঠাৎ খাটের নিচ থেকে “ঠক…” করে শব্দ হলো।

সে ধীরে ধীরে নিচে তাকাল।
অন্ধকারের ভিতর দুটো সাদা চোখ জ্বলছে।

অর্ণব ভয়ে চিৎকার করতে গিয়েও পারল না। তার গলা শুকিয়ে গেল।

পরের মুহূর্তেই চোখ দুটো মিলিয়ে গেল।

সে নিজেকে বোঝাতে লাগল,
“না… না… এটা মনের ভুল…”

তারপর ভয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে হাতমুখ ধোয়ার সময় হঠাৎ পিছন থেকে একটা মেয়ের চিৎকার—

“আআআআআ!”

অর্ণবও চিৎকার করে উঠল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একটা মেয়ে। বয়স তার কাছাকাছি। এলোমেলো চুল। সাদা জামা। চোখদুটো অদ্ভুত ফ্যাকাশে।

অর্ণব বলল,
“তুমি কে?”

মেয়েটা বলল,
“আগে তুমি বলো।”

“আমি এখানে থাকি।”

মেয়েটা একটু চুপ করে রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“এই বাড়িতে… কেউ থাকে না…”

ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে একজন বৃদ্ধের গলা—

“এই! তোমরা কারা?”

একজন লোক ভেতরে ঢুকল। নিজেকে বাড়ির মালিক বলল।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—
তিনজনই দাবি করল এই বাড়িতে সে থাকে।

অনেক ঝগড়ার পর তারা ঠিক করল, অন্তত আজকের দিন সবাই এখানেই থাকবে।

সন্ধ্যা নামতেই বাড়িটা কেমন বদলে যেতে লাগল।

দেয়ালের ফুলগুলো কালো হয়ে উঠল।
ঘরের ভেতরে পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
আর মাঝেমধ্যে কোথা থেকে যেন বাচ্চাদের কান্নার শব্দ ভেসে আসতে লাগল।

রাত বারোটার দিকে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।

অর্ণব দেখল, মেয়েটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে।

সে ধীরে ধীরে বলল,
“ওরা আবার জেগে উঠেছে…”

“কারা?”

মেয়েটা উত্তর দিল না।

তার বদলে দেয়ালের ফুলগুলোর দিকে আঙুল তুলল।

অর্ণব তাকিয়ে দেখল—
ফুলগুলোর মাঝখান থেকে ধীরে ধীরে রক্ত বের হচ্ছে।

টপ…
টপ…
টপ…

রক্ত মেঝেতে পড়ছে।

হঠাৎ দেয়ালের ভেতর থেকে অসংখ্য হাত বেরিয়ে আসতে লাগল। কালো, শুকনো হাত। যেন কেউ দেয়ালের ওপাশ থেকে বের হতে চাইছে।

বৃদ্ধ লোকটা ভয়ে দরজার দিকে দৌড় দিল। কিন্তু দরজা খুলল না।

তখনই ঘরের ভেতর একটা বিকৃত কণ্ঠ ভেসে এল—

“তোমরা কেন ফিরে এলে?”

চারদিকে ঠান্ডা হয়ে গেল।

অর্ণব হঠাৎ দেখতে পেল—
দেয়ালে আঁকা ফুলগুলোর মাঝখানে মানুষের মুখ ফুটে উঠছে। তারা কাঁদছে। কেউ সাহায্য চাইছে।

মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি বলেছিলাম… কেউ এখানে থাকে না…”

“মানে?”

মেয়েটা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।

তার চোখের নিচ থেকে কালো রক্ত পড়ছে।

“কারণ… আমরা সবাই অনেক আগেই মারা গেছি…”

অর্ণবের বুক কেঁপে উঠল।

ঠিক তখনই তার মাথায় ঝলক দিয়ে উঠল কিছু দৃশ্য—
আগুন…
চিৎকার…
রক্ত…
আর দেয়ালে ফুল আঁকছে এক পাগল মহিলা।

সে বুঝতে পারল—
বহু বছর আগে এই বাড়িতে একটা পরিবারকে হত্যা করা হয়েছিল। তারপর তাদের লাশ দেয়ালের ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়। সেই থেকেই দেয়ালের ফুলগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে।

হঠাৎ পুরো ঘর কাঁপতে শুরু করল।

দেয়াল ফেটে মানুষের মুখ বেরিয়ে আসছে।
কেউ চিৎকার করছে।
কেউ হাসছে।

বৃদ্ধ লোকটা হঠাৎ নিজের গলা চেপে ধরে মাটিতে পড়ে গেল। যেন অদৃশ্য কেউ তাকে শ্বাসরোধ করছে।

তার চোখ দুটো বেরিয়ে এল।

তারপর—নিস্তব্ধতা।

পরদিন সকালে গ্রামের এক লোক দেখল বাড়ির দরজা খোলা।

সে ভেতরে ঢুকে দেখল পুরো বাড়ি ফাঁকা।

কিন্তু মেঝেতে একটা মেয়ে পড়ে আছে।
মৃত।

দেয়ালে অদ্ভুত ভাষায় লেখা—

“ফুলগুলো এখনো ক্ষুধার্ত।”

লোকটা ভয়ে পিছনে তাকাল।

আর তখনই সে দেখল—
দেয়ালের সব ফুলের মাঝখানে অসংখ্য চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে।

তারপর পুরো বাড়ি জুড়ে একসাথে ফিসফিস শব্দ ভেসে উঠল—

“তুইও থাক…”

লোকটার হার্ট অ্যাটাক হলো।
সেও সেখানেই মারা গেল।

আর সেই রাত থেকে গ্রামের মানুষ বলে—
গভীর রাতে ওই বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে ফুলের গন্ধ পাওয়া যায়।

আর কেউ যদি ভুল করে জানালার ভেতর তাকায়…

তাহলে দেখা যায়—
দেয়ালের ফুলগুলোর মাঝখান থেকে ছোট্ট একটা ছেলে তাকিয়ে হাসছে।


Join to this page for more : লেখো - Official Group 

Comments

    Please login to post comment. Login