কাবার গল্প – পূর্ণাঙ্গ সত্য ঘটনা
এই গল্পটি ইসলামী ইতিহাস, কুরআন, হাদিস ও নির্ভরযোগ্য সীরাত গ্রন্থের ভিত্তিতে লেখা। এটি পড়তে প্রায় ১৮-২২ মিনিট সময় লাগবে।
আল্লাহ তা'আলা যখন এই পৃথিবী সৃষ্টি করলেন, তখনই তিনি একটি ঘরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই ঘর হলো বাইতুল্লাহ – কাবা শরীফ।
প্রথম যুগ: হযরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)
হযরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন তারা আলাদা আলাদা জায়গায় পড়েন। আদম (আ.) ভারতের সেরান্দিব (শ্রীলঙ্কা) অঞ্চলে, আর হাওয়া (আ.) জেদ্দায়। দীর্ঘদিন পর তারা আরাফাতের ময়দানে মিলিত হন। সেখান থেকে তারা মক্কায় আসেন। আল্লাহর নির্দেশে আদম (আ.) প্রথমবার কাবা ঘর নির্মাণ করেন। সেটি ছিল আলোর তৈরি একটি ঘর। পরবর্তীকালে বন্যা ও সময়ের আঘাতে সেই ঘর ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু তার ভিত্তি রয়ে যায়।
হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হাজেরা (আ.)-এর যুগ
এরপর আসে সেই মহান ঘটনা যা আজও হজের প্রতিটি রুকনের সাথে জড়িত।
হযরত ইবরাহিম (আ.) ছিলেন আল্লাহর খলিল (বন্ধু)। আল্লাহ তাঁকে স্বপ্নে আদেশ দিলেন: “তোমার স্ত্রী হাজেরা ও শিশু ইসমাইল (আ.)-কে মক্কার উপত্যকায় নিয়ে যাও, যেখানে কোনো ফসল হয় না, কোনো পানি নেই।”
ইবরাহিম (আ.) তাদেরকে নিয়ে এলেন। একটি বড় পাথরের কাছে হাজেরা ও ইসমাইলকে রেখে তিনি চলে যাচ্ছিলেন। হাজেরা (আ.) পেছন থেকে ডাকলেন, “হে ইবরাহিম! আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আমাদেরকে এই নির্জন উপত্যকায় ফেলে যাচ্ছেন কেন?”
ইবরাহিম (আ.) উত্তর দিলেন, “আমি আল্লাহর নির্দেশে যাচ্ছি।”
হাজেরা জিজ্ঞাসা করলেন, “যিনি আপনাকে এই নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি কি আমাদেরকে ধ্বংস হতে দেবেন না?”
ইবরাহিম বললেন, “না, তিনি আমাদেরকে রক্ষা করবেন।”
এই কথা বলে তিনি চলে গেলেন।
পানি শেষ হয়ে গেল। শিশু ইসমাইল ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাঁদতে লাগলেন। হাজেরা (আ.) ছুটলেন সাফা পাহাড়ে। কাউকে দেখা যায় কি না। কেউ নেই। তারপর মারওয়া পাহাড়ে। এভাবে সাতবার সাফা-মারওয়ার মাঝে ছুটাছুটি করলেন। এটিই আজ হজের সাঈ।
হঠাৎ শিশু ইসমাইলের পায়ের নিচে মাটি ফেটে পানি উঠতে শুরু করল। যমযম কূপ। আজও সেই পানি চলছে।
কিছুদিন পর ইবরাহিম (আ.) ফিরে এলেন। আল্লাহর নির্দেশ এলো: “আমার ঘর কাবা পুনর্নির্মাণ করো।”
ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) মিলে কাবা শরীফ নির্মাণ করলেন। ইবরাহিম (আ.) পাথর তুলে দিতেন, ইসমাইল (আ.) গেঁথে দিতেন। যখন দেওয়াল উঁচু হয়ে গেল, ইসমাইল একটি পাথর এনে দিলেন। সেই পাথরে ইবরাহিম (আ.) দাঁড়িয়ে কাবার উপরের অংশ সম্পন্ন করলেন। সেই পাথরটি আজও আছে – মাকামে ইবরাহিম।
নির্মাণ শেষে ইবরাহিম (আ.) দোয়া করলেন (সূরা বাকারা ১২৮):
“হে আমাদের রব! আমাদের থেকে এই কাজ কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।”
আরেকটি দোয়া তিনি করেছিলেন:
“হে আল্লাহ! এই শহরকে নিরাপদ করুন এবং এখানকার অধিবাসীদের ফল-ফসল দান করুন।”
জাহিলিয়াতের যুগ
কালক্রমে মানুষ মূর্তি পূজা শুরু করল। কাবার ভিতরে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হলো। কুরাইশরা কাবার দেখাশোনা করত। কিন্তু তারা নিজেরাই এই পবিত্র ঘরকে অপবিত্র করে ফেলেছিল।
নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগ
নবীজি (সা.) যখন ৩৫ বছর বয়সে, কাবায় বড় বন্যায় ক্ষতি হয়। কুরাইশরা কাবা পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। দেওয়াল উঁচু করার সময় হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) কোথায় বসানো হবে তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। প্রায় যুদ্ধ লাগার উপক্রম।
তখন কেউ বলল, “যে ব্যক্তি প্রথম দরজা দিয়ে আসবে, তার সিদ্ধান্ত মেনে নেব।”
দরজা দিয়ে প্রথম যিনি প্রবেশ করলেন – মুহাম্মদ (সা.)।
সবাই বলল, “আমিন! সাদিকুল আমিন এসেছেন।”
নবীজি (সা.) একটি চাদর বিছিয়ে হাজরে আসওয়াদকে তার উপর রাখলেন। তারপর প্রত্যেক গোত্রপতিকে চাদরের কোন ধরিয়ে একসাথে তুলতে বললেন। যখন সঠিক জায়গায় পৌঁছাল, তিনি নিজ হাতে পাথরটি স্থাপন করলেন। বিতর্ক শেষ।
হিজরতের পর
৬৩০ খ্রিস্টাব্দ। বিজয়ের দিন। নবীজি (সা.) ১০ হাজার সাহাবী নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন। কাবার চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি।
নবীজি (সা.) প্রত্যেক মূর্তির দিকে লাঠি দিয়ে ইশারা করে বললেন:
“সত্য এসেছে, মিথ্যা বিলীন হয়েছে।”
মূর্তিগুলো একে একে পড়ে গেল। কাবা আবার পবিত্র হলো।
সেইদিন নবীজি (সা.) কাবায় প্রবেশ করে দোয়া করলেন এবং চার রাকাত নামাজ পড়লেন। তারপর হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করে তাওয়াফ করলেন।
কাবার গুরুত্ব
কাবা পৃথিবীর প্রথম ঘর। কুরআনে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয় প্রথম ঘর যা মানুষের জন্য স্থাপিত হয়েছে তা মক্কায় অবস্থিত, বরকতময় ও সমস্ত বিশ্বের জন্য হেদায়েত।” (সূরা আলে ইমরান: ৯৬)
প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মুসলিম কাবার চারপাশে ঘুরে, আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষণা করে। হাজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে এসেছে বলে বিশ্বাস করা হয়। যদিও এখন কালো হয়ে গেছে মানুষের পাপের স্পর্শে।
আজও চলছে...
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়েন। কাবা কখনো খালি থাকে না। সবসময় কেউ না কেউ তাওয়াফ করছেন।
যারা হজ করতে যান, তারা যখন প্রথমবার কাবা দেখেন, অনেকের চোখে পানি চলে আসে। কারণ এটি শুধু একটি ঘর নয়। এটি আল্লাহর ঘর। এটি ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতি। এটি মুহাম্মদ (সা.)-এর বিজয়। এটি একত্ববাদের প্রতীক।
শেষ কথা:
কাবার গল্প আসলে একটি অসমাপ্ত গল্প। প্রত্যেক হাজি, প্রত্যেক মুসল্লি যখন কাবায় যান বা তার দিকে তাকিয়ে নামাজ পড়েন, তখন এই গল্পের নতুন অধ্যায় লেখা হয়।
যদি আপনি কখনো কাবায় যান, তাহলে মনে রাখবেন – আপনি শুধু একটি ঘর দেখতে যাচ্ছেন না। আপনি সেই জায়গায় যাচ্ছেন যেখানে আদম (আ.), ইবরাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.) ও মুহাম্মদ (সা.) এর স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে কাবা দেখার এবং তার হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
17
View