"পরদিন ইনায়া ইচ্ছে করেই পাঁচ মিনিট আগে কলেজের গেইটের সামনে এসে দাঁড়ালো। কিন্তু রায়হান তখনো আসেনি।
ঠিক নয়টা বেজে তেরো মিনিটে বাইকের হর্নের শব্দ হলো।
রায়হান এসে বাইকটা সাইড করে দাঁড় করালো। চোখে মুখে ক্লান্তি, কিন্তু হাসিটা আগের মতোই।
"সরি, দেরি হয়ে গেলো। রাস্তায় একটু জ্যাম ছিলো।
ইনায়া কিছু বললো না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইলো।
রায়হান হেলমেটটা হাতে নিয়ে একটু এগিয়ে এলো।
" চলো ঘুরে আসি।আর কালকে বলেছিলে না, কিছু কথা থাকুক আজকের মতো? আজকে কি বলবে?
ইনায়া চোখ নামিয়ে নিলো। গলার কাছে কথাগুলো দলা পাকিয়ে আছে।
"আপনি... আপনি কেন আমার পেছনে এত সময় নষ্ট করছেন?
রায়হান অবাক হলো না। যেন এই প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করছিলো।
"নষ্ট না ইনায়া। সময় দিলে যেটা বাঁচে, সেটাকে নষ্ট বলে না।
"কিন্তু যদি আমি... যদি আমি আপনাকে কষ্ট দেই? ইনায়ার গলা কেঁপে উঠলো।
রায়হান একটু হাসলো। সেই হাসিতে কোনো খেলামি নেই, শুধু শান্ত ভরসা।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ হালকা হয়ে গেলো। এই মানুষটা সব কিছু এত সহজে নেয় কিভাবে ?
"চলো," রায়হান আবার বললো, "আজকে ক্লাস বাদ দিয়ে অনেক দূরে গিয়ে ঘুরে আসি।
রায়হান মিররে একবার তাকালো। কিছু বললো না, শুধু মুচকি হাসলো।
রায়হান হেলমেট খুলে বললো, "এই জায়গাটা আমার খুব প্রিয়। আমার মন খারাপ হলেই এখানে চলে আসি।
ইনায়া নেমে দাঁড়ালো। কনকনে বাতাসে ওড়না সামলাতে সামলাতে বললো, "আপনার মন খারাপ ও হয়?
" মানুষের তো মন খারাপ হয়ই। পার্থক্য শুধু কেউ লুকায়, কেউ বলে দেয়।
"এটা রাখো, যখনই মনে হবে আমি দূরে চলে যাচ্ছি, এটা হাতে নিয়ে দেখো। মনে হবে আমি তোমার পাশেই আছি।
ইনায়া অবাক হয়ে পাথরটা হাতে নিলো। ঠান্ডা, মসৃণ।
রায়হান কাঁধ ঝাঁকালো, "শুধু একটা পাথর। কিন্তু আমার কাছে এটার মানে হলো... তুমি।
নদীর ওপার থেকে একটা মাঝি গান ধরলো—
_"ও নদীরে, একটা কথা শুধাই তোরে, মানুষ কেন আপন হারায়?"_
রায়হান থেমে গেলো। ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ধীরে বললো,
"আমি তোমাকে হারাতে চাই না ইনায়া।
ইনায়ার চোখে জল চিকচিক করে উঠলো। সে মুখ ফিরিয়ে নিলো, যেন রায়হান দেখতে না পায়।
"ভয় পাই যদি একদিন আপনিও চলে যান।
রায়হান এক পা এগিয়ে এসে ইনায়ার সামনে দাঁড়ালো।
"তাহলে আমাকে ধরে রাখো। আমি পালাবো না, যদি তুমি ছেড়ে না দাও।
বাতাসটা হঠাৎ থেমে গেলো। চারপাশে শুধু নদীর ঢেউয়ের শব্দ আর দুটো নিঃশ্বাসের ওঠানামা।
ইনায়া আস্তে করে মাথা নাড়লো। হয়তো আজ প্রথমবার, ভয়ের চেয়ে ভরসাটা একটু বেশি হলো।
রায়হান বলল,,, ইনায়া নৌকায় ঘুরবে,,? চলো ঘুরি ভালো লাগবে,,,। আর তোমার কলেজ ছুটি হতে ও দেরী হবে,,।
ইনায়া সাতার জানে না তাই ভয় পাচ্ছিলো কিন্তু রায়হান কে বলতে পারছিলো না,,চুপ করে রইলো,,।
"ইনায়া ভয় পেও না আমি আছি আমি থাকতে তোমার কিচ্ছু হতে দিবো না,,,,।
" ইনায়া মুচকি হেসে আস্তে করে জবাব দিলো,,হুম চলেন।
যে মাঝি গান গাচ্ছিলো তাকে রায়হান ডাক দিলো,,।
" এই মামা আমাদের কিছুক্ষণ ঘুরাবেন,,?
" না মামা কোথাও যাবো না এই নদীতেই কিছুক্ষন ঘুরবো,,।
"আইচ্ছা ঠিক আছে। লও তোমাগো ঘুরাই,,, আর এমনে ও কোন যাত্রী নাই আইজকা,,,।
রায়হান আর ইনায়া নৌকায় উঠ বসল,,,।
"মাঝি রায়হান কে বলে উঠলো,,, মামা এইডা কি মামি নাকি,, মাশাল্লাহ সুন্দর আছে,,,।
" ইনায়া রায়হান আর মাঝির কথা শুনে মাথা নিচু করে বসে আছে,, খুব লজ্জা লাগছে মাঝির মুখে মামি শুনে,,,।
"মাঝি নৌকা চালাচ্ছে আর মনের সুখে গান গাচ্ছে মনে হচ্ছে তার থেকে সুখি আর কেউ নেই,,।
" রায়হান ইনায়া কে বলল,, ইনায়া পানিতে পা ভিজাবে?? দেখবে ভালো লাগবে,,।
" অনেক সময় নৌকায় ঘুরার পর তারা ঘাটে এসে নেমে পড়ল,,,।
"রায়হান মাঝিকে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে আসার সময়,,, মাঝি বলে উঠলো,,।
" হুনো মামা।তোমাগো যহন ঘুরতে মন চাইবো আইয়া পরবা,, আমি তোমাগো ঘুরামু,,।
" ইনায়ার কলেজের ছুটির সময় হয়ে যাচ্ছে তাই আর দেরী করলো না কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো,,।
ফেরার পথে ওরা কেউ কোনো কথা বললো না। কিন্তু দুজনের মাঝে যে দূরত্বটা ছিলো, সেটা যেন আজ একটু কমে গেলো।
কলেজের গেটে নামিয়ে দিয়ে রায়হান শুধু বললো,
ইনায়া কিছু বললো না। শুধু হাতে ধরা নীল পাথরটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।