শামীম ঢাকা শহরের চার দেয়ালের বন্দিজীবন থেকে একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে দুই দিনের ছুটি নিয়ে ছুটে এসেছিল কক্সবাজারে। ইটের ওপর ইট গেঁথে তৈরি করা যান্ত্রিক শহর ঢাকা, যেখানে সকাল হয় গাড়ির হর্ন আর ধোঁয়ার কুন্ডলী দিয়ে, আর রাত নামে ক্লান্তিকর ট্রাফিক জ্যামের ক্লান্তি নিয়ে। সেই তুলনায় কক্সবাজার যেন এক টুকরো স্বর্গ। বিশাল নীল জলরাশি আর দিগন্তজোড়া বালুচর শামীমের চোখের সব ক্লান্তি এক নিমেষে দূর করে দিয়েছিল।বিকেলের দিকে শামীম সুগন্ধা পয়েন্টের সি-বিচে একা একা হাঁটছিল। সাগরের গর্জন আর মৃদু বাতাস তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি এনে দিচ্ছিল। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে, চারদিকের আকাশে আবির ছড়ানো। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা বড় ঢেউ এসে শামীমের পায়ের কাছে আছড়ে পড়ল। ঢেউটি যখন আবার সাগরের বুকে ফিরে যাচ্ছিল, তখন ভেজা বালুর ওপর চকচকে একটা জিনিস শামীমের নজরে এলো।কৌতূহলবশত শামীম এগিয়ে গিয়ে জিনিসটা হাতে তুলে নিল। সেটি ছিল একটি নিপুণ কারুকার্যখচিত রুপালি পায়ের নুপুর। নুপুরটির গায়ে ছোট ছোট ঘুঙুর লাগানো, যা বাতাসে সামান্য নড়তেই মৃদু মিষ্টি আওয়াজ তুলছিল। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল, নুপুরের ঠিক মাঝখানে একটা নীল পাথরের লকেট ঝুলছিল, যার ওপর খুব ছোট অক্ষরে ইংরেজি ‘S’ বর্ণটি খোদাই করা ছিল।নুপুরটি হাতে নিয়ে শামীম অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল। বিস্তীর্ণ সৈকতে হাজার হাজার মানুষ। কেউ ছবি তুলছে, কেউ সাগরের পানিতে পা ভেজাচ্ছে, আবার কেউ ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই বিশাল জনসমুদ্রে এই মূল্যবান এবং আবেগ জড়ানো নুপুরটি কার হতে পারে? শামীমের মনে হলো, যার নুপুর হারিয়েছে, সে নিশ্চয়ই খুব মন খারাপ করে এটি খুঁজছে। নুপুরটির নিখুঁত গড়ন বলে দিচ্ছিল, এটি কোনো সাধারণ সস্তা গয়না নয়, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ গল্প বা স্মৃতি রয়েছে।শামীম সিদ্ধান্ত নিল, সে নুপুরের আসল মালিককে খুঁজে বের করবে এবং এটি তাকে ফেরত দেবে। সে নুপুরটি পকেটে পুরে সৈকতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হাঁটতে শুরু করল। যেখানেই কোনো তরুণী বা পরিবারকে কোনো জিনিস খুঁজতে দেখছিল, শামীম সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করছিল।প্রথমে সে এক দম্পতির কাছে গেল, যারা বালুর ওপর গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু খুঁজছিলেন। শামীম ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, আপনাদের কিছু হারিয়েছে?"ভদ্রলোক হতাশ গলায় বললেন, "হ্যাঁ ভাই, আমার স্ত্রীর চশমাটা ঢেউয়ে ভেসে গেছে।" শামীম মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার হাঁটতে লাগল।একটু দূরে তিন-চারজন মেয়ে ছবি তুলছিল। তাদের হাসাহাসির মাঝে শামীম গিয়ে দাঁড়াল। সে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল, "আপনাদের কি কোনো গয়না বা নুপুর হারিয়েছে?"মেয়েগুলো একে অপরের দিকে তাকাল, তারপর একজন হেসে বলল, "না তো ভাইয়া! আমাদের সব ঠিক আছে। কেন, আপনি কি কোনো সোনার গয়না কুড়িয়ে পেয়েছেন নাকি?"শামীম মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সামনে এগিয়ে গেল।সন্ধ্যা নেমে এলো। সৈকতের ফ্লাডলাইটগুলো জ্বলে উঠল। সাগরের গর্জন আরও তীব্র হতে লাগল। শামীম প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে পুরো সৈকত চষে বেড়াল, কিন্তু নুপুরের মালিকের কোনো সন্ধান পেল না। সে লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত গেল, স্থানীয় ঝিনুকের দোকানদারদের সাথে কথা বলল, এমনকি ট্যুরিস্ট পুলিশের বুথে গিয়েও খোঁজ নিল যে কেউ নুপুর হারানোর ডায়েরি করেছে কি না। কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হলো।পরদিন শামীমের ঢাকায় ফেরার ট্রেন ছিল। সারারাত হোটেল রুমে বসে সে শুধু নুপুরটার দিকে তাকিয়ে রইল। নীল পাথরের লকেটটা লাইটের আলোয় চকচক করছিল। শামীমের মনে এক অদ্ভুত টান তৈরি হলো এই রহস্যময় নুপুরটার প্রতি। সে ভাবল, হয়তো নুপুরের মালিকও এখন ঢাকারই কোনো এক কোণে বসে তার এই প্রিয় জিনিসটার জন্য আফসোস করছে।ঢাকায় ফিরে শামীম আবার তার চেনা ব্যস্ত জীবনে জড়িয়ে পড়ল। মতিঝিলের করপোরেট অফিসের ফাইলপত্র, কম্পিউটারের স্ক্রিন আর মিটিংয়ের ভিড়ে কক্সবাজারের সেই নীল সাগর আর রুপালি নুপুরের কথা সে প্রায় ভুলতেই বসেছিল। কিন্তু নুপুরটি সবসময় তার ড্রয়ারের একটি ছোট মখমলের বাক্সে যত্নে রাখা ছিল। মাঝে মাঝে রাতে ড্রয়ার খুললে নুপুরের ঘুঙুরের হালকা আওয়াজ তাকে সেই অন্তহীন সাগরের তীরে ফিরিয়ে নিয়ে যেত।ঢাকায় ফেরার প্রায় ছয় মাস পরের কথা। শামীম তখন ধানমন্ডির একটি নামী কফি শপে বসে অফিসের কিছু জরুরি প্রেজেন্টেশন তৈরি করছিল। কফি শপটি বেশ শান্ত ছিল, ব্যাকগ্রাউন্ডে মৃদু মিউজিক বাজছিল। হঠাৎ করেই শামীমের পেছনের টেবিলে এসে বসলেন দুজন তরুণী। তারা নিজেদের মধ্যে খুব নিচু স্বরে কথা বলছিলেন।শামীম তার কাজে মগ্ন ছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই পেছনের টেবিল থেকে আসা একটি বাক্য তার কান সজাগ করে তুলল।একটি মেয়ে বলছিল, "জানিস সায়মা, মা আমাকে আমার গত জন্মদিনে যে রুপালি নুপুরটা দিয়েছিল, ওটা আমি গত বছর কক্সবাজার ট্যুরে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছি। নুপুরের মাঝখানের নীল পাথরটায় আমার নামের প্রথম অক্ষর ‘S’ খোদাই করা ছিল। মা মারা যাওয়ার আগে ওটাই ছিল তার শেষ উপহার। ওটা হারানোর পর থেকে আমার মনটাই ভেঙে গেছে।"কথাটা শামীমের বুকে তীরের মতো বিঁধল। নীল পাথর? ইংরেজি ‘S’ অক্ষর? কক্সবাজারে হারিয়ে যাওয়া নুপুর? শামীমের হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে লাগল। সে তার ল্যাপটপ বন্ধ করে ধীরপায়ে পেছনের টেবিলের দিকে ঘুরল।সে দেখল, হালকা নীল রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা একটি মেয়ে বিষণ্ন মুখে কফির কাপে চামচ নাড়ছে। মেয়েটির চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত মায়া এবং বিষাদ। শামীম নিজেকে সামলে নিয়ে বিনীতভাবে বলল, "ক্ষমা করবেন, আপনাদের ব্যক্তিগত কথায় বাধা দেওয়ার জন্য। আমি অনিচ্ছাকৃতভাবেই আপনার কথাগুলো শুনে ফেলেছি। আপনি কি একটু বলবেন, আপনার নুপুরটি ঠিক কবে এবং কক্সবাজারের কোন পয়েন্টে হারিয়েছিল?"মেয়েটি অবাক হয়ে শামীমের দিকে তাকাল। অচেনা এক যুবকের এমন প্রশ্নে সে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলেও ভদ্রতার খাতিরে বলল, "আজ থেকে ঠিক ছয় মাস আগে, সুগন্ধা বিচে বিকেলে ঢেউয়ের তোড়ে ওটা হারিয়ে যায়। কিন্তু আপনি কেন জিজ্ঞেস করছেন?"শামীমের মুখে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, "আমি শামীম। আপনি যদি একটু কষ্ট করে আগামীকাল এই সময়ে এই কফি শপেই আসেন, তবে আপনার মার শেষ স্মৃতিটা আপনি ফিরে পেতে পারেন।"মেয়েটি, যার নাম ছিল সেঁউতি, সে শামীমের কথা শুনে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার চোখে জল টলমল করে উঠল।পরদিন ঠিক সময়ে শামীম সেই মখমলের বাক্সটি নিয়ে কফি শপে হাজির হলো। সেঁউতিও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। শামীম বাক্সটি টেবিলের ওপর রেখে আলতো করে খুলে ধরল।বাক্সটি খুলতেই কফি শপের মৃদু আলোয় চকচক করে উঠল সেই রুপালি নুপুর, আর মাঝখানের নীল পাথরের ‘S’ অক্ষরটি যেন জীবন্ত হয়ে হাসল। সেঁউতি নুপুরটি দেখামাত্রই কেঁদে ফেলল। সে কাঁপিসা কাঁপিসা হাতে নুপুরটি তুলে বুকে চেপে ধরল।সেঁউতি অশ্রুভেজা চোখে শামীমের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি ভাবতেই পারিনি এই যান্ত্রিক ঢাকা শহরে এসে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিটা এভাবে ফিরে পাব। আপনি শুধু একটা নুপুর ফেরত দেননি শামীম ভাই, আপনি আমার মায়ের স্পর্শ আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। সাগরের ঢেউ যা কেড়ে নিয়েছিল, ঢাকার এই কোলাহল তা ফিরিয়ে দিল।"শামীম তৃপ্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যে নুপুরের মালিককে সে কক্সবাজারের বিশাল সৈকতে খুঁজে পায়নি, নিয়তি তাকে ঢাকার এই ছোট্ট কফি শপে মিলিয়ে দিল। ঢাকা শহরকে আগে শামীমের শুধু ইট-পাথরের জঙ্গল মনে হতো, কিন্তু আজ এই শহরের প্রতি তার ভালোবাসা বহুগুণ বেড়ে গেল। (গল্পটি প্রথম খন্ড এখানে শেষ) যদি দশ দিনে ভিউয়াস বেশি হয়। তাহলে খুব তাড়াতাড়ি বাকি পর্ব লিখব।