কী বিষন্ন বেদনাবিধুর দিন আজ। আকাশে মেঘ ছিল না অথচ কী ঘণায়মান অন্ধকার চারিধারে। দৃষ্টিসীমায় কিছু দেখতে পাচ্ছি না। হৃদয় দিয়ে কিছুই অনুভব করতে পারছি না। সবখানে চাপা কান্না। সবার মুখের শব্দরা আজ যেন চরম নিরবতার সাথে সন্ধি করেছে। অন্যদিন গাছের পাতারা জ্যৈষ্ঠের মওসুমি বায়ুতে কী দারুণভাবে দোলে -আজ কোথাও ওদের কোনো নড়চড় নেই। পাড়ার মোড়ে সবজিওয়ালার যেই হাঁকডাক শুনতাম -আজ কোনো সুরই ভাসল না। থেমে গেছে রিকশাওয়ালার টুংটাং। এমন থমকে যাওয়া প্রহর শেষ কবে দেখেছি মনে পড়ছে না। কী হলো আজ প্রাণ-প্রকৃতির?
ওই যে দেখো পল্লবীর পপুলার মডেল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার। যার রোল নাম্বার এক। ওই রামিসার পোষা বিড়ালটা ঠিকমতো খাচ্ছে না, চঞ্চল পাখিটাও মুখভার করে একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। কী হলো আজ ওদের?
আর এদিকে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের মাটি যেখান রামিসা চিরনিদ্রায় শায়িত হলো -সেই মৃত্তিকারাও আজ শোকবিহ্বল। ওইখানে সবুজ ঘাসেদের আজ বড় দুঃখের কাল। বিয়োগব্যথায় সবাই ম্রিয়মাণ। ঘাসেদের বন্ধু ফড়িং আর প্রজাপতিরাও নাচতে ভুলে গেছে। পাখিরা কেন আজ গান ভুলে গেল?
আমাদের কন্যা রামিসার জন্য কেঁদে আকুল হয়ে স্থির হয়ে গেছে সব। মৌনতায় চুপচাপ। হীরণ্ময় নীরবতায় সুনসান। কেউ কোথাও কথা বলবে না। শেষ হয়ে গেছে আমাদের সবটুকু চোখের জল। রামিসা তোমার জন্য আর কাঁদতে পারি না!
আবদুল হান্নান রামিসার অসহায় পিতা হতাশার সুরেই বলছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই।’
একেবারে নরক বানিয়ে দেয়া অথর্ব এক রাষ্ট্রের গালে কষে চপেটাঘাত করল শিশু রামিসার বাবা। আমরা মিস্টার আব্দুল হান্নানের সাথে সংহতি জানাই। এই দেশে শিশু ও নারী নির্যাতন দমন আইনে হওয়া মামলায় মাত্র ৩ ভাগ আসামির বিরুদ্ধে শাস্তির রায় হয়, ৭০ ভাগ মামলায় আসামিকে দেয়া হয় খালাস। বাকিগুলার হদিস থাকে না। এমন এক বিচারব্যবস্থার দেশে একটা শিশুও নিরাপদ না। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় দেখলাম খোদ বাবাই তো নৃশংসতা থেকে নিজের শিশু সন্তানকে ছাড় দেয়নি।
দ্য ডেইলি স্টার জানাচ্ছে, ঘটনার পর থেকেই বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন রামিসার মা পারভিন বেগম। মাঝে মাঝে সংবিৎ ফিরে এলে বলছেন, ‘আমার রামিসা কোথায়? ওকে এনে দাও’। কখনোবা বলছেন, ‘আমার মেয়েটা কই? ও স্কুলে যাবে, ভাত খাবে। ও তো একা খেতে পারে না...’
এমন কত মায়ের কান্নায় ভারী হয়ে থাকে আমাদের আকাশ। তনু, নুসরাত, আছিয়া কত কত নাম! যখনই কোনো কাপুরুষের দুর্বৃত্তায়ন দেখি কয়দিন সরব আলাপ আলোচনা হয় -নতুন আরেকজনের নাম চলে এলে আগের জনের কথা ভুলে যাই। সোজাকথা আমরা কারো বিচার ও শাস্তি হতে দেখি না। আমাদের এই ভূমি যেন অপরাধীর অভয়ারণ্য!
কোনো শিশু ধর্ষণের শিকার হলেই একশ্রেণীর থিওলজিস্ট ওই শিশুর পোশাক ও বয়স নিয়ে নির্লজ্জের মতো কথা বলে ধর্ষকের পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করে। অতঃপর থিওক্রেসি চাই বলে তারা গণতন্ত্রের পিণ্ডি চটকায়। অথচ রোজরাতে তাদের নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ধর্ষিত ছেলেশিশুর কান্নায় কেঁদে বুক ভাসায় আকাশ-বাতাস। সেখানে তাদের নিজস্ব আইনের কী বেহল দশা? এইজন্য বলি আপনারা এই সমাজে যারা পোটেনশিয়াল ধর্ষক ও খুনি -এই সমাজ সংসার থেকে দূর হন। পৃথিবীটা নরক বানিয়ে রাখবার কোনো অধিকার আপনাদের নাই। এই ভূমি এই মাটি সংবেদনশীল মানুষের অধিকারে থাকবে। যেখানে শিশুরা প্রাণখুলে গান গাইবে, খেলবে, ঘুরবে, পড়াশোনা করবে, প্রজাপতির মতো নাচবে।
আমরা রামিসার মতো কন্যাদের রক্ষায় দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাই। হায়েনার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমাদের মায়েদের আমরা রক্ষা করব শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে। আইন যদি অপরাধীকে চোখে না দেখে -আমাদের বুঝ আমরা বুঝে নেব। পিতা হয়ে সন্তানের এমন অমঙ্গল দু'চোখে দেখতে পারব না, প্রাণে সইতে পারব না। উদারনৈতিক ও সংবেদনশীল গণমানুষের স্থৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে তোমাদের পালানোর আর পথ থাকবে না।
সরকার প্রধানের কাছে আমাদের প্রাণান্ত দাবি -ধর্ষক ও খুনিদের জাজমেন্ট দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে করে অপরাধ প্রমাণসাপেক্ষে ১৫ দিনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে আইনের শাসনের নজির দেখান। দয়া করে এখানকার শিক্ষাব্যবস্থার বদল আনেন। প্রাইমারিতে জাপানি পদ্ধতি অনুসরণ করুন। অপদার্থ জনসংখ্যার রাশ টেনে ধরেন, পরিবার পরিকল্পনার প্রচারণা চালান, ইয়াবাসহ সকলপ্রকার মাদক নির্মূল করেন, মানুষকে কাজের সন্ধান দেন। মানুষের মধ্যে খেলাধুলা ও বইপড়াসহ সাংস্কৃতিক জাগরণ নিয়ে আসেন। নারীপ্রগতি ও দেশাত্মবোধবিরোধী ক্লারিকদের রাশ টেনে ধরেন। ছেলেশিশু ধর্ষণের আখড়া হয়ে উঠা ধর্মীয় শিক্ষায়তনকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনুন। আদারওয়াইজ এই জাতি বিশ্বসভায় মুখ দেখাতে পারবে না।
রামিসাদের পবিত্রভূমি কেন এভাবে নরক হয়ে উঠবে। কেন একমাত্র ভালো মানুষদের বাসযোগ্য হবে না বহু রক্তের দামে পাওয়া আজকের বাংলাদেশ। শিশুদের সম্ভ্রম ও প্রাণে কেন শকুনের নজর পড়বে? সরকারি নীতিনির্ধারকদের বলব -এর পেছনে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি আছে কিনা খুঁজে দেখেন। হতেই পারে সরকারবিরোধী কোনো চক্র বহুমূল্য ব্যয়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে শিশুদেরকেই বাজি ধরছে।
পুষ্পের মতো সুন্দর রামিসার সমান বয়সী আমার এক কন্যা আছে। রামিসা আমাদেরই আত্মজা। সমস্ত কলুষিত পিতৃকূলের ভয়াবহ নৃশংসতা দেখে নিয়ে আজকের বীভৎস বাংলাদেশকে সে বিদায় বলে দিয়েছে। ভালোই হয়েছে মা এই বাংলাদেশ তোমাকে ধরে রাখবার যোগ্যতা রাখে না। এই পরগণার কাপুরুষেরা মায়ের মর্যাদা বুঝে না। অন্ধকারাচ্ছন্ন এই ভূমির নিবীর্য-নপুংশকেরা শিশুর মায়া জানে না। মৃত্তিকায় মিশে যাওয়া তোমার পুতঃপবিত্র দেহ অনন্য আলোয় উদ্ভাসিত হোক। আমরা নির্লজ্জ-বেহায়ারা মুখ লুকিয়ে থাকি। তুমি অক্ষম আমাদেরকে কোনোদিন ক্ষমা করো না মা।
রামিসা তোমার জন্য রাবীন্দ্রিক নৈবেদ্যটুকু মহাকালের সুবর্ণপাতায় লিখে রাখল এই ব্যর্থ পিতাঃ
জয়যাত্রায় যাও গো, ওঠো জয়রথে তব।
মোরা জয়মালা গেঁথে আশা চেয়ে বসে রব॥
লেখক: সাংবাদিক
২০ মে ২০২৬