Posts

উপন্যাস

অসমাপ্ত পূর্ণতা___পর্ব:০১

May 27, 2026

Tithi Sutradhar

Original Author তিথি আর্চেল

40
View


একটা বন্ধুমহল, যেখানে হাসি, দুষ্টুমি আর প্র্যাণবন্ত মুহূর্তে ভরা প্রতিটি দিন। ভালোবাসা ছিল প্রচুর, তবে প্রত্যেকের গল্পের শেষের চাবি অজানা। বন্ধুত্বের রঙিন বিকেলগুলো, অদৃশ্য ফাঁক আর অসমাপ্ত স্বপ্ন—সবকিছু মিশে এক অসমাপ্ত গল্পের অধ্যায়।
বন্ধুত্বের মধুরতা, অসম্পূর্ণ ভালোবাসা, এবং শেষ না হওয়া গল্প—এই গল্পের গল্প।যেখানে পূর্ণতা ছিল অজানা অধ্যায়।
.
.
.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন।
কলেজের পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে প্রতিদিনের মতো আজও আড্ডা জমেছে। চারদিকে নরম সকালের বাতাস। ক্যাম্পাস ধীরে ধীরে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ে জমে উঠছে। সকালটা যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরা। আকাশে তেমন কড়া রোদ নেই—হালকা মেঘের আড়াল দিয়ে সূর্যের নরম আলো চারদিকে ছড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাস এসে গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে, যেন দিনের শুরুতেই একটু সতেজতা এনে দিচ্ছে।
ক্যান্টিন থেকে গরম চা আর সমুচার গন্ধ ভেসে আসছে। দূরে কোথাও ক্লাসে যাওয়ার তাড়া, আবার কোথাও ছোট ছোট আড্ডা।

এমন সময় হুট করে একটি ছেলে দৌড়ে এসে ব্যাগটা বেঞ্চে ছুড়ে মেরে বলল,
— “উফফ! তোমরা এত সকালে আসো কিভাবে? আমি তো অনার্স ১ম বর্ষেই মরলাম!”

"রাহি" ভ্রু কুঁচকে তাকাল শুভ্রর কথায় তার পানে বলল..
— “সকালে? এখন তো ১১টা বাজে!”

স্নিগ্ধ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— “ওকে কিছু বলো না। ওর কাছে সকাল মানে দুপুর ১২টার আগে সব।”

সবাই হেসে উঠল।এমন সময় তুষার চা হাতে এসে বসল।"রুহি" তাকে দেখেই মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— “এই তুই আবার এখানে কেন?”

তুষার ঠান্ডা গলায় বলল,
— “ক্যাম্পাসটা কি তোমার বাপের সম্পদ?”
রুহি চোখ কুঁচকে বলল,
— “না, কিন্তু তোমাকে দেখলে আমার মুড গরম হয়ে যায়।”
তা দেখে শুভ্র আস্তে করে মিহিরের কানে বলল,
— “ভাই, এদের দুজনকে একদিন একই গ্রুপে প্রজেক্ট দিলে কলেজে যুদ্ধ লেগে যাবে।”

মিহির নিজের হাসি চাপতে চাপতে বলল,
— “আমি তখন ছুটি নিয়ে পালাবো।এক সপ্তাহ ভার্সিটিতেই আসব না”

এদিকে স্নিগ্ধ আবার রাহির দিকে তাকিয়ে খোঁচা দিয়ে বলল,
— “এই রাহি, আজ এত চুপ কেন? নাকি আমার কথা ভাবছ?”
রাহি সাথে সাথে জবাব দিল,
— “হ্যাঁ, ভাবছিলাম তোমাকে কোন মিউজিয়ামে দিলে ভালো হয়। বিরল প্রজাতি বলে কথা।”

এই শুনে সবাই আবার উচ্চ স্বরে হেসে উঠল।পাশে বসে থাকা তিয়াসা মৃদু হেসে বলল,
— “তোমরা কখনো সিরিয়াস হতে পারো না?”
— “আমাদের গ্রুপে সিরিয়াস হলে আড্ডা বন্ধ হয়ে যাবে।” (মিহিরের গলা শান্ত)

ঠিক তখনই তুষার হঠাৎ বলে উঠল,
— “চল ক্যান্টিনে যাই, আজ আমার ট্রিট।”
রুহি সাথে সাথে বলল,
— “না ধন্যবাদ। তোর ট্রিট মানে নিশ্চয়ই আবার ঝাল সমুচা খাওয়াবি, তাই তো ।”

রুহির কথায় তুষার হেসে বলল,
— “তুই না খেলেও হবে। বাকি সবাই তো আছে। কিরে তোরা খাবিনা তুষারের স্পেশাল ট্রিট।”

শুভ্র সাথে সাথে হাত তুলে বলল,
— “আমি আছি! ট্রিট মানে আমি আছি!”

অতপর সবাই হাসতে হাসতে ওঠে দাঁড়ালো। ক্যান্টিনের দিকে হাঁটতে লাগল।কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে আবারও রয়ে গেল তাদের হাসির প্রতিধ্বনি। তবে মাঝে আরও ২জন মিসিং আছে সূর্য আর রিশা।
.
.
.
সবাই ক্যন্টিনে যেতে যেতে চল এদের সবার পরিচয়টা দিয়ে দেয়।তাহলে আর দেরি কিসের~

ঢাকার ভার্সিটি সকাল হলেই ক্যাম্পাসটা ভরে যায় ছাত্রছাত্রীদের হাসি, গল্প আর আড্ডায়। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে একটা বেঞ্চ আছে— সেখানে প্রায় প্রতিদিনই বসে একটা ছোট কিন্তু অদ্ভুত মজার গ্রুপ।সারাদিন একে অপরের পেছনে লেগে থাকে। গ্রুপের সদস্য ৯ জন সবগুলো একেকটা বদের হাড্ডি, শয়তানিতে PHD করে রেখেছে।

. এই গ্রুপের সদস্য নয়জন। নয়জনেরই ব্যাক্তিত্ব একে অন্যের থেকে একেবারেই আলাদা—কেউ ধনী, কেউ সাধারণ; কেউ শান্ত, কেউ রাগী; কেউ চুপচাপ, কেউ দুষ্টুমি করে হেসে উঠবে। কিন্তু একত্রে তারা যেন এক ছোট পৃথিবী, যেখানে কেউ একা নেই, কেউ অবহেলিত নয়।

গ্রুপের প্রথম সদস্য স্নিগ্ধ। স্নিগ্ধের চেহারা শান্ত, চোখে সবসময় একটু দুষ্টু ঝিলিক। ছোটবেলায় তার বাবা ঢাকায় একটি ছোট সফটওয়্যার কোম্পানি চালাতেন। তবে একটি দূর্ঘটনা তার জীবন পুরোটা বদলে দিল—তার বাবা মারা গেলেন। অনার্স প্রথম বর্ষে তখন তার বাবার সহকারীও চলে গেলেন। স্নিগ্ধ এখন নিজের মতো করে জীবন কাটায়, বড় কিছু চায় না, শুধু প্রয়োজন মতো কাজ করে চলতে চায়।

দ্বিতীয় সদস্য শুভ্র। এক ভয়ঙ্কর বাস দূর্ঘটনায় সে তার বাবা-মাকে হারিয়েছিল। একই দূর্ঘটনায় স্নিগ্ধের পরিবারও মারা যায়। তখন মাত্র সাত-আট বছরের ছোট্ট শুভ্র একা রাস্তায় বসে কাঁদছিল। স্নিগ্ধ তাকে দেখে নিজের সাথে বাড়ি নিয়ে আসে। সেই দিন থেকেই তারা যেন দুই ভাই, একে অপরের সঙ্গী।

তুষার ও তিয়াসা—দুটি ভিন্ন রূপের এক পরিবারের সন্তান। তুষার গম্ভীর, দায়িত্বশীল, মাঝে মাঝে রাগী। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে সে একদম আলাদা—একটু খেলাধুলার মতো খোলা ডাইরি। তিয়াসা তার ছোট বোন, শান্ত, ভদ্র আর কোমল। তারা একসাথে তাদের ছোট ক্যাফেতে কাজ করে, যেখানে জীবনের ছোট গল্পগুলো ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে।

মিহির, শান্ত ও পরিণত। ধনী পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও সে কখনো অহংকার দেখায় না। আর তার চাচাতো বোন রাহি, যার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর দুষ্টুমি সবসময় গ্রুপকে হাসিয়ে রাখে। রাহি, ধনী হলেও সহজ সরল, এবং তার কথায় থাকে খোঁচা, যা কখনো কখনো মজার ঝগড়ার জন্ম দেয়।

রুহি, সাহসী ও আত্মসম্মানী। সে সরাসরি কথা বলে, কিন্তু তুষারের সঙ্গে তার সবসময় একটু দ্বন্দ্ব থাকে।
সূর্য,বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। চট্টগ্রামের বাড়ি, পড়াশোনার জন্য ঢাকায় হোস্টেলে থাকে।

আর শেষ সদস্য রিশা, বাবা-মা নেই। বড় ভাই আর ভাবির সঙ্গে থাকে। বাসা কলেজ থেকে দূর হওয়ায়, পড়াশোনার সুবিধার জন্য হোস্টেলে থাকে।

এই নয়জনের সম্পর্ক যেন সাপে-নেউলের মতো—কখনো মসৃণ, কখনো গোলমাল, কিন্তু সবসময় বন্ধুত্বের রঙে ভরা। কেউ ধনী, কেউ সাধারণ, কেউ শান্ত, কেউ ঝগড়াটে—তবু একত্রে তারা যেন একটি ছোট, নিখুঁত পৃথিবী।
.
.
.
.
স্নিগ্ধ, তুষার,মিহির, সূর্য , রিশা আর রুহি এদের ক্লাস সেম CSE(Computer Science & Engineering) করছে একসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।মাস্টার্স ১ম বর্ষ।

তিয়াসা আর অনু এক ডিপার্টমেন্টেই ইংলিশে অনার্স করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ২য় বর্ষ।

শুভ্র অনার্স ১ম বর্ষে এবার।সবার ছোট সে।দুষ্টমিতে সেরা। তবে সবার আদরের।
.
.
.
ইতোমধ্যেই সবাই ক্যান্টিনে এসে বসেছে। টেবিলে গরম ধোয়া ওঠা চা, সমুচা আর সিঙ্গারা। এই মাএ দিয়ে গেল করিম চাচা।

শুভ্র সমুচা হাতে নিয়ে বলল,
— “তুষার ভাই, আজ ট্রিট কেন?”তুষার হালকা হাসল।
— “মন ভালো আছে তাই।”

রুহি সাথে সাথে বলল,
— “ওর মন ভালো মানে নিশ্চয়ই কারো জীবন খারাপ হয়েছে।”
সবাই “ওহহহ” বলে উঠল।তুষার চোখ কুঁচকে বলল,
— “তুই কি জন্ম থেকেই এত বিরক্তিকর, নাকি কোর্স করে শিখছিস?”

রুহি ঠান্ডা গলায় বলল, — “তোকে দেখে প্র্যাকটিস করছি।”
শুভ্র রুহি আর তুষারকে একবার দেখে নিল।তারপর মুখে সমুচা নিয়ে বলল, — “আহা! লাইভ বক্সিং ম্যাচ!”

এদিকে স্নিগ্ধ চুপচাপ রাহির দিকে তাকিয়ে আছে।রাহি বিরক্ত হয়ে বলল, — “কি?”
স্নিগ্ধ মুচকি হেসে বলল, — “ভাবছি তুমি এত রাগী কেন।”
রাহি ভ্রু কুঁচকে বলল,— “তোমাকে সহ্য করতে করতে।”

মিহির হেসে ফেলল রাহির কথায়।তা শুনে স্নিগ্ধ নাটকীয়ভাবে বুক ধরে বলল, — “আহ! এত নিষ্ঠুর কথা! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আমাকে মিস করো।”

— “হ্যাঁ করি।”

রাহি কথা যেন সবাই হতভাগ অবাক হয়ে তাকাল রাহির দিকে।এতোখনে তুষার রুহির ঝগড়াও থেমে গেছে।স্নিগ্ধ চোখ বড় করে বলল, — “সত্যি?”

— “যেদিন তুমি সামনে থাকো না, সেদিন শান্তি মিস করি।”
রাহির শান্ত জবাব।,সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
পাশে বসে থাকা তিয়াসা মৃদু হেসে বলল,
— “তোদের দুজনের কি কখনো বনিবনা হবে না?”
— “ওরা বড় হলে আমাদের এন্টারটেইনমেন্ট শেষ।”

মিহিরের কথায় শুভ্র মাথা নেড়ে বলল,
— “আমি বলি কি, এদের নিয়ে রিয়েলিটি শো বানানো উচিত।”
তুষার সাই জানিয়ে বলল,
— “নাম হবে— ঝামেলার সংসার ।
”রুহি সাথে সাথে বলল,
— “রাজা তুই হবি না, নিশ্চিন্ত থাকিস।”

রিশা আর সূর্য করিডোর থেকে আসলো সবেমাএ।প্রিন্সিপাল স্যার অফিসে ডেকেছিল ২জনকে।তাই ট্রিটের কথা স্নিগ্ধ ম্যােসেজ করে জানিয়ে দিয়েছিল। কাজ শেষ হলে যেন ক্যান্টিনে চলে আসে।সূর্য যেইনা চেয়ার টেনে বসতে যাবে, তৎক্ষনাৎ রিশা ধাক্কা দিয়ে সেখানে বসে পরে।এতে বেচারা ব্যালেন্স রাখতে না পেরে পাশে বসা মিহিরের কোলে ধুপ করে বসে পরে।

মিহির তখন চা খাচ্ছিল সূর্য এভাবে তার কোলে পড়বে সে বোধহয় কল্পনা করেনি। মিহিরের সামনে বসেছিল স্নিগ্ধ। ফলস্বরূপ হাতে থাকা চাসহ চায়ের কাপ গিয়ে পরে স্নিগ্ধর গায়ে।এতে বেচারার অবস্থা এখন প্রায় নাজেহাল। কোনো মতে প্যান্টের ওপর থেকে পড়া চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে ওঠে দাঁড়ায়ে পেছনের দিকে কাপটা ছুরে মেরেই ব্যাঙ্গের মতো লাফাতে থাকে।কিছুক্ষণ লাফঝাঁপ করার পর যখন বুঝলো না এখন সব ঠিক আছে।এখন আর বুকে জ্বালা করছেনা। যেই না চেয়ারে বসতে যাবে সামনে তাকিয়ে দেখল সবাই আগের ন্যায় বসে আসে। সূর্য মিহিরের কোলে সেভাবেই তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।তবে সেখানে রাহি নেই তাই বসতে বসতে সবার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেসা করল,
--"রাহি কই?"
--"ভাই জারা পিচে তো দেকোওওও....
সবাই একত্রে বলে ওঠে। এবার তাদের দৃষ্টি পেছনে। তা অনুসরণ করে দৃষ্টি পেছনে ফেরাতেই চোখ কপালে কী করেছে সে এটা, এবার আর রক্ষা নেই।

রাহি ঠিক তার পেছনে দাড়িয়ে আছে লাঠি হাতে।বা পাশের কপাল ফুলে আলু হয়ে আছে।অগ্নি দৃষ্টিতে তাকেই দেখছে।ফ্লোরে চায়ের মাটির কাপ ভেঙ্গে পরে আছে।বুঝতে আর বাকি নেই যে এটা তারই কিয়াধারা।এবার তাকে কে বাঁচাবে।

রাহি একটু ওয়াসরুমে গেছিল। আসার সময় ঘটে বিপ্তি।রাহি ঠিক তখন আসে, যখন হুশ হারিয়ে কাপটা পেছনে ছুড়েছিল স্নি্গ্ধ।সে তো আর জানতো না রাহি তার পিছনে। আর সোজা তা গিয়ে লাগে রাহির মাথায় বাম কপালের কাছে। জানলে এতো বর ভুল করতো নাকি সে!জীবনে না,তবে এখন কি করবে।পাক্কা আজ কপালে লাঠির মার লিখা আছে।স্নিগ্ধ কাঁপা গলায় ধীর স্বরে বলে,
--"দেখ রা.... রাহি, আমি কিন্তু.....

আর শেষ করতে পারলনা।তার আগেই রাহি হাতে লাঠি নিয়ে স্নিগ্ধর দিকে দিল দৌড়। তাদেখে স্নিগ্ধও দিল এক ভৌ দৌড় ক্যাম্পাসের দিকে।রাহি কি ছাড়ার পাত্রী সেও গেলো পিছু পিছু। সবাই হতভম্ব রাহির সাথে স্নিগ্ধর বনিবনা হয় না তা আজ নতুন না। তবে রাহি যে স্নিগ্ধকে লাঠি ধাওয়া করবে তা কেও আশা করেনি।সবাই যেন ঘোরে চলে গেছে।তবে তা দীর্ঘ স্থায়ী হলো না মিহিরের কথায় যেন বোম ফাটলো। বিরক্তি নিয়ে তেতে উঠে বলল সে,
--"এখন কি বাসর করে তারপর নামবি কোল থেকে?তাহলে চল!"

সূর্য তা শুনে তৎক্ষনাৎ ছিটকেওঠে গেল মিহিরের কোল থেকে।নাক ছিটকে বলল,
--"তোর কি আমাকে 'গে' মনে হয়? বাসর করতে হলে বিয়ে করে বউ নিয়ে বাসর কর, আনাকে টানছিস কেন?"

এমন খোলা মেলা কথায় তিয়াসা অভস্থ না, তাই তার কিছুটা অস্থি হচ্ছে। তা বুঝতে পেরে তুষার প্রসঙ্গ পাল্টে রিশা বলল,
---"কিরে এত মন দিয়ে কি ভাবছিস?"
---"ভাবছি একটা চেয়ারের জন্য কত বড় কাহিনী হয়ে গেল!"
পাশে থেকে শুভ্র বলল,
---"ঠিক বলেছ আপু।ইতিহাসে উল্লেখ থাকার মতো। "

একসাথে সবাই হো হো হেসে উঠলো।

স্নিগ্ধ হাহাকার করে চিৎকার করছে,
---“ওহ না! ওরে রাহি, দয়া কর!”


ক্যাম্পাস জুড়ে ছুটতে ছুটতে দুজন অনেকটা দূরে চলে এসেছে। এই দিকটায় এখন বেশ নির্জন—চারদিকে শুধু সবুজ ঘাস আর হালকা বাতাসের শব্দ।
দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ রাহি থেমে গেল। হাতে ধরা লাঠিটা বিরক্তি ভরে দূরে ছুড়ে ফেলল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে তার।
স্নিগ্ধও দৌড়ে এসে থামল তার সামনে। কয়েক সেকেন্ড শ্বাস নিল, তারপর যেন একদম ক্লান্ত হয়ে সোজা ঘাসে শুয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যেই মাথাটা গিয়ে পড়ল রাহির কোলে।
ঘটনাটা এত হঠাৎ ঘটল যে স্নিগ্ধ নিজেও বুঝতে পারল না সে কোথায় শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ করেই বলল,
— “উফফ… আর পারছি না।”

কিন্তু রাহির অবস্থা যেন অন্যরকম।
মুহূর্তেই তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। যেন সময়টা হঠাৎ থেমে গেছে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে স্নিগ্ধের মুখের দিকে। বাতাসে উড়ে আসা কয়েকটা চুল স্নিগ্ধের কপালে লেগে আছে,ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে,গোলাপি ঠোঁট জোড়া যেন জ্বলজ্বল করছে।রাহি বুঝল না ছেলে হয়ে স্নিগ্ধর ঠোঁট এমন গোলাপি কেন?ছেলেদের ঠোঁটতো কালচে বাদামি হয় তা হলে স্নিগ্ধ কি ঠোঁটে কিছু মাখে নাকি?

রাহির বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করছে।
কেমন এক নতুন অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরেছে—যেটা সে আগে কখনও টের পায়নি। প্রথমবার কোনো ছেলে এতটা কাছে। এতটা নির্ভর করে তার কোলে মাথা রেখে আছে।
তার হাত দুটো একটু কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে না কী করবে—মাথাটা সরিয়ে দেবে, নাকি এভাবেই থাকতে দেবে।
অস্বস্তিও লাগছে… আবার অদ্ভুত এক শান্তিও।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর হালকা বাতাস এসে দুজনের মাঝের নীরবতাটাকে আরও গভীর করে দিল।
ঠিক তখনই স্নিগ্ধ আধখোলা চোখে বলল,
— “রাহি…”
রাহি চমকে উঠল।
— “হু”
স্নিগ্ধ মৃদু হাসল, চোখ এখনও পুরো খোলা নয়।
— “তুমি মারতে এত দৌড়াও কেন?”

রাহি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল তার দিকে।তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে ধীর স্বরে বলল,
— “কারণ তুমি বিরক্ত করার রেকর্ড ভেঙে ফেলেছ।”

স্নিগ্ধ আধখোলা চোখে রাহির মুখপানে দৃষ্টি রেখে বলল,
–"অনেক জোরে লেগেছে মাথায়?"
রাহি উপর নিচ মাথা নাড়ালো।
---"সরি!আমি ইচ্ছে করে মারিনি।"...

একটু থেমে দৃষ্টি রাখল রাহির চোখে ফের বলল,
---"তোমার কি খারাপ লাগছে? "
---"কেন?"
---"এই যে আমি তোমার কোলে মাথা রেখেছি।"
---"না তো"
বলেই জিপ কাটলো রাহি।তালে তালে মুখ ফসকে সে কি বলে ফেলেছে।ভাবতেই লজ্জ্বা লাগছে। দূত দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরিয়ে নেয় রাহি।স্নিগ্ধ এবার চোখ খুলে আকাশের দিকে তাকাল।
— “হুম… কিন্তু দৌড়াতে দৌড়াতে এখানে এসে পড়া খারাপ হয়নি।”
রাহি চুপ করে গেল।
কারণ সে নিজেও মনে মনে ঠিক একই কথাই ভাবছিল।
চারপাশে নির্জন সবুজ মাঠ, নরম বাতাস, আর তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকা ছেলেটা—
মুহূর্তটা যেন অদ্ভুতভাবে শান্ত… আর একটু আলাদা।আজ কেন জানি ছেলেটাকে নিজের লাগছে,তাকে খুব করে জানতে ইচ্ছে করছে।এভাবে অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়।

Comments

    Please login to post comment. Login