গ্রামের নাম চরবটতলী। ছোট্ট একটা গ্রাম। সেখানে থাকত কুদ্দুস নামে এক পিচ্চি ছেলে। বয়স সাত কি আট। কিন্তু তার কাজকর্ম দেখে সবাই বলত, “এই পোলা বড় হইলে গ্রাম না, পুরো দেশ কাঁপাইবো!”
কুদ্দুসের একটা সমস্যা ছিল—সে সবকিছু নিজের মতো বুঝত। আর সেই বুঝাটা এতই আজব ছিল যে মানুষ হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খেত।
তার বাবা মন্টু মিয়া ছিলেন গ্রামের পশু চিকিৎসক। তবে গ্রামের মানুষ তাকে “গরুর ডাক্তার” বলেই চিনত। আর কুদ্দুসের মা শেফালী বেগম ছিলেন খুব খুঁতখুঁতে স্বভাবের। কোনো কিছু দেখলেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিচার করতেন। এজন্য গ্রামের মহিলারা ডাকত “খুটুনি আপা”।
একদিন সকালে—
মন্টু মিয়া বললেন,
“এই যে কুদ্দুস, আজকে তোর স্কুলের মৌখিক পরীক্ষা। কোনো উল্টাপাল্টা কথা বলবি না। সোজা উত্তর দিবি!”
কুদ্দুস মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা বাবা। আল্লাহ ভরসা!”
মন্টু মিয়া মনে মনে বললেন,
“আল্লাহই ভরসা…”
পরীক্ষার দিন
স্কুলে ঢুকেই কুদ্দুস দরজায় নক করল।
“আসসালামু আলাইকুম স্যার, ভিতরে আসতে পারি?”
স্যার খুশি হয়ে বললেন,
“ওয়ালাইকুমুস সালাম। আসো বাবা।”
কুদ্দুস চেয়ার টেনে বসে বলল,
“স্যার, পরীক্ষা শুরুর আগে নাস্তা দিবেন?”
স্যার চশমা নামিয়ে বললেন,
“নাস্তা?”
“জি স্যার। পরীক্ষা দিতে আইছি, খালি পেটে দিলে তো উত্তর বের হবে না!”
স্যার হাসি চেপে বললেন,
“এটা হোটেল না বাবা, স্কুল!”
কুদ্দুস লজ্জা পেয়ে বলল,
“ও আচ্ছা…”
স্যার জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার নাম কী?”
কুদ্দুস গম্ভীর মুখে বলল,
“গাধা।”
স্যার প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন।
“কীইই?!”
“সবাই তো আমাকে গাধা বলে ডাকে। তাই ভাবলাম এটাই আসল নাম।”
“আসল নাম বলো!”
“কুদ্দুস।”
স্যার গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন।
“বয়স কত?”
“৪৩।”
“এটা তোমার বয়স নাকি তোমার বাবার?”
“বাবার।”
“তোমার?”
“মনে হয় সাত… না আট… না থাক, সাতই ধরেন।”
স্যার কপালে হাত দিলেন।
“তোমার বাবার নাম?”
“গরুর ডাক্তার।”
“আর মায়ের নাম?”
“খুটুনি।”
“এগুলো আবার কেমন নাম?”
কুদ্দুস গর্ব করে বলল,
“গ্রামে সবাই এই নামেই ডাকে!”
স্যার এবার হাল ছেড়ে দিলেন।
“যাও বাবা… আল্লাহ তোমার সহায় হোক!”
কুদ্দুস উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ধন্যবাদ স্যার। খাবার নাই?”
ফলাফল প্রকাশের দিন
কয়েকদিন পর রেজাল্টের দিন এলো।
মন্টু মিয়া সকাল থেকেই টেনশনে।
“দেখ কুদ্দুস, পাশ করলে রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি দিব। মাঝামাঝি করলে ছোট খেলনা। আর ফেল করলে…”
কুদ্দুস জিজ্ঞেস করল,
“কি দিবা?”
“বাঁশ দিব!”
স্কুলে গিয়ে স্যার ডাকলেন,
“কুদ্দুস আছে?”
কুদ্দুস দাঁড়িয়ে বলল,
“স্যার, আমি এখনো বেঁচে আছি।”
স্যার বললেন,
“তুমি ২৫ জনের মধ্যে ২৪তম হয়েছো।”
কুদ্দুস খুশিতে বলল,
“মানে আমি শেষ না! আলহামদুলিল্লাহ!”
মন্টু মিয়া মাথা ঘুরে বেঞ্চে বসে পড়লেন।
স্যার বললেন,
“আর আপনার ছেলে বলেছে আপনার নাম গরুর ডাক্তার, মায়ের নাম খুটুনি!”
মন্টু মিয়া লজ্জা পেয়ে বললেন,
“আসলে গ্রামের মানুষ…”
স্যার হেসে বললেন,
“না না, বুঝেছি। তবে ছেলেটা খুব মজার।”
বাজারের লিস্ট
বাড়িতে ফিরে মন্টু মিয়া ছেলেকে ভালোভাবে বুঝালেন।
“দেখ, আমার নাম মন্টু মিয়া। তোর মায়ের নাম শেফালী বেগম। মনে রাখবি।”
“আচ্ছা বাবা।”
বিকেলে কুদ্দুস একটা লিস্ট এনে দিল।
“বাবা, এগুলো কিনে আনবা।”
মন্টু মিয়া লিস্ট দেখে চোখ কপালে তুললেন—
১) ১২টা খাতা
২) ১২টা কলম
৩) ১২টা ব্যাগ
৪) ১২ জোড়া জুতা
৫) ১২টা পোশাক
“এইসব কী? সব বারোটা কেন?”
কুদ্দুস আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল,
“কারণ বছর বারো মাস!”
“তাতে?”
“এক মাসে একটা করে ব্যবহার করব।”
“এক ক্লাসের জন্য ১২টা ব্যাগ লাগে?”
“যদি একটা হারায়?”
“১২টা জুতা?”
“বৃষ্টি, রোদ, কাদা, ঈদ, শীত—সব আলাদা!”
মন্টু মিয়া রাগে কাঁপতে লাগলেন।
ঠিক তখন কুদ্দুস আবার বলল,
“আর একটা সাইকেল লাগবে।”
“কেন?”
“হেঁটে স্কুলে গেলে জুতা নষ্ট হয়।”
কুদ্দুসের বিজ্ঞান আবিষ্কার
একদিন স্কুলে বিজ্ঞান মেলা হলো।
সবাই সুন্দর সুন্দর প্রজেক্ট বানিয়ে আনল। কেউ আগ্নেয়গিরি, কেউ সৌরজগৎ।
আর কুদ্দুস আনল একটা বালতি, দুইটা আলু আর একটা ভাঙা ফ্যান।
স্যার জিজ্ঞেস করলেন,
“এটা কী?”
কুদ্দুস গর্ব করে বলল,
“লোডশেডিং প্রতিরোধ যন্ত্র!”
“কীভাবে কাজ করে?”
“বিদ্যুৎ গেলে বালতিতে পানি ঢালব, তারপর আলু ধরব, তারপর ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকব।”
“এতে কী হবে?”
“কিছু হবে না। কিন্তু সবাই ভাববে আমি বিজ্ঞানী!”
পুরো স্কুল হেসে উঠল।
শেষ ঘটনা
একদিন গ্রামের চেয়ারম্যান কুদ্দুসকে জিজ্ঞেস করলেন,
“বড় হয়ে কী হতে চাও?”
কুদ্দুস একটু ভেবে বলল,
“আমি শিক্ষক হব।”
সবাই অবাক।
চেয়ারম্যান বললেন,
“বাহ! কেন?”
কুদ্দুস বলল,
“কারণ আমি যদি ছাত্র হই, তাহলে স্যাররা পাগল হয়ে যাবে। তাই ভাবলাম উল্টোটা করি!”
সেই কথা শুনে পুরো মাঠে এমন হাসি শুরু হলো যে চেয়ারম্যানের চশমা পর্যন্ত পড়ে গেল।
আর মন্টু মিয়া দূরে দাঁড়িয়ে শুধু একটা কথাই বললেন—
“এই পোলা মানুষ না… চলন্ত বিপদ!”
Join to this page for more : লেখো - Official Group
