ভয়ংকর প্রেম কাহিনী
পর্ব ২: অদৃশ্য ছোঁয়া ও প্রথম রক্ত
আদিত্যর বয়স এখন বারো। সাভারের গ্রামীণ প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে সে এখন উপজেলা হাইস্কুলে পড়ে। প্রতিদিন সকাল ছয়টায় উঠে গরুর ঘাস কাটা, ছাগল চরানো, তারপর দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুল। পায়ের চটি আরও অনেকবার ফেটেছে, কিন্তু আদিত্য আর কাঁদে না। তার চোখে এখন একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা এসেছে।
সৎমা সালমা এখন আর শুধু মারধর করে না, সে আদিত্যকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়। “তোর জন্যই আমার সংসারে অশান্তি। তোর মা মরে গিয়ে তোকে অভিশাপ দিয়ে গেছে।” রাতে খাওয়ার পর আদিত্যকে উঠানে শুতে হয়। শীতের রাতে কাঁথা ছাড়াই। কিন্তু প্রতিবার যখন ঠান্ডায় তার শরীর কাঁপতে থাকে, তখন একটা উষ্ণ ছোঁয়া অনুভব হয়। পরী। সে আসে। চুপচাপ পাশে বসে, তার লম্বা চুল আদিত্যর কপালে পড়ে। কোনো কথা বলে না, শুধু হাত বুলিয়ে দেয়।
“তুমি কেন আসো?” এক রাতে আদিত্য ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করেছিল।
পরী হেসেছিল। তার হাসি এখনও শব্দহীন, কিন্তু চোখে গভীর মায়া। “কারণ তুমি আমার। জন্মের আগে থেকে।”
রাহাত ও সুমনের বন্ধুত্ব
স্কুলে রাহাত এখন আরও মোটা হয়েছে, কিন্তু তার হাসি একই রকম। সে প্রতিদিন দুপুরে টিফিন বাক্স খুলে আদিত্যকে জোর করে খাওয়ায়। “ভাই, তুই না খেলে আমার পেট ভরে না।” সুমন চুপচাপ, কিন্তু পড়াশোনায় এক নম্বর। সে আদিত্যকে রাতে পড়তে দেয় তার বাড়িতে। তিনজন মিলে একটা গোপন জায়গা বানিয়েছিল—নদীর পাড়ের পুরোনো আমগাছের নিচে। সেখানে তারা স্বপ্ন দেখত। রাহাত বলত, “আমি বড় হয়ে ব্যবসায়ী হব, গাড়ি চালাব।” সুমন বলত, “আমি ডাক্তার হব।” আদিত্য শুধু চুপ করে থাকত। সে জানতো না তার ভবিষ্যৎ কী। শুধু জানতো, পরী আছে।
একদিন স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে আদিত্যর পা ভেঙে গেল। অন্য ছেলেরা ধাক্কা দিয়েছিল। হাড় সরে গিয়েছিল। ব্যথায় সে চিৎকার করছিল। হাসপাতালে নেওয়ার টাকা ছিল না। বাবা করিম শুধু কাঁদছিল। সেই রাতে, যখন আদিত্য জ্বরে পুড়ছিল, পরী এসে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। পরের দিন সকালে আদিত্য উঠে দেখল, তার পা স্বাভাবিক। কোনো ব্যথা নেই। ডাক্তার অবাক হয়ে বলল, “এ তো অলৌকিক!”
স্কুলের সবাই ফিসফিস করতে লাগল। “আদিত্য ভূতের সঙ্গে কথা বলে।”
প্রথম ভালোবাসার ছোঁয়া
ত্রয়োদশ বর্ষে আদিত্যর ক্লাসে নতুন একটা মেয়ে এল। তার নাম নাদিয়া। ঢাকা থেকে বাবার চাকরির সূত্রে গ্রামে এসেছে। ফর্সা, লম্বা চুল, চোখে স্বপ্ন। সে পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু খুব একা। প্রথম দিনই সে আদিত্যর পাশের বেঞ্চে বসল।
“তোমার নাম আদিত্য? আমি নাদিয়া।” তার গলার স্বর মিষ্টি।
আদিত্যর বুক কেঁপে উঠল। প্রথমবার কোনো মেয়ে তার সঙ্গে এত সুন্দর করে কথা বলল। স্কুল ছুটির পর তারা একসঙ্গে হাঁটত। নাদিয়া তার ঢাকার গল্প শোনাত। আদিত্য শুধু শুনত। সে লজ্জায় বলতে পারত না তার বাড়ির কথা, সৎমার নির্যাতনের কথা।
কিন্তু পরী জানত। একদিন নদীর ধারে যখন আদিত্য আর নাদিয়া একা বসেছিল, হাওয়া হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। নাদিয়া কেঁপে উঠে বলল, “কেউ যেন আমাদের দেখছে।”
আদিত্য চুপ করে রইল। সে জানত, পরী রাগ করছে।
সেই রাতে পরী প্রথমবার রাগ দেখাল। আদিত্য ঘুমের মধ্যে দেখল, পরী তার সামনে দাঁড়িয়ে, চোখ দুটো লাল। “তুমি আমাকে ভুলে যাবে? নাদিয়ার জন্য? আমি তোমার জন্য মরেছি, আদিত্য। এখন তুমি আমার জন্য বাঁচবে।”
আদিত্য ঘুম ভেঙে দেখল তার হাত কাটা। রক্ত পড়ছে। সে নিজে কাটেনি।
প্রথম বড় বিপদ
চৌদ্দ বছর বয়সে আদিত্যর জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ঘটল। গ্রামের এক দুর্ধর্ষ ছেলে, রুবেল, নাদিয়াকে পছন্দ করত। সে আদিত্যকে হুমকি দিল, “ওর কাছ থেকে দূরে থাক, না হলে তোকে শেষ করে দেব।”
এক সন্ধ্যায় রুবেল তার তিন বন্ধু নিয়ে আদিত্যকে নদীর ধারে আটকে ফেলল। তাদের হাতে লাঠি আর চাকু। “আজ তোর শেষ দিন।” রুবেল বলল।
প্রথম লাঠির আঘাতে আদিত্য মাটিতে পড়ে গেল। রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল মাথা থেকে। রাহাত আর সুমন দূর থেকে ছুটে আসছিল, কিন্তু পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে। আদিত্য চোখ বন্ধ করে ফেলল। মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছিল।
ঠিক তখনই ঝড় উঠল। আকাশ কালো হয়ে গেল। নদীর পানি উথলে উঠল। রুবেল আর তার বন্ধুরা চিৎকার করে উঠল। তারা দেখল, একটা সাদা আলোকিত মূর্তি তাদের ঘিরে ধরেছে। পরী। তার চুল হাওয়ায় উড়ছে, চোখে আগুন।
রুবেলের এক বন্ধু অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। অন্যজন পাগলের মতো ছুটতে গিয়ে নদীতে পড়ে গেল। রুবেল নিজে পালাতে গিয়ে পা ভেঙে চিৎকার করতে লাগল।
আদিত্য যখন চোখ খুলল, সে দেখল পরী তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার ঠোঁটে রক্ত লেগে আছে। “যারা তোমাকে ছুঁতে চায়, তাদের আমি শেষ করে দেব। তুমি শুধু আমার।”
সেই ঘটনার পর গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। রুবেল হাসপাতালে বলেছিল, “ভূত... একটা মেয়ের ভূত আমাদের আক্রমণ করেছে।” লোকেরা আদিত্যকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। শুধু রাহাত আর সুমন তার পাশে রইল। নাদিয়া ভয় পেয়ে কয়েকদিন স্কুলে আসেনি।
কিন্তু আদিত্যর ভিতরে একটা নতুন অনুভূতি জাগছিল। পরীর প্রতি ভয় আর আকর্ষণ মিশে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, এই প্রেম সাধারণ নয়। এটা ভয়ংকর। এটা রক্ত চায়, আত্মা চায়।
রাতে আদিত্য জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “পরী... তুমি কে? সত্যি করে বলো।”
অন্ধকার থেকে উত্তর ভেসে এল, “আমি তোমার অতীত। তোমার ভবিষ্যৎ। আর তোমার মৃত্যুর পরেও আমি তোমার সঙ্গে থাকব। কিন্তু সাবধান, আদিত্য। যদি অন্য কাউকে ভালোবাসো, তাহলে এই দুনিয়া তোমার জন্য নরক হয়ে যাবে।”
বাইরে আবার ঝড় আসছিল। আদিত্যর হাতে সেই লাল ফুলটা ফুটে উঠেছিল আবার। রক্তের মতো লাল।
(পর্ব ২ সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্বে: কলেজ জীবন, নাদিয়ার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, পরীর আরও ভয়ংকর রূপ, প্রথম বড় ধরনের বিপর্যয় এবং আদিত্যর ভিতরের দ্বন্দ্বের তীব্রতা।
এই পর্বটি পড়তে প্রায় ১২-১৪ মিনিট সময় লাগবে। গল্প এখন আরও গভীর ও অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে। পড়া শেষ হলে বলো, তৃতীয় পর্ব লিখব।
17
View