Posts

গল্প

শেষ ট্রেন রাত ২:১৭

May 25, 2026

Maria Prapti

12
View

 

---

গ্রাম থেকে শহরে যাওয়ার একটাই ট্রেন ছিল। রাত ২:১৭ তে ছাড়ত। কেউ ওই ট্রেনে চড়ত না, কারণ সবাই বলত ওটা মৃতদের ট্রেন।  

রোহন বিশ্বাস করত না। ওর চাকরি চলে গেছে, পকেটে ২০ টাকা। বাড়ি ফেরার শেষ উপায় ওই ট্রেন। রাত ২টায় স্টেশনে পৌঁছে দেখল প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা। শুধু একটা বুড়ো টিকিট কাউন্টারে বসে ঝিমোচ্ছে।  

“২:১৭ এর টিকিট দেন,” রোহন বলল।  
বুড়ো চোখ তুলে তাকাল। “ফেরার টিকিট কাটবে? নাকি যাওয়ার?”  
“মানে?”  
“এই ট্রেনে যারা ওঠে, তারা আর ফেরে না। তুমি নিশ্চিত?”  

রোহন হাসল। “মরার ভয় থাকলে বাড়ি ছেড়ে শহরে যেতাম না। টিকিট দেন।”  

ঠিক ২:১৭ তে ট্রেন এল। পুরোনো, কালো ধোঁয়া ছাড়া একটা ইঞ্জিন। কামরায় ঢুকে দেখল ৪-৫ জন বসে আছে। কেউ কথা বলছে না। এক কোণায় শাড়ি পরা এক মেয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। আরেক দিকে একটা বাচ্চা ছেলে একা বসে চকলেট চুষছে।  

ট্রেন ছাড়ল। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ রোহনের ফোন বেজে উঠল। মায়ের কল।  
“বাবা, তুই ঠিক আছিস? শুনলাম তোর চাকরি গেছে। চিন্তা করিস না, ঘরে ফিরে আয়।”  

রোহন চুপ করে শুনল। বলল, “আমি আসছি মা। রাতের ট্রেনে।”  
মা থমকে গেল। “রাতের ট্রেন? রোহন, ওই ট্রেন তো ১০ বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। তুই কোথায়?”  

রোহনের হাত থেকে ফোন পড়ে গেল। সামনে তাকিয়ে দেখল মেয়েটা ঘুরে তাকিয়েছে। চোখে পানি। “আমিও আমার মায়ের সাথে শেষবার কথা বলতে পারিনি,” মেয়েটা বলল। “এক্সিডেন্টে মরে গেছি ৩ বছর আগে।”  

রোহনের গলা শুকিয়ে গেল। বাচ্চা ছেলেটা বলল, “আমি তো পুকুরে ডুবে গেছি। মা এখনো আমার জন্য রাতে ভাত ঢেকে রাখে।”  

সবাই মৃত। শুধু রোহন বেঁচে আছে।  

“তাহলে আমি কেন এখানে?” রোহন জিজ্ঞেস করল।  
শাড়ি পরা মেয়েটা বলল, “কারণ তুমি এখনো সিদ্ধান্ত নাওনি। তুমি কি সত্যি মরতে চাও, নাকি ফিরে যেতে চাও?”  

রোহনের মনে পড়ল মায়ের কান্না ভেজা গলা। মনে পড়ল ছোট বোনটা বলেছিল, “ভাইয়া ফিরলে আমি আমার চকলেট সব তোকে দেব।”  

ট্রেনটা হঠাৎ থামল। সামনে একটা ব্রিজ। নিচে খরস্রোতা নদী। ড্রাইভার নেই।  

“এখানেই শেষ,” বাচ্চা ছেলেটা বলল। “তুমি লাফ দাও। তাহলে আমাদের মতো হয়ে যাবে।”  

রোহন দরজার কাছে গেল। নিচে তাকাল। মৃত্যু সহজ। এক লাফ। সব শেষ।  
কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে তখনো মায়ের নাম্বার জ্বলছিল।  

রোহন পিছিয়ে এল। “আমি ফিরব,” বলল।  

ঠিক তখনই ট্রেনটা উল্টো দিকে চলতে শুরু করল। স্টেশনের দিকে।  
যারা মৃত ছিল তারা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। যাওয়ার আগে মেয়েটা বলল, “ভালো সিদ্ধান্ত। আমরা এখানে আটকে গেছি কারণ আমাদের কেউ ফিরে ডাকেনি। তোমাকে ডেকেছে।”  

স্টেশনে পৌঁছে ট্রেন থামল। রোহন নেমে দেখল সকাল হয়ে গেছে। কাউন্টারের বুড়ো নেই। প্ল্যাটফর্মে লেখা—“বাতিল: রাত ২:১৭ ট্রেন। ২০১৪ সাল থেকে বন্ধ।”  

রোহন দৌড়ে বাস ধরে বাড়ি ফিরল। মাকে জড়িয়ে ধরে শুধু বলল, “আমি ফিরে এসেছি মা।”  

এরপর থেকে রোহন আর কখনো রাত ২টার পর স্টেশনে যায়নি।  
কিন্তু মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ওর মনে হয়, দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শুনছে।  

যেন কেউ বলছে—“ফিরে এসো। তোমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে।”

*শেষ*  

Comments

    Please login to post comment. Login