স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রকৌশল, শিক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সামরিক-বেসামরিক খাত, এমনকি সরকারি বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যক্রমেও দেদারসে বিশ্বজুড়ে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। বিচার বিভাগও এক্ষেত্রে এখন আর পিছিয়ে নেই। আদালতে বিচারক, স্টাফ, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থীরাও বিভিন্ন প্রয়োজনে এআইয়ের দ্বারস্থ হচ্ছেন এবং আইনি কার্যক্রমে তা ব্যবহার করছেন। কিন্তু বিচার ব্যবস্থায় এবং আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের বিচারিক কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা আদৌ উচিৎ কিনা বা করলে কখন, কীভাবে, কতটুকু ব্যবহার করা যেতে পারে তা নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান দেখা যাচ্ছে এবং এ নিয়ে ইতোমধ্যেই বিবিধ প্রশ্নও উঠেছে।
কিছু কিছু দেশে বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি‘র মতো টুলের সাহায্যে কতিপয় বিচারক মামলা নিষ্পত্তি ও রায় নির্ধারণে করে আলোড়ন তুলেছেন। এছাড়া আইনজীবীগণ প্রায়শই আদালতে এআইয়ের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত এমন সব বক্তব্য, উদ্ধৃতি, যুক্তি বা নজির তুলে ধরছেন যার বাস্তবে আসলে কোন অস্তিত্বই নেই।

আদালতের বিচারিক কার্যক্রমে তাই এআইয়ের অযাচিত ও অনৈতিক ব্যবহার সামলাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিচার বিভাগে কর্মরত বিচারক ও আদালতের অন্যান্য কর্মীদের জন্য সর্বোচ্চ আদালত এমনকি কিছু ক্ষেত্রে স্বপ্রতিনিধিত্বকারী বিচারপ্রার্থীগণ কীভাবে এআইয়ের সাহায্য নিয়ে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারবেন বা বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন সে বিষয়ে সীমারেখা টেনে দিয়েছে। কারণ আদালতে মামলার আর্জিপত্র, সওয়াল-জবাব, সাক্ষ্য বিশ্লেষণ অথবা রায় তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপরিকল্পিত, অপেশাদার ও অবাধ ব্যবহার অবিচার, অযাচিত বিড়ম্বনা ও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা বয়ে আনতে পারে। যার ফলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকদের আস্থার সংকট তৈরির পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, আইনের শাসন প্রভৃতি প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার আশংকা রয়েছে। তবে বর্তমান এআইয়ের ব্যাপক উত্থানের প্রেক্ষিতে সম্ভবত আইন পেশায় ও আদালতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়; বরং এর নির্দিষ্ট, পরিকল্পিত, নৈতিক, পেশাদার এবং পরিমিত ব্যবহার কিছু ক্ষেত্রে পরিশ্রম, সময় ও ব্যয় কমিয়ে আইন পেশাজীবী এবং বিচারপ্রার্থী উভয়ের জন্যই সহায়ক হতে পারে।
তবে বিচারক বা আইনজীবী বিচারিক বিষয়ে এআই বিশেষত চ্যাটজিপিটির মতো আধুনিক চ্যাটবটের সীমাবদ্ধতা না জেনে বা প্রশিক্ষণ ছাড়া এ ধরণের প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে তার পরিণতি প্রকট হয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি সম্পত্তি সংক্রান্ত একটি দেওয়ানী মকদ্দমায় ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের অধস্তন আদালতের একটি রায়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করা হলে সুপ্রিম কোর্টের নজরে আসে যে, ওই মামলায় অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়াড়া শহরের একজন কনিষ্ঠ সিভিল জজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে প্রাপ্ত অস্তিত্বহীন এবং কাল্পনিক নজির তার রায়ে উল্লেখ করে মকদ্দমাটি নিষ্পত্তি করেছেন। ফলে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বিচারিক সিদ্ধান্তে এআইয়ের এরকম অনভিপ্রেত ব্যবহারের আইনি পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। মামলার গুণাগুণের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তের কারণে নয়; বরং বিচার ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় অনৈতিকভাবে এআই ব্যবহার করার কারণে সুপ্রিম কোর্টের মতে রায়টি এখন ভারতে যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে এই আপিল দায়েরের আগে অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্ট ভিন্ন মত পোষণ করে বলেছিল যে, বিচারিক আদালতের রায়ের উদ্ধৃতিগুলো অস্তিত্বহীন হতে পারে; কিন্তু বিচারক যদি আইনের সঠিক নীতিসমূহ বিবেচনা করে থাকেন এবং মামলার প্রকৃত তথ্যের ওপর আইনের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা যদি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে কেবল আদেশে ভুল বা অস্তিত্বহীন রায়/উদ্ধৃতির উল্লেখ করার কারণে আদেশটি বাতিল হতে পারে না।
তবে সুপ্রিম কোর্ট বিচার ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন যে এরকম কৃত্রিম বিচারে ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী; যা বিচার প্রক্রিয়ার সততাকে প্রস্নবিদ্ধ করবে। আদালত আরও মত দেন যে, কাল্পনিক রায়ের ওপর ভিত্তি করে দেয়া রায়ের আদেশ কেবল বিচার বিভাগীয় ভুল হিসেবে দেখলে হবে না বরং এটি বিচার বিভাগীয় অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচারিক সিদ্ধান্তে এআইয়ের অযাচিত ব্যবহার ঠেকাতে ইতোমধ্যে কেরালা এবং গুজরাট হাইকোর্ট বিচারকদের এআই-এর ব্যবহার নিয়ে গাইডলাইন তৈরি করেছে। বিচার ব্যবস্থায় এআই কী ভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কমিটিও আছে।
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের মামলা তালিকা তৈরি, শুনানির ক্রম নির্ধারণ এবং বিভিন্ন বিচারপতির বেঞ্চে মামলার বিন্যাসে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশেও মামলা তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং কোথাও কোথাও অনিয়মও দেখা যাচ্ছে। এমনকি মামলা তালিকা তৈরিকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির অভিযোগও সামনে এসেছে। সেই প্রেক্ষিতেই গোটা প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল করতে এআই প্রযুক্তির নির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত ব্যবহার সুফল বয়ে আনতে পারে।
শুধু বিচারক নন, বিভিন্ন দেশের আদালতে আইনজীবীদের একাংশের নির্বিচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই না করে সরাসরি মামলার নথি বা আদালতের কাজে ব্যবহার করার ফলে বাতিল আইন বা রায়, কাল্পনিক তথ্য, যুক্তি ও নজির ঢুকে পড়ছে সেসব নথিতে। এ সংক্রান্ত বৈশ্বিক একটি ডেটাবেজের হিসাবমতে ৩০ মার্চ পর্যন্ত দুনিয়াজুড়ে ১২১৯টি কেস সনাক্ত করা হয়েছে যেখানে জেনারেটিভ এআই বিভ্রমমূলক বা অস্তিত্বহীন বিষয়বস্তু তৈরি করেছে ও অন্যান্য ধরনের কাল্পনিক যুক্তি বিচারিক কার্যক্রমে উপস্থাপন করেছে। চ্যাটজিপিটির মতো চ্যাটবটের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হল কাল্পনিক তথ্য বা উদ্ধৃতি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উৎপাদন এবং ব্যবহারকারীর সামনে এমনভাবে উপস্থাপন যা দেখতে গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য। এছাড়াও এআই চ্যাটবট পক্ষপাততুষ্ট, বৈষম্যমূলক, অপ্রতিনিধত্বশীল বা সংখ্যাগরিষ্ঠ তথ্য সম্বলিত ফলাফল ব্যবহারকারীর সামনে উপস্থাপন করে ফেলতে পারে। তাছাড়া বিচার কার্য পরিচালনা করার জন্য সেসকল মানবীয় গুণাবলীর প্রয়োজন হয় এআইয়ের মধ্যে সেসব অনুপস্থিত।
তাই আদালতের কাজে এআই কখন, কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ব্যবহারকারীদের এর কার্যপদ্ধতি ও সীমাবদ্ধতা জানাও অপরিহার্য। নির্দিষ্ট করণিক বা প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে এআই হয়তো মানুষের পরিশ্রম, ব্যয় বা সময় কমাতে পারে কিন্তু আইনজীবী বা বিচারকদের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা এআই নির্ভর হয়ে গেলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ এবং এর মূল্য শুধু বিচারপ্রার্থীদের নয় বরং দিবে হবে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে। কৌঁসুলি বা বিচারকের বুদ্ধিমত্তার বিকল্প এআই কখনোই হতে পারে না।
আইনপেশায় বিশেষত আইনজীবী ও বিচারকগণ বিচারিক কাজে কীভাবে এআই ব্যহার করতে পারবেন সে সংক্রান্ত গাইডলাইন, বিধি বা নির্দেশনা বিভিন্ন দেশ ন্যায় বিচার অক্ষুন্ন রাখতে ইতোমধ্যে প্রস্তুত করে প্রয়োগ করছে। যদিও সেসকল গাইডলাইন বা নির্দেশনা কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং সেসব বিতর্ক সংক্রান্ত গবেষণাও চলমান রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বার কাউন্সিল এবং বিচারকদের জন্য সুপ্রিম কোর্ট থেকে এখনও এ সংক্রান্ত কোন নির্দেশনা বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। যদিও এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে কেউ আদালতে এআইয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত কাল্পনিক উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেছেন এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কিন্তু তার মানে নিশ্চয় এই নয় যে, আমাদের দেশে আদালতের কার্যক্রমে আইনজীবী ও বিচারকবৃন্দ এআই টুলস ব্যবহার করছেন না।
যদিও বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে একটি এআই নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে; কিন্তু বিচার বিভাগ ও আদালত ব্যবস্থার জন্য বিশেষত আইনজীবী, বিচারক, আদালত স্টাফ ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য আলাদা করে সুনির্দিষ্টভাবে এআই ব্যবহার সংক্রান্ত পৃথক নীতিমালা আশু প্রণয়ন জরুরি।
তাই আমাদের আদালতে নানাবিধ সীমাবদ্ধতায় বিচারের ভার এআইয়ের কাঁধে তুলে দেওয়ার পূর্বেই বা ন্যায় বিচারে বড় কোন বিপর্যয় নেমে আসা ও জনগণের আস্থায় ধাক্কা খাওয়া আগেই নীতি-নির্ধারকদের এ সংক্রান্ত প্রাকটিস ডিরেকশন বা নীতি নিয়ে এখনই ভাবা জরুরি প্রয়োজন। সেই সঙ্গে আদালতের কাজে ন্যায় বিচারের নীতি অক্ষুন্ন রেখে দুর্নীতি রোধে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে, মামলার খরচ, জট ও দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে, আইন ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষকে সহজে জানাতে, সেবার মান বৃদ্ধিতে, বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তি লাঘবে, মামলা ও বিচার প্রক্রিয়া সহজীকরণে প্রভৃতি বিষয়ে এআইয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা, আলোচনা, বরাদ্দ ও বাস্তবসম্মত দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।