Posts

গল্প

গ্রাম্য কৃষক করিম মিয়ার পরিশ্রম এর গল্প।

June 1, 2026

Shafin pro

3
View

বাংলাদেশের একটি ছোট্ট সবুজ গ্রাম। গ্রামের নাম শ্যামপুর। চারদিকে ধানক্ষেত, নদী, খাল-বিল আর গাছপালায় ভরা সেই গ্রামে বাস করতেন এক পরিশ্রমী কৃষক—করিম মিয়া। তিনি ছিলেন খুবই সৎ, পরিশ্রমী এবং দয়ালু মানুষ। গ্রামের সবাই তাকে সম্মান করত। তার পরিবারে ছিলেন স্ত্রী রহিমা বেগম, ছেলে রফিক এবং মেয়ে সালমা।
করিম মিয়ার নিজের খুব বেশি জমি ছিল না। মাত্র কয়েক বিঘা জমি নিয়ে তিনি চাষাবাদ করতেন। তবে জমি কম হলেও তিনি কখনো অলসতা করতেন না। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে মাঠে চলে যেতেন। মাঠে কাজ করাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
একদিন ভোরবেলা করিম মিয়া মাঠে গিয়ে দেখলেন, রাতের বৃষ্টিতে ধানের চারা বেশ সতেজ হয়ে উঠেছে। তিনি খুব খুশি হলেন। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। কয়েক সপ্তাহ পর গ্রামের ওপর দিয়ে একটি প্রবল ঝড় বয়ে গেল। ঝড়ে অনেক কৃষকের ফসল নষ্ট হয়ে গেল। করিম মিয়ার ক্ষেতও ক্ষতিগ্রস্ত হলো।
ফসলের ক্ষতি দেখে অনেক কৃষক হতাশ হয়ে পড়লেন। কেউ কেউ ঋণের চিন্তায় রাতের ঘুম হারিয়ে ফেললেন। কিন্তু করিম মিয়া হাল ছাড়লেন না। তিনি বললেন,
“আল্লাহ পরিশ্রমের ফল দেন। আজ ক্ষতি হয়েছে, কাল ভালো কিছু হবে।”
তার এই কথা শুনে গ্রামের মানুষও সাহস পেল।
করিম মিয়া আবার নতুন করে কাজ শুরু করলেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিষ্কার করলেন, নতুন বীজ সংগ্রহ করলেন এবং ধৈর্যের সঙ্গে চাষ করতে লাগলেন। গ্রামের কিছু গরিব কৃষকের বীজ কেনার সামর্থ্য ছিল না। করিম মিয়া নিজের সামান্য সঞ্চয় থেকে তাদের সাহায্য করলেন।
একদিন গ্রামের একজন বৃদ্ধ কৃষক তার কাছে এসে বললেন,
“করিম, তোমার নিজেরই অনেক কষ্ট। তারপরও তুমি অন্যদের সাহায্য করো কেন?”
করিম মিয়া হেসে বললেন,
“মানুষ মানুষের জন্য। আমি যদি আজ সাহায্য করি, আল্লাহ হয়তো অন্যভাবে আমাকে সাহায্য করবেন।”
তার এই কথায় বৃদ্ধ কৃষক খুব আবেগাপ্লুত হলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ফসল বড় হতে লাগল। করিম মিয়া দিন-রাত পরিশ্রম করতেন। রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড়—কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারত না। তার ছেলে রফিকও বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ শিখতে শুরু করল।
একদিন রফিক জিজ্ঞেস করল,
“আব্বা, তুমি এত কষ্ট করো কেন?”
করিম মিয়া বললেন,
“কষ্ট না করলে সফলতা আসে না। মাটিকে ভালোবাসতে হয়। মাটি কখনো তার পরিশ্রমী সন্তানকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেয় না।”
রফিক বাবার কথা মন দিয়ে শুনল।
কয়েক মাস পরে ফসল কাটার সময় এল। সোনালি ধানে ভরে উঠল করিম মিয়ার ক্ষেত। এবার ফলন আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি হলো। শুধু করিম মিয়াই নয়, গ্রামের অনেক কৃষকই ভালো ফলন পেলেন। সবাই খুব খুশি হলো।
ফসল বিক্রি করে করিম মিয়া কিছু টাকা সঞ্চয় করলেন। তিনি সেই টাকা দিয়ে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার ব্যবস্থা করলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষের জীবনের আলো।
সালমা পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। একদিন সে বাবাকে বলল,
“আব্বা, আমি বড় হয়ে শিক্ষক হতে চাই।”
করিম মিয়া আনন্দে বললেন,
“অবশ্যই হবে মা। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো।”
এভাবেই দিন চলতে লাগল।
এক বছর পর গ্রামে ভয়াবহ খরা দেখা দিল। অনেক জমিতে পানি ছিল না। কৃষকেরা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। করিম মিয়া চিন্তা করলেন কীভাবে এই সমস্যা সমাধান করা যায়। তিনি গ্রামের কয়েকজন কৃষককে নিয়ে একটি সেচ প্রকল্প শুরু করলেন। সবাই মিলে খাল পরিষ্কার করলেন এবং মাঠে পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন।
এই উদ্যোগের ফলে গ্রামের অনেক জমি রক্ষা পেল। গ্রামের মানুষ করিম মিয়ার প্রশংসা করতে লাগল। কিন্তু তিনি কখনো অহংকার করতেন না। তিনি বলতেন,
“এটা আমার একার কাজ নয়। সবাই মিলে করেছি।”
করিম মিয়ার সততা ও পরিশ্রমের কথা আশেপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ল। একদিন উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কয়েকজন কর্মকর্তা তার খামার দেখতে এলেন। তারা করিম মিয়ার কাজ দেখে খুব মুগ্ধ হলেন।
কর্মকর্তারা বললেন,
“আপনি আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে আরও ভালো ফলন পাবেন।”
তারা তাকে নতুন কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিলেন। করিম মিয়া নতুন বিষয়গুলো মনোযোগ দিয়ে শিখলেন। এরপর তিনি ধীরে ধীরে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে শুরু করলেন।
ফলাফলও ভালো হলো। তার উৎপাদন বৃদ্ধি পেল। গ্রামের অন্য কৃষকেরাও তার কাছ থেকে নতুন পদ্ধতি শিখতে লাগলেন।
একদিন উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কৃষক নির্বাচনের অনুষ্ঠান হলো। সেখানে করিম মিয়াকে শ্রেষ্ঠ কৃষক হিসেবে পুরস্কার দেওয়া হলো। মঞ্চে উঠে পুরস্কার গ্রহণ করার সময় তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন।
তিনি বললেন,
“এই পুরস্কার শুধু আমার নয়। এটি আমার পরিবারের, আমার গ্রামের এবং সকল পরিশ্রমী কৃষকের।”
তার বক্তব্য শুনে সবাই হাততালি দিল।
বছর কেটে গেল। রফিক বড় হয়ে কৃষিবিদ হলো। সে আধুনিক কৃষি নিয়ে পড়াশোনা করে গ্রামে ফিরে এল। বাবার সঙ্গে মিলে সে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে লাগল। এতে গ্রামের কৃষিতে এক নতুন যুগের সূচনা হলো।
সালমাও পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষক হলো। সে গ্রামের শিশুদের শিক্ষা দিতে শুরু করল।
করিম মিয়া বৃদ্ধ হয়ে গেলেন। আগের মতো মাঠে কাজ করতে না পারলেও প্রতিদিন মাঠে গিয়ে ফসল দেখতেন। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং পরামর্শ দিতেন।
একদিন গ্রামের স্কুলে তাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হলো। সেখানে তিনি শিশুদের উদ্দেশ্যে বললেন,
“জীবনে সফল হতে হলে তিনটি জিনিস মনে রাখতে হবে—সততা, পরিশ্রম এবং ধৈর্য। আমি কৃষক মানুষ। আমার শিক্ষক ছিল এই মাটি। মাটি আমাকে শিখিয়েছে, বীজ বপনের পর সঙ্গে সঙ্গে ফল পাওয়া যায় না। অপেক্ষা করতে হয়, যত্ন নিতে হয়। মানুষের জীবনও ঠিক তেমন।”
শিশুরা মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনল।
কিছুদিন পর করিম মিয়া অসুস্থ হয়ে পড়লেন। গ্রামের মানুষ তাকে দেখতে আসত। সবাই তার জন্য দোয়া করত। কারণ তিনি শুধু একজন কৃষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রামের অভিভাবকের মতো।
এক বিকেলে তিনি নিজের উঠানে বসে সোনালি সূর্যাস্ত দেখছিলেন। তার সামনে সবুজ ধানক্ষেত দুলছিল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “জীবনটা বৃথা যায়নি। আমি মাটিকে ভালোবেসেছি, মানুষকে ভালোবেসেছি।”
তার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
করিম মিয়ার জীবন গ্রামের মানুষের জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে রইল। তার গল্প প্রমাণ করে যে পরিশ্রম, সততা এবং মানবতার মাধ্যমে একজন সাধারণ কৃষকও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারেন। তিনি দেখিয়েছেন, মাটির সঙ্গে যার সম্পর্ক গভীর, তার জীবনও হয়ে ওঠে সমৃদ্ধ ও অর্থবহ।
নীতিশিক্ষা: পরিশ্রম, সততা, ধৈর্য এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা মানুষকে সফল ও সম্মানিত করে তোলে।

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Shafin pro 1 hour ago

    পরিশ্রম করলে সফলতা আসবি। তাই প্রমাণ কর গল্পটির পড়বেন অপরকে পড়তে বলবেন। ধন্যবাদ