Posts

উপন্যাস

ব্যর্থ জীবনী

May 26, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

24
View

ব্যর্থ জীবন
মাহমুদের জন্ম হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর, এক ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে। পুরান ঢাকার নয়াবাজারের একটা সরু, অন্ধকার গলির ভিতরের একতলা ভাড়া বাসার একটা ছোট্ট, স্যাঁতসেঁতে ঘরে। ঘরের ছাদে চুঁইয়ে পড়া পানির দাগ, দেওয়ালে ফাটল, আর মেঝেতে পুরনো খবরের কাগজ বিছানো। বাবা আব্দুল লতিফ রিকশা চালাতেন সারাদিন, সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীরে ফিরে এসে শুধু একটা কথা বলতেন, “আজও পেট ভরেনি।” মা রহিমা বেগম ছয় সন্তানকে নিয়ে সারাদিন ঘরের কাজ করে ক্লান্ত হয়ে যেতেন। মাহমুদ ছিল চতুর্থ সন্তান। তার জন্মের সময় কোনো ডাক্তার ছিল না, শুধু পাড়ার পুরনো দাইমা এসে সাহায্য করেছিলেন। তার প্রথম কান্না মিশে গিয়েছিল মসজিদের ফজরের আজানের সাথে।
শৈশবটা ছিল অভাবের। ছয় ভাইবোনের মধ্যে খাবার ভাগ করে খেতে হতো। মাহমুদ ছিল চুপচাপ, অন্যরা রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করত, সে ছাদের কোণে বসে আকাশের মেঘ দেখত। ছোটবেলায় একবার সে বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “বাবা, আমি বড় হয়ে কী হব?” বাবা হেসে বলেছিলেন, “ইঞ্জিনিয়ার হবি, বড় বাড়ি বানাবি, আমাদের সবাইকে নিয়ে যাবি।” সেই কথাটা তার মনে গেঁথে গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তব ছিল নির্মম। আট বছর বয়স পর্যন্ত স্কুলে যাওয়া হয়নি। তারপর যখন ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলো, তার জামা ছিল বড় ভাইয়ের পুরনো, জুতো ছিল ছেঁড়া চটি। স্কুলের অন্য ছেলেরা নতুন ব্যাগ নিয়ে আসত, সে কাগজের ব্যাগ নিয়ে যেত।
স্কুলে পড়তে পড়তে সে প্রথম বুঝেছিল জীবন কতটা কঠিন। ক্লাস থ্রিতে একবার বৃষ্টিতে ভিজে স্কুলে গিয়ে জ্বর হয়েছিল। মা কোনোমতে ওষুধ কিনে দিয়েছিলেন। ক্লাস ফাইভে প্রথমবার সে স্ট্যান্ড করেছিল। বাড়িতে খুশি ছড়িয়ে পড়েছিল একদিনের জন্য। কিন্তু পরের দিন আবার একই রুটিন—সকালে স্কুল, বিকেলে পাড়ার চায়ের দোকানে কাজ। চা বানানো, কাপ ধোয়া, গ্রাহকদের সাথে হাসিমুখে কথা বলা। রাতে কেরোসিনের কুপির আলোয় পড়তে পড়তে তার চোখ জ্বালা করত। তবু সে স্বপ্ন দেখত।
কৈশোরে এসে প্রথম প্রেমের স্বাদ পেল। ক্লাস সিক্সে রুমা নামের এক মেয়ে। পাশের বাড়ির। চোখাচোখি হতো, মেয়েটি হাসত। মাহমুদের বুক ধকধক করত। একদিন সে সাহস করে একটা চিঠি লিখেছিল। কিন্তু দিতে পারেনি। লজ্জায় ছিঁড়ে ফেলেছিল। রুমা পরে অন্য এক ছেলের সাথে হাঁটতে দেখেছিল তাকে। সেই দিনটা মাহমুদের জীবনের প্রথম বড় কষ্ট। রাতে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল।
এসএসসিতে সে ভালো রেজাল্ট করেছিল। জিপিএ ৪.২৫। বাড়িতে আনন্দের বন্যা। কিন্তু কলেজে ভর্তির টাকা ছিল না। বাবা বললেন, “দোকান দে।” মাহমুদ একটা ছোট মুদি দোকান খুলল গলির মোড়ে। সকাল ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বসে থাকা। চাল, ডাল, সাবান বিক্রি। প্রথম মাস ভালো চলেছিল। কিন্তু বড় দোকানের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারল না। ছয় মাস পর দোকান বন্ধ। ধার বেড়ে গেল পনেরো হাজার টাকা। সেই ধার শোধ করতে সে গার্মেন্টসে চাকরি নিল।
গার্মেন্টসের জীবন ছিল নরক। সকাল সাড়ে ছয়টায় বাস ধরে যাওয়া, রাত নয়টায় ফেরা। লাইনে দাঁড়িয়ে কাপড় কাটা, সেলাই মেশিনের শব্দে কান ঝালাপালা। সুপারভাইজার রহিম সাহেব চিৎকার করতেন, “তোর মতো অলস লোকের জন্য ফ্যাক্টরি চলে না! আরও জোরে!” মাহমুদ চুপ করে সহ্য করত। ঘামে ভিজে যেত শার্ট। লাঞ্চে শুধু ভাত আর ডাল। সহকর্মীরা অনেকে ইউনিয়ন করত, কিন্তু মাহমুদ ভয়ে দূরে থাকত।
১৯৯৮ সালে এসে জীবনে প্রথম রঙ লাগল। শারমিন। অফিসের কাছে একটা বুটিক শপে কাজ করত। প্রথম দেখায় চোখ আটকে গিয়েছিল। দুজনে কথা বলা শুরু করল। রিকশায় করে ঢাকার রাস্তায় ঘুরত, গড়ের মাঠে বসে আইসক্রিম খেত, রাতে ফোনে অনেকক্ষণ কথা বলত। মাহমুদ তাকে তার সব স্বপ্নের কথা বলেছিল—বড় বাড়ি, গাড়ি, সুখী পরিবার। শারমিন হেসে বলত, “তুমি পারবে মাহমুদ। আমি তোমার সাথে আছি।” কিন্তু শারমিনের বাবা ছিলেন সরকারি অফিসার। যখন শুনলেন মাহমুদ গার্মেন্টসের সাধারণ কর্মচারী, রেগে গিয়ে বললেন, “এই ছেলের সাথে সম্পর্ক রাখলে ঘর থেকে বের করে দেব।” শারমিন কাঁদতে কাঁদতে এসে বলেছিল, “আমি অপারগ। বাবা শুনবে না।” সেই রাতে মাহমুদ বুড়িগঙ্গার ধারে বসে অনেকক্ষণ একা কেঁদেছিল। সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেকগুলো। জীবন যেন তাকে শুধু হারাতেই শেখাচ্ছিল।
২০০৩ সালে বিয়ে হলো। বাবা-মা ঠিক করে দিয়েছিলেন রেহানার সাথে। গ্রামের মেয়ে, শান্ত, সাধারণ। বিয়ে হয়েছিল সাদামাটাভাবে। প্রথম কয়েক মাস মধুর ছিল। কিন্তু মাহমুদের ভিতরের অস্থিরতা কখনো যায়নি। সে চাকরি বদলাতে থাকল। গার্মেন্টস ছেড়ে ছোট দোকান, দোকান ছেড়ে ট্রান্সপোর্টের অফিস, তারপর আবার অন্য কোম্পানি। কোনোটাতেই স্থির হতে পারেনি। টাকার টানাটানি লেগেই থাকত। ঘরে প্রায়ই ঝগড়া হতো। রেহানা বলত, “তুমি একটু চেষ্টা করো না কেন?” মাহমুদ চুপ করে থাকত।
২০০৫ সালে ছেলে আরিফের জন্ম। মাহমুদ খুশি হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালের বিল দিতে ধার করতে হয়েছিল। ২০০৮ সালে মেয়ে সুমাইয়া। দুই সন্তানকে নিয়ে সে অনেক স্বপ্ন দেখত। তাদের ভালো স্কুলে পড়াবে, বড় করবে। কিন্তু বাস্তবে তাদের জন্য নতুন জামা কিনতে পারত না। আরিফ যখন স্কুলে যেত, মাহমুদের পুরনো জামা পরে যেত। সুমাইয়া খেলনা চাইলে দিতে পারত না। মাহমুদের মনে হতো সে তার সন্তানদের জন্যও ব্যর্থ।
২০১২ সালে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল। ছয় মাস বেকার। ঘরে খাবারের টান পড়ল। রেহানা চুপচাপ রান্না করত কম খাবার দিয়ে। মাহমুদ ছাদে বসে সিগারেট খেত আর ভাবত—আমি কেন এত অপদার্থ? এক রাতে আত্মহত্যার চিন্তা করেছিল। ছাদের রেলিংয়ের কাছে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আরিফের ঘুমন্ত মুখ মনে পড়ায় ফিরে এসেছিল। পরে আবার ছোট একটা চাকরি পেল। কিন্তু বেতন খুব কম। সহকর্মীরা পেছনে বলত, “ফেল করা লোক।”
মধ্য বয়সে শরীর ভেঙে গেল। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে আরও ধার। ছেলে আরিফ বড় হয়ে বলত, “বাবা, তুমি কেন কখনো লড়াই করলে না?” মাহমুদ উত্তর দিতে পারত না। সুমাইয়া ভালো রেজাল্ট করে কলেজে গেল, কিন্তু মাহমুদ গর্ব করতে পারেনি। নিজের ব্যর্থতা তাকে গিলে খাচ্ছিল।
২০২৫ সালে অবসর। শরীর একেবারে ভেঙে গেছে। ছেলে বিদেশে চলে গেছে চাকরি করতে। মেয়ে বিয়ে হয়ে অন্য শহরে। রেহানা এখনো আছে, কিন্তু দুজনের মাঝে কথা কম। সন্ধ্যাবেলা ছাদে বসে মাহমুদ পুরনো অ্যালবাম দেখে। ছোটবেলার ছবি, শারমিনের সাথে একটা ছবি (যেটা লুকিয়ে রেখেছিল), আরিফের প্রথম জন্মদিন, সুমাইয়ার স্কুলের অনুষ্ঠান। সব মনে পড়ে। আর অনুশোচনায় বুক ফেটে যায়।
সে বুঝেছে তার জীবনটা পুরোপুরি ব্যর্থ। সে কখনো ঝুঁকি নেয়নি, কখনো নতুন কিছু শেখেনি, কখনো নিজেকে বিশ্বাস করেনি। স্বপ্নগুলো সব ধুলো হয়ে গেছে। কোনো বড় কাজ করেনি, কোনো স্মরণীয় অবদান নেই। শুধু একটা সাধারণ, নীরস, হারিয়ে যাওয়া জীবন। প্রতিদিন সকালে উঠে চা খায়, খবরের কাগজ পড়ে, দুপুরে ঘুমায়, বিকেলে ছাদে বসে আকাশ দেখে। আর ভাবে—যদি আবার জন্ম নিতে পারত, তাহলে কি সে অন্যরকম হতো? কিন্তু জানে, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
জীবন একবারই আসে। আর মাহমুদ তার জীবনটাকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দিয়েছে। এটাই তার গল্প। একজন মানুষের, যে শুধু বেঁচে ছিল, কিন্তু কখনো জীবনকে জয় করতে পারেনি। শুধু ব্যর্থতার গল্প।

Comments

    Please login to post comment. Login