Posts

গল্প

বসন্ত ছড়ানো ছাদে স্নিগ্ধ সকাল পড়ে আছে

May 16, 2026

মাহমুদ সানা

89
View

পোড়া গন্ধ ভেসে আসে নীলার নাকে। চিলেকোঠার দখিনের জানালা খোলা। গায়ের কমফোর্টার সরিয়ে খাট থেকে নেমে আসে। ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে যায় ছাদে। ছাদের কার্নিশে হাত দিয়ে দাড়িয়ে থাকে নীলা। দেখছে সকালের আকাশ। তখনও সূর্যের আলোকে সহ্য করা যায়। চোখ ঘোরালে যে গাছগুলো নজরে আসে তার পাতা গুলো কোমল সবুজ। কোকিলের ডাক শুনে নীলা চঞ্চল হয়ে পড়ে। খেয়াল করে কোকিলের ডাক কোন দিক থেকে আসছে। নীলা ছাদের সব দিকে ঘুরে ঘুরে দেখে। কিন্তু খুজে পায়না কোন দিক থেকে আসছে কোকিলের ডাক। নীলা কয়েক বার অনুকরণ করে ডাকতে থাকে ককিলের মতো। অনেক্ষণ আর ডাক শোনা যায়না কোকিলের। নীলার চঞ্চলতা কমে আসে। পোড়া গন্ধ পায়। মিলান মুখে বিরক্ত নামে তার কপালের ভাজে। উচুঁ ছাদ থেকে নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখে। বসন্তে ঝরেপড়া রাস্তার সকল পাতা একত্র করে পোড়াচ্ছে পরিস্কার কর্মীরা। ফাল্গুনের ফিনফিনে বাতাসে নীলার শরীর ছুঁয়ে গেছে। নীলা তার মাথার এলোমেলো চুলগুলো খোঁপা করে রাখে।

পরিষ্কার রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। নীলা ভাবে বাড়ী থেকে নেমে এই গলি রাস্তাটা সে কখনো এতো পরিষ্কার দেখেনি। সকালের এই সময়টাতেই কেবল পরিষ্কার থাকে। আবার রিক্সা-গাড়ী চলাচল মানুষের ছোটাছুটি বাড়ে। রাস্তাটা ক্রমেই অপরিচ্ছন্ন হতে থাকে। অব্যাবহারিত পলিথিন কাগজ সিগারেট চিপসের প্যাকেট ধুলাবালিতে স্তুপের মতো হয়ে থাকে। নীলা ভাবে কি সব অপরিচ্ছন্ন জিনিস পত্র ভাবছি। সকালের পরিস্কার রাস্তায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে নীলার চোখে মুখে চঞ্চলতা ফিরে আসে। মোড় ঘুরে শাওন হেটে আসছে গলির মথায়। রাস্তার এক কর্নারে দাড়িয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে। নীলা ছাদ থেকে দেখে মুচকি হাসে। নীলা টের পায় এখনই তার ফোন বাজবে। নীলা ছাদে দাড়িয়ে থেকে শাওনের চোখ ফেরাতে চায়। কিন্তু নীলা আওয়াজ করে ডাকতে পারেনা। এলাকার মানুষের কারনে। শাওন কান থেকে ফোন নামায়। দুই হাত কোমরে ঠেকিয়ে উপরের দিকে তাকাতেই নীলাকে দেখতে পায়। নীলা হাত তুলে ইশারা দেয়। শাওন ফোন রিসিভ করতে ইশারা করে। নীলা ফোন রিসিভ করে, শাওন: এতো সকালে ঘুম ভাঙল কে রানীর! 

নীলা: স্বপ্নে রাজকুমার এসেছিলো। 

শাওন: আচ্ছা তাই বুঝি! 

নীলা: হুম! রাজকুমার বলেছে, নীলা বসন্তের সকালে ঘুমিও না। বসন্ত ছড়ানো ছাদে স্নিগ্ধ সকাল পড়ে আছে তোমার জন্য। 

শাওন: আচ্ছা! সাহসতো কম না রাজকুমারের। আর কি বলল শুনি। 

নীলা: বলল আর আমার প্রতি পক্ষ সেনাপতি আসবে তাকে তাড়িয়ে দিও। দাড়াতে দিবেনা গলির মাথায়। 

শাওন: তোমার রাজকুমারের সাথে আমি যুদ্ধ করবো আসতেছি উপরে। 

নীলা: আরে না না এসো না উপরে। এতো সকালে কি হয়েছে বলো। 

শাওন: আচ্ছা ঠিক আছে আসছিনা। শোন তৈরী হয়ে নীচে নামো। 

নীলা: ক্যানো। 

শাওন: সারাদিন ঘুরবো চলো। 

নীলা: আরে কিছু বলা নেই হুট করে কোথায় যাবো? 

শাওন: আরে নামো না। কোথাওতো একটা যাবো। 

নীলা: না এখন নামবোনা। 

শাওন: আমি কিন্তু উপরে আসছি। তোমার রাজকুমার কিন্তু ঠেকাতে পারবেনা। 

নীলা: না না এসো না। এটলিস্ট বলো কোথায় যাবা? 

শাওন: সারাদিন ঘুরবো বই মেলায়। 

নীলা: আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু সময় লাগবে। 

শাওন: সে আমি জানি। অতটুকু সময় দেওয়া হলো। 

নীলা: আচ্ছা স্বপ্নের রাজকুমারকে নিয়ে আসবো নাকি! 

শাওন: তুমি কি চাও আমাকে খুনি বানাতে? তাহলে নিয়ে আসতে পারো। 

নীলা: না গো তুমিই আমার পিওর রাজকুমার। 

নীলা রুমের দিকে যায়। রুম মেট ফারজানা এখনও ঘুমের মধ্যে আছে। নীলা ওয়াশরুমে যায়। আয়নায়র দিকে তাকিয়ে নিজেকে অপরিচিত মনে হয়। চঞ্চলতা মিলিয়ে যায়। চোখের নীচে ডার্ক সার্কেল দেখে। আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকে। চুলের খোঁপা ছেড়ে দেয়। ব্যাসিনের উপর কয়েকটা চুল পড়ে। নীলা চুল হাতে তুলে নেয়। নীলার মনে পড়ে সনি স্কয়ারের কথা। বনলতা সেন বেঞ্চিতে বসে শাওনের ঘাড়ে মাথা দিয়েছিলো। নীলার কালো চুল শাওনের পাঞ্জাবিতে পড়ে। শাওন চুল হাতে নিয়ে বলে দেখো তোমার চুল। নীলা ফেলে দিতে বলেছিলো। শাওন বলেছিলো তোমার চুল আমার সামনে মেঝেতে গড়াগড়ি খাবে! না সেটা হবেনা এই বলে পকেটে তুলে রাখে। ফোন বাজার শব্দ কানে আসে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ফোন ধরে। নীলা: বলো। 

শাওন: শোন আমি আইডিবির সামনে আছি তুমি তৈরী হয়ে ওখানে আসো। 

নীলা: ঠিক আছে। নাস্তা করবো এসে কিন্তু। 

শাওন: আচ্ছা। আমিও ক্ষুধার্ত তুমি এলেই খাবো। 

নীলা: আচ্ছা। নাও সময় কমিয়ে দিলাম আসছি। 

শাওন: আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে। 

নীলা মাথা মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে চেয়ারে বসে। নীলার মনে পড়ে যায় একদিন এই আইডিবির সামনে শাওনের সাথে দেখা করার কথা। সেদিন নীলাই ডেকেছিলো। কোচিং থেকে বেরিয়ে দেখা হবে। কিন্তু নীলার ভার্সিটির বন্ধুদের চাপে পড়ে অন্য এক বন্ধুর বাসায় নোট্স আনতে যেতে হয়েছিল। শাওন অপেক্ষা করছিলো ঐ আইডিবির সামনে অনেক গুলো ঘন্টা। নীলা সেদিন মনে মনে বিরক্ত আর কিযে লজ্জা ও অনুতপ্ত নিয়ে সামনে গিয়ে ছিলো শাওনের। কিন্তু শাওন নীলাকে দেখেই বললো, চলো ঐ যে দেখছো আইসক্রিম। চলো আইসক্রিম খেয়ে শীতল হই। নীলা ভাবছে এতো গুলো ঘন্টা অপেক্ষা করলো তবুও শাওনের কোন বিরক্ত হয়নি। নীলা আলমারি খোলার শব্দে ঘুমের মধ্যে ফারজানা নড়াচড়া করলো। নীলা শাড়ি বের করল ছাইরঙা শাড়ি কালো পাড়। শাড়ীটা হাতে নিয়ে খানিক হেসে উঠলো। নীলার মনে পড়ে শাড়ীটা শাওনের দেওয়া। সেদিন খুব গরম ছিলো শহরে। ঘুরতে ঘুরতে দুজনেরই বেহাল অবস্থা। শাওন নীলাকে নিয়ে শিতাতপ নিয়ন্ত্রিত শপিংমলে ঢুকে পড়ে। উদ্দেশ্য হলো শীতল হওয়া। দুজনে শোরুমে শোরুমে অলস ভরে ঠোকে বেরোয়। এর মধ্যে  শাড়ীর দোকানে যায়। শাওন একটা শাড়ী নিয়ে এসে দেখায়। কিন্তু নীলা পছন্দ করেনি। শাওন রেখে দিয়ে আসে। বিকালের দিকে ধানমন্ডি থেকে মিরপুর-১০এ আসে। রিক্সায় বসে শাওন খুব কোমল গলায় বলেছিলো, শাড়ীটায় তোমাকে কিন্তু দেবীর মতো লাগতো। নীলা বলেছিলো, তোমার খুব পছন্দ হয়েছে না। তখন বলতে! শাওন বলেছিলো, তোমার পছন্দ হয়নি তাই… একে বারে হয়নি তা না। ওমনি শাওন রিক্সা থেকে নেমেই সিএনজি তারপর ধানমন্ডি তারপর এই সেই ছাইরঙা কালো পাড়ের শাড়ী। নীলা বারন করে ছিলো আজ থাক অন্য দিন গিয়ে নিয়ে আসা যাবে। ওইদিন কোন কথায়ই শোনেনি আর। 

নীলা শাড়ীটা পরে আয়নার সামনে দাড়ায়। আয়নার মধ্যে কম্বলে মোড়ানো ফারজানার চোখে চোখ পড়ে। ফারজানা ঘুম ঘুম গলায় বলে কি সুন্দরী নাগিন এতো সাজগোজ কেনো সকাল সকাল। নীলা বলে রাজকুমার অপেক্ষা করছে বুঝলা পেতনী। তাই নাকি! আবার কারে দংশন করলা নাগীন। নীলা বলে না পেতনী আমার শাওন। ফারজানার চোখ অন্ধকার হয়ে আসে। বিছানা থেকে উঠে সোজা কিচেনে যায়। ফ্রিজ থেকে রুটি এনে গরম করে ডিম ভেজে আনে। নীলার তৈরী হওয়া শেষ। ফারজানা বলে নাস্তা কর। নীলা বলে না গো আমার পেতনী! শাওন অপেক্ষা করছে এক সাথে নাস্তা করবো। ফারজানা নীলাকে ধরে চেয়ারে বসায়। সামনে নাস্তা দিয়ে বলে দোস্ত একটা রুটি খা কিছু হবেনা বাইরে গিয়ে আবার খাস। নীলা বলে না দোস্ত। ফারজানা নাছোড়বান্দা ছাড়েনা। নীলা খেয়ে নেয়। তারপর ফারজানা লাল রঙের এক পাতা ওষুধ এনে বলে একটা খা। নীলা বলে ও হ্যাঁ ভুলে গিয়েছিলামরে। কিন্তু বান্ধবী এই ওষুধ খেলে মাথা জানি কেমন করে। শাওন বলেছে আজকে সারাদিন বাইরে ঘুরবে। ফারজানা বলে আচ্ছা খা একটা অসুবিধা হবেনা। নীলার ওষুধ খাওয়া শেষ হলে ফারজানা নীলার হাত ধরে কান্না করতে থাকে। নীলার চোখ মুখ ছায়া ছায়া হয়ে ওঠে। ফারজানা কান্না জড়ানো গলায় বলে মৃত্যুতে আমাদের কোন হাত নেই রে। নীলা বসে পড়ে। ফারজানার কোলে মাথা রেখে নীলা তুমুল চিৎকার করে কান্না করতে থাকে। 

Comments

    Please login to post comment. Login