Posts

নন ফিকশন

কুরবানীর ইতিহাস

May 18, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

7
View

কুরবানীর ইতিহাস
প্রায় চার হাজার বছর আগের কথা। মেসোপটেমিয়ার উর নগরীতে, যেখানে নদীর পাড়ে ধুলোয় মিশে থাকতো প্রাচীন সভ্যতার চিহ্ন, সেখানে জন্ম নিয়েছিলেন এক শিশু। তার নাম ইব্রাহিম। তিনি ছিলেন আজারের ছেলে। আজার ছিলেন রাজদরবারের মূর্তি-নির্মাতা। রাজা নমরুদের রাজত্বে সূর্যকে দেবতা মানা হতো, চাঁদকে, তারকাকে। মানুষ পাথরের মূর্তির সামনে মাথা নত করতো। কিন্তু ইব্রাহিম ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম ছিলেন।
তিনি প্রশ্ন করতেন, “যে মূর্তি তুমি নিজে গড়ো, সেই মূর্তি কীভাবে আমাদের রক্ষা করবে বাবা?” আজার রাগ করতেন। নমরুদের দরবারে এমন প্রশ্ন বিপজ্জনক ছিল। কিন্তু ইব্রাহিম থামেননি। তিনি রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতেন—যিনি এই সূর্য, চাঁদ, তারা সৃষ্টি করেছেন, তিনিই একমাত্র সত্য। একদিন তিনি প্রকাশ্যে নমরুদের দেবতাদের অস্বীকার করলেন। ফলে তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হলো। কিন্তু আল্লাহর হুকুমে আগুন ইব্রাহিমের জন্য শীতল ও শান্ত হয়ে গেল। এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা।
ইব্রাহিম উর ছেড়ে হিজরত করলেন। তিনি ঘুরে বেড়ালেন বিভিন্ন দেশে—শাম, মিশর, তারপর কানানের দিকে। বয়স বাড়ছিল। সন্তান ছিল না। তাঁর স্ত্রী সারাহ বন্ধ্যা ছিলেন। তবু তিনি আল্লাহর প্রতি ভরসা রেখেছিলেন। একদিন স্বপ্নে আদেশ এলো—তিনি যেন হাজেরা নামের এক মিশরীয় দাসীকে বিয়ে করেন। হাজেরা গর্ভবতী হলেন। তাঁদের ঘরে এলো এক পুত্র—ইসমাইল।
ইব্রাহিমের বয়স তখন প্রায় আশি। চোখে আনন্দের আলো। কিন্তু সারাহের মনে ঈর্ষা জাগল। একদিন তিনি ইব্রাহিমকে বললেন, “এই মা-ছেলেকে নিয়ে যাও, এখান থেকে দূরে কোথাও রেখে এসো।” ইব্রাহিমের বুকে বাজল। কিন্তু তিনি আল্লাহর কাছে নির্দেশ চাইলেন। আদেশ এলো—হাজেরা ও ইসমাইলকে মক্কার উপত্যকায় নিয়ে যাও। সেখানে তখন শুধু পাথর আর ধুলো। কোনো গাছ নেই, কোনো পানি নেই।
ইব্রাহিম তাঁদেরকে সেখানে রেখে ফিরে যাচ্ছিলেন। হাজেরা পেছন থেকে ডাকলেন, “হে ইব্রাহিম! আল্লাহ কি তোমাকে এই আদেশ দিয়েছেন?” ইব্রাহিম মাথা নিচু করে বললেন, “হ্যাঁ।” হাজেরা তখন শান্ত গলায় বললেন, “তাহলে আল্লাহ আমাদের কখনো ধ্বংস করবেন না। যাও।”
ইব্রাহিম চলে গেলেন। হাজেরা ছোট শিশু ইসমাইলকে নিয়ে বসে রইলেন। পানি শেষ হয়ে গেল। শিশু তৃষ্ণায় কাঁদতে লাগল। হাজেরা পাগলের মতো ছুটলেন সাফা পাহাড়ে, তারপর মারওয়ায়। সাতবার এই দৌড়। শেষবার যখন ফিরছেন, দেখলেন—ইসমাইলের পায়ের কাছে জমিন ফেটে পানি বেরোচ্ছে। জমজম কুয়া। সেই পানি আজও বয়ে চলেছে।
বছর গড়িয়ে গেল। ইসমাইল বড় হলেন। সুন্দর, সাহসী, আল্লাহভীরু যুবক। ইব্রাহিম মাঝে মাঝে আসতেন। এক রাতে, যখন তিনি মক্কায় ছিলেন, এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে আল্লাহ তাঁকে আদেশ করলেন—নিজের প্রিয় পুত্রকে কুরবানি করো।
ইব্রাহিম জেগে উঠলেন। বুক কাঁপছিল। তিনি বুঝলেন, এটা স্বপ্ন নয়—এটা আল্লাহর পরীক্ষা। তিনি ইসমাইলকে ডাকলেন। শান্ত গলায় বললেন, “বাবা, আমি স্বপ্ন দেখেছি যে তোমাকে আমি জবাই করছি। তুমি কী বলো?”
ইসমাইল কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মাথা উঁচু করে বললেন, “আব্বা, আল্লাহ যা আদেশ করেছেন, তা করুন। আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন, ইনশাআল্লাহ।”
পরের দিন সকাল। বাবা-ছেলে দুজনে চললেন। সাথে একটি ছুরি, দড়ি আর কিছু কাঠ। তারা মিনার দিকে যাচ্ছিলেন। পথে শয়তান এসে ইব্রাহিমকে বলল, “কোথায় যাচ্ছ? নিজের ছেলেকে মারবে?” ইব্রাহিম পাথর ছুড়ে তাড়ালেন। আবার শয়তান এলো ইসমাইলের কাছে। “তোমার বাবা তোমাকে মারতে যাচ্ছে!” ইসমাইলও পাথর ছুড়লেন। তৃতীয়বার শয়তান হাজেরার কাছে গেল। তিনিও তাড়িয়ে দিলেন। এই তিনটি জায়গায় আজও পাথর ছোড়া হয়—জামরাত।
অবশেষে তারা পাহাড়ের কাছে পৌঁছালেন। ইসমাইল বললেন, “আব্বা, আমার চোখ বেঁধে দিন। যাতে আপনি আমার মুখ দেখে দুর্বল না হয়ে পড়েন। আমার জামা খুলে নিন, যাতে রক্ত লেগে না যায়। আর মা’কে আমার সালাম দিয়ে বলবেন, তিনি যেন ধৈর্য ধরেন।”
ইব্রাহিম কাঁদতে কাঁদতে ছেলের চোখ বেঁধে দিলেন। হাত কাঁপছিল। ছুরি তুললেন। কিন্তু ছুরি কাটছিল না। আল্লাহর হুকুমে ছুরির ধার চলে গিয়েছিল। তখন আকাশ থেকে ডাক এলো:
“ইব্রাহিম! তুমি তোমার স্বপ্ন সত্য করেছ। নিশ্চয়ই আমি সৎকর্মশীলদের এভাবেই পুরস্কৃত করি।”
সাথে সাথে একটি বড় দুম্বা (ভেড়া) নেমে এলো আকাশ থেকে। ইব্রাহিম সেই দুম্বা কুরবানি করলেন। ইসমাইল বেঁচে গেলেন।
এই ঘটনার পর আল্লাহ ইব্রাহিমকে “খলিলুল্লাহ” (আল্লাহর বন্ধু) উপাধি দিলেন। আর ইসমাইলকে দিলেন নবুয়ত। বাবা-ছেলে মিলে কাবা ঘর পুনর্নির্মাণ করলেন। সেই কাবা আজও দাঁড়িয়ে আছে।
প্রতি বছর জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে, ঈদুল আজহায়, মুসলিমরা এই কুরবানির স্মরণে পশু জবাই করে। এটা শুধু গোশত খাওয়া নয়—এটা আত্মত্যাগের, আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পণের প্রতীক। ইব্রাহিম যেমন সবচেয়ে প্রিয় জিনিসকে আল্লাহর রাস্তায় দিতে প্রস্তুত হয়েছিলেন, তেমনি আমরাও আমাদের প্রিয় জিনিস—সময়, অর্থ, আরাম, এমনকি জীবন—আল্লাহর জন্য কুরবান করতে শিখি।
এই ঘটনা শুধু একটি পুরনো কাহিনি নয়। এটা প্রত্যেক যুগের মানুষের জন্য শিক্ষা। যখন জীবন কঠিন হয়, যখন সন্তান, সম্পদ, স্বাস্থ্য সবকিছু পরীক্ষায় পড়ে, তখন মনে পড়ে ইব্রাহিম আর ইসমাইলের কথা। ধৈর্য, আনুগত্য আর বিশ্বাসের কথা।
আজও মিনার ময়দানে লাখো মানুষ একসাথে দাঁড়িয়ে বলে, “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...” —আমি তোমার ডাকে সাড়া দিলাম, হে আল্লাহ।
কুরবানীর ইতিহাস এভাবেই চলতে থাকবে যতদিন মানুষ আল্লাহর কাছে নত হয়ে থাকবে।

Comments

    Please login to post comment. Login