Posts

গল্প

হারিয়ে যাওয়া দ্বীপের রহস্য

May 17, 2026

Moonlight

24
View


প্রথম অধ্যায়: ঝড়ের রাতে অদ্ভুত মানচিত্র
চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের ছোট্ট এক গ্রামে থাকত রায়ান নামের এক সাহসী কিশোর। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল পৃথিবীর অজানা জায়গা ঘুরে দেখা। অন্য ছেলেরা যখন মাঠে খেলত, রায়ান তখন পুরোনো বই পড়ত, মানচিত্র দেখত আর গুপ্তধনের গল্প শুনত।
এক বর্ষার রাতে প্রবল ঝড় শুরু হলো। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল, চারদিকে অন্ধকার। রায়ান তার দাদুর পুরোনো কাঠের ঘরে বসে ছিল। হঠাৎ জানালার পাশে ধুপ করে কিছু একটা পড়ার শব্দ হলো।
সে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল। দেখল, একটা পুরোনো চামড়ার ব্যাগ জানালা ভেঙে ঘরের ভেতরে এসে পড়েছে।
ব্যাগটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি হলুদ হয়ে যাওয়া মানচিত্র এবং একটি চিঠি।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“যে এই মানচিত্র পাবে, সে যেন সাবধান থাকে। এই পথ শুধু সাহসীদের জন্য। হারিয়ে যাওয়া ‘মিরাজ দ্বীপ’-এ এমন এক রহস্য লুকিয়ে আছে যা পুরো পৃথিবী বদলে দিতে পারে।”
রায়ানের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
পরদিন সে তার বন্ধু মায়া আর তানভীরকে সব বলল।
মায়া ছিল বুদ্ধিমান ও শান্ত স্বভাবের মেয়ে। আর তানভীর ছিল দারুণ মজার কিন্তু খুব সাহসী।
তিনজন মানচিত্রটি মাটিতে বিছিয়ে দেখল। মানচিত্রে পাহাড়, নদী, সমুদ্র আর একটি লাল চিহ্ন আঁকা ছিল।
তানভীর উত্তেজিত হয়ে বলল, — “আমরা যাচ্ছি, তাই তো?”
মায়া সন্দেহের চোখে তাকাল। — “এটা বিপজ্জনকও হতে পারে।”
রায়ান দৃঢ় কণ্ঠে বলল, — “জীবনে বড় কিছু করতে হলে ঝুঁকি নিতেই হয়।”
সেই রাতেই তারা সিদ্ধান্ত নিল— তারা হারিয়ে যাওয়া দ্বীপের সন্ধানে যাবে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: পাহাড়ের গোপন পথ
তিনদিন পর তারা যাত্রা শুরু করল। সঙ্গে ছিল কিছু শুকনো খাবার, টর্চ, দড়ি, ছুরি আর মানচিত্র।
প্রথম গন্তব্য ছিল রহস্যময় কালো পাহাড়।
পাহাড়ে উঠতে উঠতে চারপাশে কুয়াশা ঘন হয়ে উঠল। অদ্ভুত সব শব্দ ভেসে আসছিল জঙ্গলের ভেতর থেকে।
হঠাৎ মায়া চিৎকার করে উঠল— — “সাবধান!”
রায়ানের পা পিছলে নিচে পড়ে যাচ্ছিল। তানভীর দ্রুত হাত ধরে তাকে টেনে তুলল।
তানভীর হাসল। — “বন্ধু, গুপ্তধন পাওয়ার আগেই যেন মরিস না!”
কিছুদূর এগোতেই তারা দেখতে পেল একটি গুহা। গুহার দরজায় অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা ছিল।
মায়া বলল, — “এই চিহ্নগুলো প্রাচীন জলদস্যুদের।”
ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা বাতাস তাদের শরীর কাঁপিয়ে দিল।
গুহার দেয়ালে মশাল জ্বলছিল, অথচ সেখানে কোনো মানুষ ছিল না।
হঠাৎ তারা একটা গর্জন শুনল।
অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল বিশাল এক কালো নেকড়ে।
তানভীর ভয়ে পিছিয়ে গেল। — “এটা তো দানব!”
রায়ান সাহস করে সামনে দাঁড়াল। তার হাতে ছিল আগুনের মশাল।
নেকড়েটি আগুন দেখে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল এবং অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
গুহার ভেতরে তারা একটি পাথরের দরজা পেল। দরজায় লেখা—
“সত্যিকারের সাহসীই সামনে যেতে পারবে।”
রায়ান দরজায় চাপ দিতেই সেটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ভেতরে ছিল এক লুকানো পথ।
তৃতীয় অধ্যায়: সমুদ্রের অভিশাপ
গোপন পথ পেরিয়ে তারা পৌঁছাল সমুদ্রের ধারে।
সেখানে একটি পুরোনো জাহাজ বাঁধা ছিল। জাহাজটির নাম ছিল “ব্ল্যাক স্টর্ম”।
এক বৃদ্ধ নাবিক জাহাজের পাশে বসে ছিল।
বৃদ্ধ বলল, — “মিরাজ দ্বীপে যেতে চাও?”
রায়ান অবাক হয়ে বলল, — “আপনি কীভাবে জানলেন?”
বৃদ্ধ মুচকি হাসল। — “অনেকেই গেছে। কিন্তু খুব কম মানুষই ফিরে এসেছে।”
মায়া ধীরে বলল, — “আমরা যাব।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, — “তাহলে প্রস্তুত হও মৃত্যুর মুখোমুখি হতে।”
রাতে জাহাজ যাত্রা শুরু করল।
সমুদ্র ছিল ভয়ঙ্কর অশান্ত। বিশাল ঢেউ জাহাজে আঘাত করছিল।
হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে গেল।
এক প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলো।
বিদ্যুৎ চমকানোর আলোতে তারা দেখল দূরে বিশাল কিছু একটা নড়ছে।
তানভীর কাঁপা গলায় বলল, — “ওটা কী?”
পরক্ষণেই সমুদ্র ফেটে উঠে এল এক বিশাল সমুদ্র দানব।
তার চোখ জ্বলছিল আগুনের মতো।
দানবটি জাহাজে আঘাত করতেই জাহাজ দুলে উঠল।
রায়ান চিৎকার করল, — “দড়ি ধরো!”
মায়া দ্রুত কামানের পাশে গিয়ে আগুন জ্বালাল।
বুম!
কামানের গোলা দানবের গায়ে লাগতেই সেটি প্রচণ্ড গর্জন করে পানির নিচে চলে গেল।
কিন্তু ঝড় থামল না।
জাহাজ ভেঙে যেতে শুরু করল।
শেষ মুহূর্তে তারা একটা ছোট নৌকায় লাফ দিল।
প্রচণ্ড ঢেউ তাদের অজানা অন্ধকারের দিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
চতুর্থ অধ্যায়: মিরাজ দ্বীপ
সকালবেলা রায়ানের ঘুম ভাঙল পাখির শব্দে।
চোখ খুলতেই সে দেখল তারা এক অদ্ভুত দ্বীপে এসে পৌঁছেছে।
চারদিকে বিশাল গাছ, অদ্ভুত ফুল আর রহস্যময় নীরবতা।
মায়া ফিসফিস করে বলল, — “এটাই কি মিরাজ দ্বীপ?”
হঠাৎ তারা দেখতে পেল দূরে ধোঁয়া উঠছে।
তারা এগিয়ে গিয়ে দেখল এক প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ।
পাথরের তৈরি মূর্তি আর ভাঙা দেয়াল দেখে মনে হচ্ছিল বহু বছর আগে এখানে মানুষ বাস করত।
একটি দেয়ালে লেখা ছিল—
“যে শক্তিকে জাগাবে, সে পৃথিবী ধ্বংস করবে।”
তানভীর বলল, — “আমার এটা ভালো লাগছে না।”
তারা শহরের মাঝখানে একটি বিশাল মন্দির দেখতে পেল।
মন্দিরের দরজায় ছিল তিনটি তালা।
মানচিত্রে একটি ধাঁধা লেখা ছিল—
“আগুন, পানি ও বাতাস— তিন শক্তি এক হলে খুলবে পথ।”
মায়া বুঝতে পারল এটা এক ধরনের পরীক্ষা।
তারা তিনদিকে খুঁজতে শুরু করল।
রায়ান আগুনের মশাল পেল।
তানভীর একটি ঝর্ণার নিচে লুকানো নীল পাথর খুঁজে পেল।
আর মায়া পাহাড়ের চূড়ায় একটি রূপালি পালক পেল।
তিনটি জিনিস একসঙ্গে দরজায় রাখতেই প্রচণ্ড শব্দে মন্দির খুলে গেল।
পঞ্চম অধ্যায়: অন্ধকারের রক্ষক
মন্দিরের ভেতর ছিল অন্ধকার।
দেয়ালে আগুন জ্বলে উঠতেই তারা দেখতে পেল বিশাল এক সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই ঠান্ডা বাতাস বইতে লাগল।
হঠাৎ গভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
“কে আমার ঘুম ভাঙাল?”
অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল লম্বা কালো পোশাক পরা এক ব্যক্তি।
তার চোখ দুটো লাল আগুনের মতো জ্বলছিল।
সে বলল, — “আমি এই দ্বীপের রক্ষক।”
রায়ান সাহস করে বলল, — “আমরা সত্য জানতে এসেছি।”
লোকটি হেসে উঠল। — “সত্য? সত্য জানলে তোমরা বাঁচবে না।”
হঠাৎ চারপাশ কাঁপতে শুরু করল।
মাটি ফেটে বেরিয়ে এল পাথরের সৈন্য।
তানভীর চিৎকার করল, — “দৌড়াও!”
ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হলো।
রায়ান তার মশাল দিয়ে এক সৈন্যকে আঘাত করল।
মায়া দেয়ালে একটি অদ্ভুত চিহ্ন দেখতে পেল।
সে বুঝতে পারল এই সৈন্যদের শক্তি ওই চিহ্ন থেকেই আসছে।
সে চিৎকার করল, — “ওই পাথরটা ভাঙো!”
রায়ান লাফ দিয়ে তলোয়ার দিয়ে পাথরে আঘাত করতেই সেটা ভেঙে গেল।
মুহূর্তেই সব সৈন্য থেমে গেল।
রক্ষক রাগে গর্জে উঠল।
সে হাত তুলতেই কালো ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
রায়ান বুঝতে পারল, এই মানুষটি সাধারণ কেউ নয়।
ষষ্ঠ অধ্যায়: গুপ্তধনের আসল রহস্য
রক্ষক বলল, — “তোমরা যে গুপ্তধনের খোঁজে এসেছ, সেটা সোনা নয়।”
সে তাদের একটি বিশাল কক্ষে নিয়ে গেল।
কক্ষের মাঝখানে ভাসছিল নীল আলোয় জ্বলতে থাকা এক গোলক।
রক্ষক বলল, — “এটাই ‘হার্ট অব মিরাজ’। এতে এমন শক্তি আছে যা পুরো পৃথিবী ধ্বংস করতে পারে।”
মায়া অবাক হয়ে বলল, — “তাহলে এটা ধ্বংস করে ফেলুন!”
রক্ষক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। — “এটা ধ্বংস করা যায় না। শুধু লুকিয়ে রাখা যায়।”
হঠাৎ পেছন থেকে গুলির শব্দ হলো।
বৃদ্ধ নাবিক সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু এখন তার চেহারা বদলে গেছে।
সে বলল, — “অবশেষে আমি শক্তিটা পেলাম!”
রায়ান বিস্ময়ে বলল, — “আপনি!”
বৃদ্ধ হেসে উঠল। — “আমি বহু বছর ধরে এই শক্তির খোঁজ করছি।”
সে গোলকের দিকে এগিয়ে গেল।
রক্ষক তাকে থামাতে গেলে বৃদ্ধ গুলি করল।
রক্ষক মাটিতে পড়ে গেল।
তারপর বৃদ্ধ গোলক স্পর্শ করতেই পুরো মন্দির কাঁপতে শুরু করল।
নীল আলো লাল হয়ে গেল।
মায়া আতঙ্কিত হয়ে বলল, — “সে শক্তিটা জাগিয়ে ফেলেছে!”
বৃদ্ধের শরীর ধীরে ধীরে কালো শক্তিতে ঢেকে গেল।
সে ভয়ংকর কণ্ঠে বলল, — “এখন পুরো পৃথিবী আমার!”
সপ্তম অধ্যায়: শেষ যুদ্ধ
মন্দির ভেঙে পড়তে শুরু করল।
চারদিকে আগুন জ্বলছে।
রায়ান বুঝতে পারল, এখন কিছু না করলে সবাই মারা যাবে।
রক্ষক দুর্বল কণ্ঠে বলল, — “গোলকটাকে আগ্নেয়গিরির আগুনে ফেলতে হবে।”
দ্বীপের মাঝখানে ছিল একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি।
কিন্তু সেখানে পৌঁছানো সহজ নয়।
বৃদ্ধ এখন অমানবিক শক্তিশালী হয়ে গেছে।
সে হাত তুলতেই পাথর উড়ে আসতে লাগল।
তানভীর কষ্ট করে বলল, — “আমি ওকে আটকাচ্ছি! তোমরা যাও!”
রায়ান চিৎকার করল, — “না!”
কিন্তু তানভীর হাসল। — “বন্ধুত্ব মানে একে অপরের জন্য লড়াই করা।”
সে দৌড়ে গিয়ে বৃদ্ধের সামনে দাঁড়াল।
এই সুযোগে রায়ান আর মায়া গোলক নিয়ে আগ্নেয়গিরির দিকে ছুটল।
পেছনে বিস্ফোরণের শব্দ হচ্ছিল।
অবশেষে তারা আগ্নেয়গিরির কিনারায় পৌঁছাল।
কিন্তু ঠিক তখনই বৃদ্ধ এসে হাজির হলো।
তার চোখে আগুন জ্বলছে।
সে বলল, — “গোলকটা আমাকে দাও!”
রায়ান মাথা নাড়ল। — “কখনো না!”
ভয়ংকর লড়াই শুরু হলো।
বৃদ্ধ রায়ানকে আঘাত করে ফেলে দিল।
গোলকটি গড়িয়ে আগ্নেয়গিরির কিনারায় চলে গেল।
মায়া দৌড়ে সেটা ধরতে গেল।
কিন্তু সে পিছলে পড়তে লাগল।
রায়ান দ্রুত তার হাত ধরল।
নিচে ফুটন্ত লাভা।
মায়া কাঁপা গলায় বলল, — “গোলকটা ফেলে দাও!”
রায়ান শেষ শক্তি দিয়ে গোলকটিকে আগ্নেয়গিরির ভেতর ছুঁড়ে দিল।
মুহূর্তেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হলো।
নীল আলো আকাশে ছড়িয়ে পড়ল।
বৃদ্ধ ভয়ংকর চিৎকার করে আগুনের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
তারপর পুরো দ্বীপ কাঁপতে শুরু করল।
অষ্টম অধ্যায়: নতুন সূচনা
রায়ান, মায়া আর আহত তানভীর কোনোভাবে সমুদ্রতীরে পৌঁছাল।
দেখল, পুরোনো জাহাজটি এখনো ভাসছে।
তারা দ্রুত জাহাজে উঠে পড়ল।
দূরে মিরাজ দ্বীপ ধীরে ধীরে সমুদ্রের নিচে ডুবে যেতে লাগল।
সূর্য উঠছিল আকাশে।
তিন বন্ধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
তানভীর হেসে বলল, — “আমরা সত্যিই বেঁচে ফিরেছি?”
মায়া মৃদু হাসল। — “হয়তো পৃথিবী আমাদের বিশ্বাসও করবে না।”
রায়ান সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল, — “সব রহস্য সবার জানার দরকার নেই।”
কয়েকদিন পর তারা নিজেদের গ্রামে ফিরে এল।
মানুষ শুধু জানল তারা সমুদ্রে হারিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু মিরাজ দ্বীপের রহস্য তারা কারও কাছে বলেনি।
এক রাতে রায়ান তার ঘরে বসে ছিল।
হঠাৎ সে দেখতে পেল দরজার সামনে একটি ছোট বাক্স রাখা।
বাক্স খুলতেই সে অবাক হয়ে গেল।
ভেতরে ছিল আরেকটি পুরোনো মানচিত্র।
আর সেখানে লেখা—
“অভিযান কখনো শেষ হয় না…”
রায়ানের মুখে ধীরে ধীরে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
সমুদ্রের ওপারে হয়তো আবারও কোনো অজানা রহস্য তাদের অপেক্ষায় আছে।
সমাপ্ত

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Fahmida fahmi 3 weeks ago

    সুন্দর লিখনী