ভাদ্র মাসে সাধারণত গরমের তেজ কিছুটা কমে আসার কথা, কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে আবহাওয়ার যে দাপট, তাতে মনে হচ্ছে তপ্ত চৈত্র মাস ফিরে এসেছে। সূর্যের প্রখর তাপে চারপাশ যেন খাঁ খাঁ করছে।
গাড়িতে বসে স্টিয়ারিং এর ওপর হাত রেখে রাগে গজগজ করছে মিহির। একে তো ভ্যাপসা গরম, তার ওপর রাস্তার এই অন্তহীন যানজট—সব মিলিয়ে ধৈর্য রাখা দায় হয়ে পড়েছে আজ তার জন্য।
একটু আগে রাহি ফোন দিয়েছিল। মিহির তখন সবে ক্লাস শেষ করে ক্যান্টিনের দিকে পা বাড়িয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ফোনটা বেজে ওঠে। এই কাঠফাটা রোদে ভরদুপুরে কেন যে তাকে হুট করে বাড়িতে যেতে বলল, সেটা ভেবেই মিহিরের রাগ লাগছে। আবার নিজের মনকে নিজেই সান্ত্বনা দিচ্ছে এই ভেবে যে—হয়তো রাহির পায়ের ব্যথাটা আবার বেড়েছে।
দু’দিন আগে রাহিকে কলেজে থেকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গিয়ে অফিসে গিয়েছিল মিহির। কিন্তু রাতে বাড়ি ফিরে শুনে। বাড়ি ফিরে নাচতে নাচতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় পা হড়কে নিচে পড়ে গিয়ে পা মচকে নিয়েছে সে। এখন তা ফুলে ঢোল হয়ে আছে। ঠিকমতো হাটতে পারেনা। তাই গত দুদিন কলেজেও যাওয়া হয় না। । সেই দুশ্চিন্তা আর বর্তমানের এই অসহ্য গরম—সব মিলিয়ে মিহিরের মেজাজটা আজ বড্ড খিটখিটে হয়ে আছে।তাই আর বেশি ভাবল না মিহির রাস্তা জ্যাম ছাড়ার অপেক্ষায় রইল।
..
..
এই কাঠফাটা গরমে ঢাকা শহরটা যেমন উওপ্ত হয়ে ও তার কবল থেকে বাদ পড়েনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন গুলোও।কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে আইসক্রিম খাওয়ার প্রতিযোগিতা লেগেছে যেন।সবার হাতে দুই তিনটি করে।আইসক্রিমওয়ালা মামাকে জোড় করে আটকে রেখেছে এখানে।
"ভাই দেখো আইসক্রিম!আমি খাব! আমাকে ওই ব্যাটার দোকানটা এনে দাও!"
শুভ্রর কথায় সবাই দেখলো সেদিকে।রুহি আর রিশা তো খুশিতে "ইএএএএএএএ" বলে একপ্রকার লাফিয়ে ওঠল।শুনা গেল রুহির গলা সে তুষারকে বলছে,
“এই তুষার, দে না আইসক্রিম কিনে!”
তুষার সঙ্গে সঙ্গে ন্যাকা সুরে উত্তর দিল—
— “এ্যাআআ! এসেছে আবার আইসক্রিম কিনে বলতে! ঝগড়া করার সময় মনে থাকে না? এখন ফকিরের মতো আমার কাছে টাকা চাইতে এসেছ!”
তুষারের কথা শুনে রুহির মুখটা চুপসে গেল। আজ তাড়াহুড়োয় টাকা আনতেই ভুলে গেছে সে। যা আছে, তা দিয়ে আবার বাড়ি ফিরতে হবে। না হলে সে কি আর ওই ঘ্যাড়ত্যাড়া তুষারের কাছে আইসক্রিম চাইত? হুমমম!এক নম্বর নাটকবাজ!
রুহি এসব ভাবছে, এমন সময় দেখা গেল তুষার, স্নিগ্ধ আর সূর্য মিলে আইসক্রিমওয়ালা লোকটাকে প্রায় বগলদাবা করে এদিকেই নিয়ে আসছে।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর আইসক্রিমওয়ালা মামা বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমারে এনা আটকাইয়া রাখছ কেলা? আইসক্রিম তো নিলা, এহন মুরে যাইতে দেও!”
তৎক্ষণাৎ সূর্য হেসে বলল,
“আরে মামা, আগে আমাদেরটা শেষ হোক, পরে যাইবেন।”
লোকটা আবার বলল,
“আননেগো যত লাগে লইয়া, মুরে যাইতে দেও।”
তুষার এবার প্রশ্ন করল,
“আপনার এত তাড়া কিসের মামা? কই যাইবেন?”
“মুই ওই কলেজের মাঠে যামু। ওনে বেশি বেচা হইব।”
স্নিগ্ধ সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠল,
“আরে মামা, এখন তো ক্লাস চলছে। এই রোদে মাঠে গিয়ে দাঁড়ানোর কী দরকার? একটু পরেই এদিকেই ভিড় লেগে যাবে।”
লোকটা আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় শুভ্র দৌড়ে গিয়ে আইসক্রিম ভ্যানটা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
“তা মামা, আননে যাইবেন যান। কিন্তু এই দোকান মুরে দিয়া যান! আননের দুখান এখন দিমু না কইলাম!”
বলেই আরও দুটো আইসক্রিম বের করে নিল ঢাকনা খুলে।শুভ্রর কান্ডে আইসক্রিমওয়ালা সহ উপস্থিত সবাই একযোগলা হেসে উঠলো। তাল মিলিয়ে সূর্য বলল,
"হক কতা ভাই, আই তোরে বুহে লইয়া একখান চুম্মা খাই"।
" ব্রাশ তোওও... আবার করেছ সকালে? নাকি.........
শুভ্রর কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই সূর্য হাতে থাকা অরেঞ্জ ফ্লেভারের আইসক্রিমটা ছুরে মারল তার দিকে।এই শুরু হলো দৌড়াদৌড়ি।
আইসক্রিমওয়াল প্রথমে চলে যেতে চাইছিল।তবে ধীরেধীরে ক্যাম্পাসের প্রায় অনেক স্টুডেন্টি এদিকে এসে বসছে আর আইসক্রিম নিচ্ছে।এখন যদি একস্থানে থেকে বেশি লাভ করা যায় তবে খারাপ কি?
..
..
..
চৌধুরী বাড়ির ফটক দিয়ে সবে মিহিরের কালো গাড়িটি প্রবেশ করল।১ঘন্টার রাস্তা আসতে আজ ৩ ঘন্টা লেগেছে জ্যামে পড়ে।গরম আর ক্লান্তি মিলেমিশে একাকার। এখন আপাতত সকল ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে অগ্রসর হলো বাড়ির ফটকের দিকে।তবে আশ্চর্য মিহির যতই সামনে এগোচ্ছে ততই বাড়ির ভেতর থেকে চেচামেচির শোরগোল শুনা যাচ্ছে।
মিহির ভ্রু কুঁচকে দ্রুত পা বাড়াল ভেতরের দিকে। যত সামনে যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে হৈচৈয়ের শব্দ। কোনো মেয়ের রাগী কণ্ঠ।
ড্রইংরুমে ঢুকতেই সে থমকে দাঁড়াল। গিয়ে যা দেখল তা মোটেও আশা করেনি মিহির।বিষ্ময়ে মুখ গলিয়ে বেরিয়ে গেল কিছু শব্দ____ " ওহ্ গড্ এরা কখন এলো? "
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দেয়ালের সাথে লাগোয়া এলইডি স্কিনের সামনে দাড়িয়ে ১০/১১ বছরের বাচ্চা ছেলের সাথে রিমোট নিয়ে ঝাগড়া করছে রাহি।ঝগড়া করছে বললে ভুল হবে একপ্রকার মারামারি ধস্তাধস্তি করছে দুজন।আসে পাশে তেমন আর কাউকে নজরে পড়লো না মিহিরের।এই দুই ঘূর্ণিঝড়কে রেখে বাড়ি সবাই কোথায় চলে গেছে? আজব!
মিহির ড্রয়িংরুমের দরজার সামনে গত ৫মিনিট ধরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে দৃশ্যটা রীতিমতো রণক্ষেত্রের মতো। সোফার কুশনগুলো মেঝেতে পড়ে আছে,
মিহির কোমর সোজা করে দাঁড়িয়ে এক হাত মাথায় দিয়ে গভীর শ্বাস নিল। তার মেজাজ এখন সপ্তমে। বাইরে ৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা, জ্যামে তিন ঘণ্টা বন্দি থাকার ক্লান্তি, আর ঘরে এসে এই দৃশ্য!সেভাবল কি? হলো কি,?
“রাহি!”
মিহিরের বজ্রকণ্ঠ শুনে দুই মূর্তিই জমে গেল। রাহি এক হাতে ছেলেটির কলার ধরে ছিল, আর অন্য হাত ছিল রিমোটের ওপর। মিহিরের আওয়াজে সে ঝট করে হাত সরিয়ে নিল। ছেলেটি সুযোগ বুঝে রিমোট নিয়ে সোফার পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল।
রাহি এবার কাঁচুমাচু মুখ করে নিজের ফুলে থাকা পা-টার ওপর ভার দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যথা অনুভব করতেই ‘উহ্’ করে উঠল।
মিহির রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,
“এই তোর না পা মচকে গেছে? তুই এই অবস্থায় ওর সাথে কুস্তি লড়ছিস?”
একটু নরতেই রাহি ব্যথায় মুখ কুঁচকে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। নাকে কান্নার স্বরে বলল,
“ভাইয়া, দেখ না এই বেয়াদবটা এসেছে থেকে আমাকে জালাচ্ছে।এখন একটু কে- ড্রামা দেখছিলাম। আর এই বেয়াদবটা এসে কার্টুন দেখবে।তাইতো একটু....."
মিহির কথার মাঝেই আটকে দিয়ে বলল,
"তাইতো, একটু! তাই তো একটু কি?তুই ওর সাথে মারামারি করবি!বড় হোসনি তুই?"
"তাই আমি ড্রামা দেখতে পারব না! বলেই ভেঙচি কাটল মুখ।
ছোট ছেলেটি হলো মিহিরের মামাতো ভাই আদি।ভীষন দুষ্ট। রাহির সাথে একদমই বনেনা।এতখন চুপকরে সব শুনছিল আদি, এবার সোফার পেছন থেকে মাথা উচিয়ে উঁকি দিয়ে রাহি ভেঙচি কেটে বলল,
“আমি কার্টুন দেখব! তুমি বুড়ি হয়ে গেছ, তুমি সিরিয়াল দেখো গে যাও।”
“তুই আমাকে বুড়ি বললি! দাড়া তোকে আজ...”
রাহি আবার উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু মিহিরের এক ধমকে থেমে গেল।
“চুপ একদম! আদি, রিমোটটা টেবিলে রাখ আর চুপচাপ গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে আয়। আর তুই রাহি, এই পা নিয়ে লাফালাফি করছিস, যদি হাড় সরে যেত?”
মিহির ট্রিশার্টের ওপর থেকে সাদা শার্ট খুলতে খুলতে এগিয়ে গিয়ে সোফায় বসল। আদি রিমোট রেখে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল। ঘরটা শান্ত হতেই মিহির চারপাশটা দেখে জিজ্ঞেস করল,
“বাড়ির সবাই কোথায়? মা- মামি কাউকে দেখছি না কেন?”
রাহি আস্তে করে নিজের পা-টা সোফার ওপর তুলে দিল।
“মামি মামনি পাশের বাড়িতে গেছে একজনের বিয়ে উপলক্ষে মিলাদ আছে সেখানে। আমার পায়ে ব্যথা তাই আমাকে নিয়ে যায়নি।
" আর আমাকে রেখে গেছে একে পাহারা দিতে।আবার পড়ে গিয়ে যদি প্যারালাইস্ট হয়ে যায়!
কোথা থেকে যেন আদি এসে বলল কথাটা এতেই আবার রাগে তেতে ওঠল রাহি।তবে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
" আসতে এতো দেরি করলে কেন? আমার জন্য আইসক্রিম আনোনি?”
রাহি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল,আদিও তার কান সজাগ রাখল। মিহির পকেট থেকে ফোন বের করতে বলল,
“আইসক্রিম না, তোর মাথা এনেছি! এই গরমে জ্যামে আটকে আমি শেষ, আর তোর কী সুন্দর আবদার?” "আমার জন্য আইসক্রিম আনোনি!"মুখ ভেংচে বলল মিহির।
মিহিরের উত্তর শুনে রাহি আর আদি—দু’জনের কেউই খুশি হতে পারল না। তারা একবার একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। তারপর একসাথে বিরক্ত গলায় চিৎকার করে উঠল____
“টু মাচ ডিসগাস্টিং, মিস্টার মিহির!”
দু’জনেই রাগে খচখচ করতে করতে ওপরের দিকে চলে গেল। যেতে যেতে তাদের কথাগুলো স্পষ্ট কানে এলো মিহিরের।আদি বিরক্ত মুখে বলছে,
“ধুর! কী কিপ্টে লোক রে বাবা!”
রাহি সঙ্গে সঙ্গে সায় দিল,
“হ্যা! চল তো, এখান থেকে।”
আদি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। তারপর একাই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে নিল।রাহি তৎক্ষণাৎ পেছন থেকে ডাকে ওঠল,
“এই ছোট প্যাকেট! একা কোথায় যাস?আমায় ধর তো একটু ।”
এরপর দু’জনে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। উঠতে উঠতেই আদি গম্ভীর গলায় বলল,
“ভাইয়ার কোনো ম্যানার্সই নেই। ছোটদের কীভাবে ট্রিট করতে হয়, সেটাই জানে না।”
রাহি ঠোঁট বাঁকিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় “হুম…”
তারপর একটু থেমে আবার বলল,
“যাক গে, চল আমার রুমে। চকলেট আছে, দু’জনে মিলে খাব।”
আদির চোখ মুহূর্তেই চকচক করে উঠল।
“সত্যি আপু?”
রাহি হেসে হালকা মাথা নাড়ল।
“হুম। চল, তাড়াতাড়ি।”
মিহির নিচে বসে ওদের কথাগুলো শুনে একপ্রকার আহাম্মকের মতো মুখ করে রইল। এই তো কিছুক্ষণ আগেও দু’জন একে অপরের সঙ্গে রিমোট নিয়ে যুদ্ধ করছিল,।যেই দুজনের মত মিলে গেছে সেই ভিলেন হয়ে গেছে মিহির। এখন দেখো—মনে হচ্ছে দুজন জন্মজন্মান্তরের বন্ধু!
তার ওপর যেতে যেতে সুন্দর করে তার নামে বদনামও করে গেল!
মিহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিল। তারপর বিড়বিড় করে বলল,
“অদ্ভুত দুইটা পিস!”