Posts

গল্প

টাকার চক্র

June 5, 2026

Md Josam

7
View

গল্পের নাম: টাকার চক্র
পৃথিবী ঘুরছে। প্রতি সেকেন্ডে লক্ষ লক্ষ ডলারের লেনদেন হচ্ছে। নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটে সকালের বেলায় ট্রেডাররা চিৎকার করে অর্ডার দিচ্ছে। একই সময়ে লন্ডনের সিটিতে ব্যাংকাররা কফির কাপ হাতে নিয়ে বিলিয়ন ডলারের ডিল ফাইনাল করছে। টোকিওর স্টক এক্সচেঞ্জে লাল-সবুজ স্ক্রিন জ্বলছে। আর ঢাকা, লাগোস, রিও ডি জেনেইরোর বস্তিতে মানুষ ভাবছে— আজ রুটি জুটবে তো?
টাকা। শুধু টাকা। এই একটি জিনিস পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনকে, প্রতিটি দেশের ভাগ্যকে, এমনকি গ্রহের ভবিষ্যতকেও নিয়ন্ত্রণ করছে।
২০২৫ সালের শেষের দিকে। বিশ্ব অর্থনীতি এক অদ্ভুত সংকটের মধ্যে। আমেরিকায় ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়িয়েছে। চীনের রিয়েল এস্টেট মার্কেট ধসে পড়েছে। ইউরোপে জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের রাজনীতি নতুন করে জট পাকাচ্ছে। আর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে খাদ্য সংকট তীব্র হয়েছে। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে একটাই শক্তি— টাকা।
নিউইয়র্কের একটি বড় হেজ ফান্ডের অফিসে সকাল সাড়ে ছয়টা। সিইও মাইকেল ব্রুকস তার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার ফান্ডের অধীনে দুই ট্রিলিয়ন ডলার। একটা সিদ্ধান্তে তিনি যদি ভুল করেন, তাহলে হাজার হাজার মানুষের পেনশন ফান্ড ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি ভুল করেন না। কারণ তাঁর কাছে তথ্য আছে, অ্যালগরিদম আছে, আর সবচেয়ে বড় কথা— টাকা আছে। তিনি একটা বড় কোম্পানির শেয়ার কিনে নিলেন। পরের দিন সেই খবর বের হলো— কোম্পানিটি নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে। শেয়ারের দাম উড়ে গেল। মাইকেলের ফান্ড আরও সমৃদ্ধ হলো।
একই দিনে, কঙ্গোর একটি ছোট গ্রামে আইশা তার তিন সন্তান নিয়ে বসে আছে। তার স্বামী কয়েক বছর আগে খনিতে কাজ করতে গিয়ে মারা গেছে। খনিটা চীনা কোম্পানির। তারা কোবাল্ট তোলে। সেই কোবাল্ট দিয়ে তৈরি হয় বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি। যে গাড়ি নিউইয়র্ক আর লন্ডনের ধনীরা চড়ে। আইশার হাতে কোনো টাকা নেই। খাবার নেই। সে তার শেষ কয়েকটা কলা বিক্রি করে যা পেয়েছে, তা দিয়ে সন্তানদের খাইয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প এসেছিল গ্রামে, কিন্তু টাকা নেতাদের পকেটে চলে গেছে। আইশা জানে না, তার গ্রামের মাটির নিচের সম্পদ কত ট্রিলিয়ন ডলারের। সে শুধু জানে— তার কাছে কিছুই নেই।
টাকার খেলা এভাবেই চলে।
ইউক্রেনের সীমান্তে যুদ্ধ এখনো চলছে। ট্যাঙ্ক চলছে, ক্ষেপণাস্ত্র পড়ছে। কিন্তু যুদ্ধের পেছনে যে অর্থনীতি, তা আরও ভয়ঙ্কর। আমেরিকা অস্ত্র বিক্রি করছে, রাশিয়া তেল বিক্রি করে টাকা আনছে, ইউরোপ গ্যাসের জন্য ছটফট করছে। একটা দেশের অস্তিত্বের লড়াই, কিন্তু টাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধ হলে কোটি কোটি ডলারের অস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। শেয়ারের দাম পড়বে। তাই যুদ্ধ চলতেই থাকে।
ব্রাজিলের অ্যামাজন জঙ্গলে গাছ কাটা চলছে। কৃষকরা জমি চায়। কোম্পানিগুলো সয়াবিন আর গরুর খামার বানাতে চায়। চীন ও ইউরোপের বাজারে মাংস আর তেলের চাহিদা অসীম। ফলে প্রতি মিনিটে ফুটবল মাঠের সমান জায়গা জঙ্গল উধাও হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবিদরা চিৎকার করছে, কিন্তু টাকার শব্দ আরও জোরে।
দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার উপরের তলায় এক আরব শেখ তার প্রাইভেট জেটের জন্য নতুন ডিল করছেন। তার পাশে এক ভারতীয় বিলিয়নিয়ার। তারা দুজন মিলে একটা নতুন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রজেক্টে বিনিয়োগ করবেন। কথায় কথায় শেখ বললেন, “টাকা না থাকলে কিছুই নেই। এমনকি ঈশ্বরেরও না।” দুজন হাসলেন।
একই সময়ে ভারতের উত্তরপ্রদেশের এক গ্রামে রামলাল তার জমিতে দাঁড়িয়ে আছেন। ব্যাংকের লোন শোধ করতে না পেরে জমি নিলামে উঠেছে। তার ছেলে শহরে গিয়ে রিকশা চালায়। মেয়ের বিয়ে দিতে পারেননি। ঋণের সুদ বেড়েই চলেছে। তিনি জানেন, এই জমি তার বাপ-দাদার। কিন্তু টাকা তার চেয়ে শক্তিশালী।
টাকা সমাজকে কীভাবে ভাগ করে, তা দেখা যায় প্রতিদিন। সিলিকন ভ্যালিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোম্পানিগুলো লক্ষ লক্ষ ডলার বিনিয়োগ নিয়ে প্রতিযোগিতা করছে। তাদের তৈরি অ্যালগরিদম ঠিক করে দিচ্ছে কোন খবর মানুষ দেখবে, কোন গান শুনবে। ফলে রাজনীতি বদলে যাচ্ছে। নির্বাচনে যে প্রার্থী বেশি টাকা খরচ করতে পারে, সে-ই জিতে যায়। সত্য-মিথ্যার সীমানা ঝাপসা হয়ে যায়।
আফ্রিকার অনেক দেশে চীন রাস্তা, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে দিচ্ছে। বিনিময়ে খনিজ সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে। দেশগুলোর ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। একদিন হয়তো বন্দরগুলো চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। টাকার ফাঁদ।
ইউরোপে অভিবাসী সংকট। সিরিয়া, আফগানিস্তান, আফ্রিকা থেকে মানুষ আসছে। কারণ তাদের দেশে টাকা নেই, সুযোগ নেই, নিরাপত্তা নেই। ধনী দেশগুলো তাদের আটকাতে চায়, কিন্তু তাদের নিজেদের কারখানায় সস্তা শ্রমিক দরকার। টাকার দ্বন্দ্ব।
হলিউডে এক সুপারস্টার নতুন সিনেমার চুক্তি সই করলেন। একশো মিলিয়ন ডলার। তার ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্ট হলো। বিশ্বের লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী দেখল। তারা ভাবল— এভাবে বাঁচতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তাদের বেশিরভাগের কাছে সেই স্বপ্নের দাম অসীম।
চীনের শেনজেন শহরে ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকরা ১২ ঘণ্টা কাজ করে মোবাইল ফোন বানাচ্ছে। সেই ফোন ধনী দেশের মানুষ হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেয়— “লাইফ ইজ গুড”। ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা জানেও না সেই পোস্ট।
টাকা শুধু অর্থ নয়, ক্ষমতা। যার টাকা আছে, সে আইন বানায়, যুদ্ধ বানায়, শান্তি কেনে, খ্যাতি কেনে, এমনকি স্বাস্থ্যও কেনে। ধনী দেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা হয়, গরিব দেশে মানুষ মরে।
কোভিডের সময় দেখা গিয়েছিল। ধনী দেশগুলো ভ্যাকসিন আগে পেয়েছে। গরিব দেশগুলো অপেক্ষা করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। টাকার হিসাব।
কিন্তু টাকা কি সবসময় জয়ী হয়?
কখনো কখনো মানুষ প্রতিরোধ করে। ফ্রান্সে কৃষকরা রাস্তা অবরোধ করে দাম বাড়ানোর দাবি তোলে। বাংলাদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকরা ধর্মঘট করে মজুরি বাড়ায়। লাতিন আমেরিকায় ছাত্ররা রাস্তায় নেমে শিক্ষার খরচ কমানোর দাবি করে। কিন্তু এসব প্রতিরোধও শেষ পর্যন্ত টাকার স্রোতের সামনে কতদূর টেকে?
পৃথিবী জুড়ে অসমতা বাড়ছে। অক্সফামের রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী কয়েকজনের সম্পদ গরিব অর্ধেক মানুষের সম্পদের চেয়ে বেশি। এই অসমতা ঘৃণা জন্মায়, অস্থিরতা জন্মায়, বিপ্লবের বীজ বপন করে।
একদিন হয়তো সেই বিপ্লব আসবে। কিন্তু টাকা আবার নতুন রূপে ফিরে আসবে। ক্রিপ্টোকারেন্সি, মেটাভার্স, এআই— নতুন নতুন মাধ্যমে।
সূর্য উঠছে আর ডুবছে। প্রতিদিন বিলিয়ন ডলারের লেনদেন হচ্ছে। কেউ ধনী হচ্ছে, কেউ গরিব হচ্ছে। কেউ যুদ্ধ করছে, কেউ শান্তি কিনছে। কেউ খাবার পাচ্ছে, কেউ না।
টাকার চক্র।
এই সত্যটা পৃথিবীর প্রতিটি কোণে, প্রতিটি মানুষের জীবনে, প্রতিটি দেশের ইতিহাসে লেখা আছে। কেউ মেনে নিয়ে ধনী হয়, কেউ না মেনে লড়াই করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টাকার খেলায় সবাই অংশ নেয়— ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক।
পৃথিবী ঘুরছে। আর টাকার চাকা তার সাথে ঘুরছে। অনন্তকাল।
গল্প শেষ।
(এই গল্পটি পড়তে আনুমানিক ১৮-২২ মিনিট সময় লাগবে। এটি একক কোনো চরিত্রের গল্প নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে লেখা। বাস্তব তথ্য ও পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে রচিত।)

Comments

    Please login to post comment. Login