ভয়ংকর প্রেম কাহিনী
পর্ব ৩: রক্তাক্ত ছায়া ও নিষিদ্ধ স্পর্শ
আদিত্যর বয়স এখন ষোল। সাভারের উপজেলা হাইস্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। রাহাত আর সুমনের সঙ্গে মিলে সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিন্তু বাড়িতে কোনো উৎসব হয়নি। সৎমা সালমা রান্নাঘরে বাসন ছুড়ে মেরে বলেছিল, “পড়াশোনা করে কী হবে? তোর তো ভূতের সঙ্গে বিয়ে হবে।” বাবা করিম শুধু চুপ করে থেকেছিল। তার চোখে ক্লান্তি আর অসহায়তা।
কিন্তু আদিত্য হাল ছাড়েনি। সে ঢাকার একটা সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগ। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় উঠে বাস ধরে ঢাকা যায়। ফিরতে রাত নয়টা বেজে যায়। নাদিয়াও একই কলেজে ভর্তি হয়েছে। তার বাবা এখন ঢাকায় বদলি হয়ে এসেছেন, কিন্তু নাদিয়া প্রায়ই গ্রামের বাড়িতে আসে আদিত্যর সঙ্গে দেখা করতে।
কলেজের প্রথম বছর
কলেজ ক্যাম্পাসটা আদিত্যর কাছে নতুন দুনিয়া। এখানে কেউ তার অতীত জানে না। কেউ তাকে অভিশপ্ত বলে না। সে চুপচাপ ক্লাস করে, লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে। রাহাত আর সুমন অন্য কলেজে, কিন্তু সপ্তাহান্তে তিনজন মিলে পুরোনো আমগাছের নিচে বসে গল্প করে।
নাদিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হচ্ছিল। কলেজের পিছনের বাগানে তারা লুকিয়ে দেখা করত। নাদিয়া তার হাত ধরে বলত, “আদিত্য, তোমার চোখে কী যেন আছে। কখনো শান্তি, কখনো ঝড়। আমাকে বলো, কী লুকাও তুমি?”
আদিত্য হাসত। কিন্তু বলতে পারত না। কীভাবে বলবে যে তার জীবনে একটা অদৃশ্য মেয়ে আছে, যে তাকে ভালোবাসে মৃত্যুর চেয়েও গভীরভাবে?
এক বিকেলে বৃষ্টি পড়ছিল। কলেজের ছাদে তারা দুজন একা। নাদিয়া তার কাছে সরে এসে আদিত্যর ঠোঁটে প্রথম চুমু খেল। আদিত্যর শরীর কেঁপে উঠল। সেই মুহূর্তে আনন্দ আর ভয় মিশে গিয়েছিল। কিন্তু চুমুর ঠিক মাঝখানে হাওয়া হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। নাদিয়া চমকে সরে গেল। “কে যেন... কে যেন আমার গলা টিপে ধরছিল!”
আদিত্য দেখল, দূরের ছাদের কোণে পরী দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ লাল, চুল হাওয়ায় উড়ছে, হাতের নখ লম্বা হয়ে গেছে।
সেই রাতে বাড়ি ফিরে আদিত্য প্রথমবার পরীর সঙ্গে ঝগড়া করল। “তুমি কেন নাদিয়াকে কষ্ট দাও? সে তো কোনো দোষ করেনি!”
পরী তার সামনে এসে দাঁড়াল। এবার তার শরীর স্পষ্ট, প্রায় মানুষের মতো। “কারণ তুমি আমার। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি দুইশো বছর। ১৮০০ সালে আমি এই নদীর ধারে খুন হয়েছিলাম। আমার প্রেমিক আমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। আমি শপথ করেছিলাম, আমার পরের জন্মের প্রেমিককে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। তুমি সেই প্রেমিক, আদিত্য।”
আদিত্য কেঁপে উঠল। “তাহলে তুমি ভূত? আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু মানুষের মতো বাঁচতে চাই।”
পরী হাসল। তার হাসিতে রক্তের গন্ধ। “মানুষের ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী। আমারটা চিরকালের। যদি নাদিয়াকে না ছাড়ো, তাহলে আমি তাকে শেষ করে দেব।”
বড় বিপদের শুরু
কলেজের দ্বিতীয় বছরে আদিত্যর জীবন আরও জটিল হয়ে উঠল। নাদিয়ার বাবা জানতে পেরেছিলেন তাদের সম্পর্কের কথা। তিনি আদিত্যকে ডেকে বলেছিলেন, “তুমি গরিব ঘরের ছেলে। আমার মেয়ের জন্য তুমি যোগ্য নও। দূরে থাকো।”
একই সময়ে সৎমা সালমা আদিত্যকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। “তোর জন্য আমার মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে না। ভূতের সঙ্গী নিয়ে থাক।” বাবা করিম কিছু বলতে পারেনি। আদিত্য রাহাতের বাড়িতে আশ্রয় নিল।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ঘটল এক রাতে। নাদিয়া তার বাড়িতে একা ছিল। তার বাবা-মা বাইরে গিয়েছিলেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। নাদিয়া চিৎকার করে উঠল। তার গলায় অদৃশ্য হাত চেপে ধরেছিল। ঘরের আয়নায় পরীর প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছিল। “তুমি আদিত্যকে ছোঁবে না!”
আদিত্য সেই সময় রাহাতের বাড়িতে ছিল। হঠাৎ তার মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা। পরী তার সামনে এসে বলল, “দেখো, তোমার নাদিয়া কেমন কষ্ট পাচ্ছে।”
আদিত্য ছুটে নাদিয়ার বাড়িতে গেল। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখল নাদিয়া মেঝেতে পড়ে আছে, গলায় নীল দাগ। আদিত্য তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল। “আমি তোমাকে ছাড়ব না। কখনো না।”
সেই রাত থেকে নাদিয়া বদলে গেল। সে ভয় পেত। কিন্তু আদিত্যকে আরও বেশি ভালোবাসতে শুরু করল। “আমি জানি তোমার সঙ্গে কিছু আছে। কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে লড়ব।”
অন্ধকারের গভীরে
একদিন কলেজের ছুটিতে আদিত্য, নাদিয়া, রাহাত আর সুমন মিলে নদীর ধারে পিকনিক করতে গেল। পুরোনো আমগাছের নিচে। হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে গেল। ঝড় উঠল। গাছের পাতা ঝরতে লাগল। পরী স্পষ্ট হয়ে সবার সামনে এসে দাঁড়াল।
রাহাত চিৎকার করে উঠল, “এটা কী?!”
সুমন পিছিয়ে গেল।
নাদিয়া আদিত্যকে জড়িয়ে ধরল।
পরী শান্ত গলায় বলল, “আদিত্য আমার। তোমরা কেউ তাকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। যদি চেষ্টা করো, তাহলে তোমাদের প্রত্যেককে আমি একে একে শেষ করব।”
সেই মুহূর্তে আমগাছের ডাল ভেঙে পড়ল। একটা ডাল নাদিয়ার কাঁধে লাগল। রক্ত বেরোতে লাগল। আদিত্য চিৎকার করে পরীকে বলল, “থামো! আমি তোমার কথা শুনব। কিন্তু ওদের ক্ষতি করো না।”
পরী হাসল। “তাহলে প্রমাণ দাও। নাদিয়াকে ছেড়ে দাও। নয়তো পরেরবার সে বেঁচে ফিরবে না।”
ঝড় থেমে গেল। কিন্তু আদিত্যর ভিতরে ঝড় চলতে লাগল। সে নাদিয়ার ক্ষতস্থানে হাত দিয়ে কাঁদছিল। রাহাত আর সুমন তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। তিন বন্ধু মিলে প্রতিজ্ঞা করল, তারা এই অভিশাপের বিরুদ্ধে লড়বে।
সেই রাতে আদিত্য একা নদীর ধারে বসেছিল। পরী তার পাশে এসে বসল। তার হাত আদিত্যর হাতে। ঠান্ডা, কিন্তু অদ্ভুত আরামদায়ক। “আমাকে ভালোবাসো, আদিত্য। আমি তোমাকে সব দিতে পারব। টাকা, ক্ষমতা, দীর্ঘ জীবন। শুধু নাদিয়াকে ভুলে যাও।”
আদিত্য চুপ করে রইল। তার চোখে জল। মানুষের ভালোবাসা আর অতিপ্রাকৃত ভালোবাসার মাঝে সে আটকে পড়েছিল।
দূরে কোথাও একটা পেঁচা ডেকে উঠল। আদিত্য বুঝতে পারছিল, তার জীবন এখন আর সাধারণ নেই। এটা একটা ভয়ংকর খেলা। যেখানে জয় মানে মৃত্যু, আর পরাজয় মানে চিরকালের অন্ধকার।
(পর্ব ৩ সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্বে: বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, আদিত্যর প্রথম বড় সাফল্য ও বিপর্যয়, পরীর আরও ভয়ংকর রূপান্তর, নাদিয়ার সঙ্গে গোপন বিয়ের চেষ্টা, বন্ধুদের উপর আক্রমণ এবং আদিত্যর ভিতরের যুদ্ধের চরম পর্যায়।
এই পর্বটি আগের দুটির চেয়ে বড় করা হয়েছে — পড়তে প্রায় ১৫-১৭ মিনিট লাগবে। গল্প এখন পুরোদমে অন্ধকার ও রোমাঞ্চের দিকে এগোচ্ছে। পড়া শেষ হলে বলো, চতুর্থ পর্ব লিখব।
9
View