চরম শত্রুর বিপদেও এগিয়ে যাব কিংবা তার মৃত্যুতে শোকাভিভূত হব -বয়োজ্যেষ্ঠরা আমাদেরকে এটাই শেখাতেন। কিন্তু সেই সুবর্ণ দিন আজ আর নাই। একজন মানুষ খুব অল্পবয়সে দূরারোগ্য ব্যাধিতে মারা গেলেন -এই খবরে এই কন্যাটির বাবা যখন অঝোরে কাঁদছেন আপনি তখন হাহাহা করে হাসছেন। মেয়েটির অপরাধ কী? তিনি জুলাই গণ-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। আপনি যখন রাজনীতি থেকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পথ রুদ্ধ করবেন -বিরোধীপক্ষ আন্দোলন করবে না? আপনারা যাদের কাছে ক্ষমতা খুইয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আপনারা কোনো আন্দোলন চান না?
এই যে পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা ও ঘৃণাচর্চা এতে কার কি লাভ হচ্ছে জানি না। তবে আপনাদের দুইপক্ষের আসল রূপটা সবার কাছে প্রতিভাত হচ্ছে। পরবর্তী জেনারেশনের জন্য আপনাদেরকে চিনে নিতে খুব সহজ হবে।
ক্ষমতাচ্যুত আ.লীগাররা কারিনার মৃত্যুতে হাসছে। হাসবার আগে একবার অন্তত নিজেদের অবস্থানটা ভাবুন? কোনো পরিস্থিতিতেই দেশে ফিরবার মুখ দূরের কথা প্রকাশ্যে আসবার সামর্থ্যও আপনাদের এখন নাই। সেইদিকে মন না দিয়ে একজন কন্যার মৃত্যুতে আপনারা তামাশা করছেন। ক্ষমতাহারা হলে মানুষ দুর্বল হয় জানি -কিন্তু বিবেকহীন হয় এটা আপনাদের না দেখলে অনুমান করা যেত না।
আপনাদের হাস্যরসে লাভটা কী হচ্ছে? আপনাদের কীর্তিকলাপকে ঢাকা দিতে পাকিস্তানিরা যাকে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন তথা পাকিস্তান ভাঙার শ্রেষ্ঠ নেতা মানে সেই শেখ মুজিবের গলায় জুতোর মালা আবার সামনে আসছে। শেখ মুজিবের মাথায় ন্যাক্কারজনক রেচনক্রিয়া করবার মানবিক বৈকল্য পুনর্বার প্রকাশ্যে টেনে আনা হচ্ছে। এতে দুইপক্ষের কী ফায়দা হচ্ছে জানি না -তবে আপনাদের উভয়পক্ষকেই মানুষ চিনে রাখছে। দেশে বিশুদ্ধ গণতন্ত্র ফিরলে আপনারা মুখ দেখানোর জায়গা পাবেন না।
ইতিহাসের এক গুরুতর ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটা যে -জয়ীরা পরাজিতদের সঙ্গে কী করে? এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হয় ভবিষ্যৎ রাজনীতি, এমনকি সভ্যতার গতিপথও।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রশক্তি কর্তৃক Treaty of Versailles বা ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির ওপর যে কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছিল, তা শুধু একটি রাষ্ট্রকে শাস্তি দেয়নি; বরং অপমান, দারিদ্র্য ও ক্ষোভের ভিত গেঁথে দিয়েছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই উত্থান অ্যাডলফ হিটলার ও নাৎসি বাহিনীর। এবং পৃথিবী আবার ডুবে যায় আরও ভয়াবহ যুদ্ধে। অর্থাৎ, প্রতিশোধমূলক বিজয় শেষ পর্যন্ত বিজয়কেই অনিশ্চিত করে তোলে -এটি ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা। বাংলাদেশের নতুনদিনের রাজনীতিক এনসিপিয়ানরা ইতিহাসের এই রাজনৈতিক পাঠ নিতে পারে। তারা বয়সে তরুণ -শেখার সুযোগ তাদের সামনেই বেশি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের Marshall Plan এক ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরে। এখানে পরাজিত জার্মানি ও জাপানকে ধ্বংসস্তূপে ফেলে না রেখে পুনর্গঠনের সহায়তা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলত, শত্রুরাই হয়ে ওঠে মিত্র, এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল রূপ নেয় অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে। একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ পতনের পর নেলসন ম্যান্ডেলা প্রতিশোধের পথ না বেছে ‘সত্য ও পুনর্মিলন’-এর রাজনীতি চালু করেন, যা একটি সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধকে এড়িয়ে জাতিকে ধীরে হলেও স্থিতির পথে নিয়ে যায়। এখানে ক্ষমা কৌশলগত ও মানবিকতার অতুল্য মিশ্রণ হিসেবে ধরা দেয়।
মানছি সব ইতিহাস এতটা সহনশীল নয়। Fall of Baghdad–এর মতো ঘটনায় আমরা দেখি নির্মম ধ্বংস, যেখানে পরাজিতকে শুধু হারানো হয় না, মুছে ফেলা হয়। এর ফল হয় সভ্যতার পশ্চাদপসরণ। ফল অব বাগদাদ ১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের দ্বারা বাগদাদ নগরীর ঐতিহাসিক পতন ও ধ্বংসযজ্ঞকে বোঝায়। এটি ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি, যা মধ্যযুগে মুসলিম সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র এবং 'ইসলামী স্বর্ণযুগের' সমাপ্তি ঘটিয়েছিল।
আমেরিকান সিভিল ওয়ার বা গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-১৮৬৫) ছিল আমেরিকার উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে সংঘটিত একটি রক্তক্ষয়ী সংঘাত। দক্ষিণের দাসপ্রথা-সমর্থক ১১টি রাজ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে 'কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা' গঠন করলে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয় এবং মূল দ্বন্দ্ব ছিল দাসপ্রথা ও অঙ্গরাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসন। গৃহযুদ্ধ পরবর্তী আমেরিকায় আংশিক পুনর্মিলন ও আংশিক বৈষম্য এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্ম দেয়। ফলে স্পষ্ট হয় -জয়ের পর আচরণই আসল রাজনীতি। জয়ীরা যদি প্রতিশোধে অন্ধ হয়, তবে তারা ভবিষ্যতের সংঘাত বপন করে; আর যদি পরাজিতকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে চায়, তবে ইতিহাস তাদের হাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট আলোচনা থেকে একথা অনস্বীকার্য যে, আপনি যদি রাজনৈতিক যুদ্ধে পরাজিতের প্রতি ক্ষমা, সহনশীলতা, রিকনসিলিয়েশন, পুনর্গঠন, সহমর্মিতাসমেত এইসব ইতিবাচক অভিব্যক্তি দেখান সেটি উভয়পক্ষের জন্য সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। আর আপনি যদি পরাজিতকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার প্রয়াসী হন -সেটি উভয়পক্ষের ধ্বংসকে অনিবার্য করে তুলতে পারে। পৃথিবীর তাবৎ রাজনৈতিক ইতিহাস তো সেটাই বলে।
মোদ্দাকথা হলো আপনি কাকে ক্ষমা করবেন, কার সাথে পুনর্মিলনের কথা ভাববেন -সে যদি আপনার বিজয় মেনে নিয়ে তাদের নিজেদের পরাজয় স্বীকার না করে? অনুতাপ না দেখায়?
তাহলে যা হচ্ছে তাই হোক। কোনোপ্রকার শ্রদ্ধাবোধ, সভ্যতা ও ভব্যতার ধার না ধেরে আপনারা একে অপরকে নিয়ে হাসাহাসি করেন। পরস্পরের প্রতি ঘৃণাচর্চার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা দেখান। এমনকি মানুষের অকাল মৃত্যু নিয়েও তামাশা করেন -আমরা অবাক বিস্ময়ে আপনাদের তলিয়ে যাওয়া ভাবগতি দেখি। আর এইগুলা মানুষের কাজ এটা ভেবে নির্বাক ও নিস্তব্ধ হয়ে যাই!
লেখক: সাংবাদিক
১৬ মে ২০২৬