মরিচীকা ও মায়াজাল১. তপ্ত বালুর বুকে স্বপ্নের বীজদুবাইয়ের আল কুজ শিল্প এলাকার লেবার ক্যাম্পের চার নম্বর রুম। দেয়ালের এক কোণে লাগানো ছোট প্লাস্টিকের পাখাটা কোনোমতে গরম বাতাস তাড়িয়ে চলেছে। ঘরের এক কোণে পাতলা ম্যাট্রেসে শুয়ে আছেন হামিদ মিয়া। বয়স পঁয়ত্রিশ, কিন্তু কপালের গভীর ভাঁজ আর চুলে পাক ধরা রূপ দেখে মনে হয় বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। গত দশটা বছর এই মরুভূমির দেশে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন তিনি।হামিদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। যখন দেশ ছেড়েছিলেন, তখন বাড়িতে ছিল বৃদ্ধ মা আর নতুন বিয়ে করা আঠারো বছরের রূপবতী স্ত্রী সুমি। সুমির ডাগর চোখ আর মিষ্টি হাসির মায়ায় পড়ে হামিদ প্রথম প্রথম প্রায়ই কাঁদতেন। কিন্তু পকেটের শূন্যতা আর সংসারের ঋণের বোঝা তাকে পাথর বানিয়ে দিয়েছিল।কনস্ট্রাকশন সাইটে ১২ ঘণ্টা ডিউটি শেষে যখন হাত-পা ব্যথায় অবশ হয়ে আসত, তখন হামিদ একটা ভাঙা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতেন। তিনি ভাবতেন, "আমি কষ্ট করছি তো কী হয়েছে? আমার সুমি তো ভালো আছে। ও তো সুখে আছে।"প্রতি মাসের এক তারিখে ওভারটাইমের টাকাসহ পুরো বেতনটা হামিদ দেশে পাঠিয়ে দিতেন। নিজের জন্য রাখতেন শুধু মেসের খাওয়া খরচ আর সামান্য কিছু হাতখরচ। সুমি ফোনে বলত, "তুমি নিজের খেয়াল রেখো। এখানে একটা ভালো বাড়ি করতে হবে, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। টাকা পাঠাতে কিপটেমি করো না।"হামিদ সুমির এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ভালোবাসার দাবি হিসেবেই দেখতেন। স্ত্রীর প্রতি তার অন্ধ বিশ্বাস ছিল এক অলঙ্ঘনীয় দেয়ালের মতো।২. সোনার খাঁচা এবং বদলে যাওয়া সুমিদশ বছরে হামিদের পাঠানো টাকায় সুমি গ্রামে একটা আলিশান দোতলা বাড়ি তুলেছে। গ্রামের মানুষ এখন সুমিকে সম্মান করে, সমীহ করে চলে। সুমির পরনে এখন দামি কাতান শাড়ি, হাতে সোনার চুড়ি, আর চোখে আধুনিকতার ছোঁয়া। হামিদ যখন ফোন করতেন, সুমি প্রায়ই ব্যস্ততা দেখাত।"আজকে ব্যাংকে যেতে হবে," "আজকে ফার্নিচারের দোকানে লোক আসবে," "বান্ধবীর বিয়েতে যাচ্ছি"—এইসব অজুহাতে সুমি হামিদের সাথে কথা বলা কমিয়ে দিল।হামিদ ভাবতেন, একা একটা মেয়ে মানুষ, এত বড় বাড়ি সামলাচ্ছে, কত ধকল যায় তার ওপর! হামিদ কখনো সুমিকে সন্দেহ করেননি। অথচ সুমি তখন হামিদের পাঠানো টাকায় নিজের রূপচর্চা আর বিলাসী জীবনে মত্ত।এরই মাঝে সুমির জীবনে প্রবেশ করে আরিফ। আরিফ স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার ভাগ্নে, বেকার কিন্তু চালচলনে আধুনিক আর কথায় পটু। সুমির একাকীত্ব আর হামিদের পাঠানো অঢেল টাকা আরিফকে আকর্ষণ করল। সুমি হামিদের উপার্জিত টাকা দিয়ে আরিফকে দামি মোটরবাইক কিনে দিল, প্রতিদিন রেস্তোরাঁয় খাওয়া আর ঘোরার খরচ জোগাতে লাগল। অথচ মরুভূমির তপ্ত রোদে হামিদ তখন দুপুরের খাবার হিসেবে শুধু শুকনো রুটি আর পানি খেয়ে টাকা বাঁচাচ্ছিলেন।৩. আকস্মিক প্রত্যাবর্তনদশ বছর পর হামিদ সিদ্ধান্ত নিলেন এবার পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরে যাবেন। সুমিকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে টিকিট কাটলেন। মনে মনে কত পরিকল্পনা! এবার সুমির পাশে বসে গল্প করবেন, নিজের করা দোতলা বাড়িতে শান্তিতে ঘুমাবেন, আর জমানো বাকি টাকা দিয়ে বাজারে একটা বড় ব্যবসা দেবেন।এয়ারপোর্ট থেকে নেমে যখন হামিদ নিজের গ্রামের বাড়ির সামনে দাঁড়ালেন, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। নিজের ঘামে ভেজা টাকায় তৈরি রাজপ্রাসাদসম বাড়িটা দেখে হামিদের চোখ আনন্দে ভিজে এল। সদর দরজা খোলাই ছিল। হামিদ পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকলেন।ড্রয়িংরুম পেরিয়ে শোবার ঘরের দিকে যেতেই তার কানে এল হাসির আওয়াজ। পুরুষ আর নারীর সম্মিলিত হাসি।হামিদ দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে তাকালেন। তার পায়ের তলার মাটি যেন এক নিমেষে ধসে গেল। বিছানায় বসে সুমি আর আরিফ তখন মদ্যপ অবস্থায় হাসাহাসি করছে। হামিদের পাঠানো টাকায় কেনা এসি রুমে তারা দুজনে পরম নিশ্চিন্তে খুনসুটি করছে।হামিদকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুমি প্রথমে চমকে উঠলেও পরক্ষণেই তার মুখ শক্ত হয়ে গেল। কোনো লজ্জা বা অনুশোচনার বালাই ছিল না তার চোখে।"তুমি না বলে কয়ে চলে এলে কেন?" সুমির কণ্ঠে মধুর পরিবর্তে বিষ ঝরে পড়ল।আরিফ উঠে দাঁড়িয়ে হামিদকে ধাক্কা দিয়ে বলল, "এই মিয়া, কে তুমি? চোর নাকি? বের হও বাড়ি থেকে!"হামিদ বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। যে সুমির জন্য তিনি যৌবনের দশটি বছর মরুভূমিতে কয়লা বানিয়েছেন, সেই সুমি তাকে চোর বলে সম্বোধন করা লোকটাকে থামাল না।৪. সর্বস্ব হারানোর নির্মম সত্যপরদিন সকালে হামিদ জানতে পারলেন আরও বড় এক নির্মম সত্য। তিনি এত বছর ধরে সুমির নামে যে টাকা পাঠিয়েছেন, সুমি তার একটি টাকাও হামিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখেনি। শুধু তাই নয়, যে জমি এবং দোতলা বাড়িটার জন্য হামিদ রক্ত পানি করেছেন, সেই সমস্ত দলিল সুমি নিজের নামে এবং কিছু অংশ আরিফের নামে লিখিয়ে নিয়েছে। আইনগতভাবে হামিদ এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব। তার নিজের বলতে শুধু হাতের ওই পুরনো ট্রাঙ্কটা আর পরনের কাপড়টুকু ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।হামিদ যখন গ্রামের মাতব্বরদের কাছে বিচার চাইলেন, তখন সুমি উল্টো হামিদের নামে মিথ্যা অপবাদ দিল। সুমি দাবি করল, হামিদ বিদেশে আরও বিয়ে করেছে এবং দেশে কোনো টাকা পাঠাত না। গ্রামের প্রভাবশালী আরিফের ভয়ে কেউ হামিদের পক্ষে কথা বলতে সাহস পেল না। মাতাব্ববরেরা হামিদকেই গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন।৫. শেষ পরিণতিএক ঝড়ের রাতে হামিদ মিয়া তার সেই পুরনো ট্রাঙ্কটা হাতে নিয়ে নিজের তৈরি করা রাজপ্রাসাদের দিকে শেষবারের মতো তাকালেন। চোখ দিয়ে তার অশ্রু ঝরছিল না, কারণ কষ্টের তীব্রতায় তার চোখের পানিও শুকিয়ে গিয়েছিল।যে স্ত্রীর সুখের জন্য তিনি নিজের জীবনটা বিলিয়ে দিলেন, সেই স্ত্রী তাকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলল। প্রবাসীদের রক্তে ভেজা রেমিট্যান্সে কত সুমিরা এভাবে ডানা মেলে, আর কত হামিদ মিয়ারা নিঃশব্দে ধ্বংস হয়ে যায়, তার হিসাব রাখার কেউ থাকে না। হামিদ মিয়া স্টেশনের এক কোণে বসে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেখানে তার ভবিষ্যৎ আর জীবনের কোনো আলো অবশিষ্ট ছিল না।গল্পটি প্রবাসীদের অন্ধ বিশ্বাসের এক সতর্কবাণী।
Comments
-
Shafin pro 1 week ago
প্রবাসী হামিদ মিয়া জীবন কাহিনী গল্পটি কেমন লাগলো নিজেকে খুব কষ্টদায় গল্পটি এখানেই শেষ নয় সকল প্রবাসীদের জন্য সতর্কবাণী