Posts

গল্প

রিমোটের ব্যাটারি

June 6, 2026

আখতারুজ্জামান নিশান

20
View


 

বাসায় টিভির রিমোট ঠিকঠাক কাজ করছে না।বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও টিভি চালু করতে পারছিনা।রিমোট কাজ না করলে এটাকে আবারও ঠিকঠাক কাজে ফিরিয়ে আনার বেশ কয়েকটা প্রচলিত পদ্ধতি আছে।

এর প্রথম পদ্ধতি হলো ব্যাটারি খুলে আবার লাগানো।এতে ৯০% ক্ষেত্রেই রিমোট সচল হয়ে যায়। তাই করলাম।সচল হলো না। সমস্যা নাই। আমি দ্বিতীয় পদ্ধতিতে গেলাম।

দ্বিতীয় পদ্ধতি প্রায় প্রথম পদ্ধতির মতোই। এখানে সামান্য একটু বাড়তি কাজ আছে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে রিমোট থেকে ব্যাটারি খুলে ফ্লোরে খাড়া করে রাখতে হবে কিছুক্ষণ।  
আর একটা কাপড় দিয়ে রিমোটের সারা শরীর মুছে দিতে হবে। স্প্রিং যেখানে আছে সেখানে মুখ থেকে গরম হাওয়া দিয়ে আবার কাপড়ের সাহায্যে মুছে নিতে হবে। এরপর ফ্লোর থেকে ব্যাটারিদ্বয় তুলে সুন্দর ভাবে বন্দুকে বুলেট ইন্সটলের মত ব্যাটারি ইনস্টল করতে হয়। এই ক্ষেত্রে ৯৫% সম্ভাবনা থাকে রিমোট সচল হয়ে যাওয়ার।  

আজকে এতেও কাজ হলোনা।

অগত্যা আমাকে সর্বশেষ ঘরোয়া প্রচেষ্টা অর্থাৎ তৃতীয় ধাপে যেতে হলো। তৃতীয় ধাপ হলো রিমোটের সিপিআর! 
মানুষের হার্টকে সচল করার জন্য যেমন বুকে চাপ দিতে হয় জোরে জোরে তেমনি উপর্যুক্ত দুটি প্রচেষ্টা ফেল করলে রিমোটকে সিপিআর দিতে হয়। এই পদ্ধতিতে রিমোটকে উলটো করে তার পিছনে সজোরে থাপ্পড় দিতে হয় দুটো। অনেক সময় এর সাথে গালি দিতে হতে পারে কিংবা ছুড়ে ফেলতে হতে হবে। এতে ৯৯% সম্ভাবনা থাকে রিমোট ফিরে আসার।

এটাতেও ব্যর্থ হলাম। শেষে বের হলাম ব্যাটারি দোকান থেকে দুটো ব্যাটারি কিনতে। ব্যাটারি কিনতে গিয়েই বিপত্তির শুরু। একটা টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক সেই দোকানে হতাশ বদনে সিগারেট কিনছেন। ব্যাটারি কিনছি শুনেই তিনি আমার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠলেন।

আমার কাছে এসে বেশ গদগদ হয়ে জানতে চাইলেন,ব্যাটারি দিয়ে কি করব?

আমি অবাক হলেও সেটা ছাপিয়ে বললাম, রিমোটের জন্য!

সাংবাদিক আরও খুশি হয়ে গেল। সে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, রিমোট আবিষ্কার করছেন?

বললাম,না।  রিমোট আবিষ্কার করব কেন? রিমোটের জন্য ব্যাটারি.....

আমাকে বলতে দিল না। সাথে সাথেই বলে উঠলো, ভাই,সবই বুঝি। রিমোট আবিষ্কার না করলে রিমোটের জন্য ব্যাটারি কেন?

আমি বললাম,আশ্চর্য। বাজারে টিভির এত রিমোট আছে। এছাড়া টিভি কিনলেও একটা রিমোট তো ফ্রি দেয়। আমার আবিষ্কার করা লাগবে কেন?

সাংবাদিক তখন তার আপশে দাঁড়ানো ক্যামেরাম্যানকে বলল, দেখলা? কি প্রচার বিমুখ মানুষ? তুমি দাঁড়াইয়া আছো ক্যান? ক্যামেরা চালু করো।

সাংবাদিক ক্যামেরা চালু হতেই আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলা শুরু করলো-

বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগে পিছিয়ে নেই আমাদের তরুণেরা। তারাও নিজের সাধ্যমতো কিছু না কিছু আবিষ্কার করেই চলছে। আমার পাশে দাঁড়ানো এই প্রচার বিমুখ তরুণটাও আবিষ্কার করেছে একটা রিমোট।  যে রিমোট দিয়ে একই সাথে টিভি,এসি,ফ্রিজ এমনকি মানুষের মুখ বন্ধ ও চালু করে ফেলা সম্ভব নিমিষেই।এটা এক বিরাট প্রতিভা।

আমরা কথা বলব সেই সেই তরুণের সাথে।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ভাই,কিছু বলেন।

আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছি। কি বলব?

ইতিমধ্যে বেশ মানুষ জড়ো হয়ে গেছে আশেপাশে।  তারা পুরোপুরি জানেনা কি হচ্ছে। তবে ক্যামেরা দেখে বুঝে গেছে এখানে শুটিং হচ্ছে৷ পাশের ভীড়ে মৃদুস্বরে অনেক কথা হচ্ছে। কেউ কেউ আমাকে দেখিয়ে বলছে, আপকামিং হিরো। আমার ব্যাপারে সে নাকি অল্পবিস্তর জানে।

কেউ বলছে, দেখছস, হিরো কথা বলতে পারতেছেনা। নিশ্চিত মদ খাইছে। এরা তো সারাক্ষণ মদের উপ্রেই থাকে।

তাকে সমর্থন জানালো একজন। সে বলল,তার এক ভাই ঢাকায় কারওয়ান বাজারে সবজি বেছে। সে নাকি দেখছে,নায়কেরা সারাক্ষণ নিশা করে।

ইতিমধ্যে কয়েকজন মদের গন্ধ পেয়ে গেছে বলে শুনতে পেলাম। একজন নাকি দেখেছে আমি প্যান্টের পকেট থেকে ছোট এক বোতল বের করে কিছু একটা খেয়েছি।

সাংবাদিক আমার দিকে তাকিয়ে বলল,ভাই কিছু বলেন।

আমি বললাম,  দেখেন,রিমোটে লাগানোর জন্য ব্যাটারি কিনেছি।

সাংবাদিক সাথে সাথেই বুম তার কাছে নিয়ে গেল,
দর্শক তাহলে চলুন,এই তরুণের রিমোট দেখে আসি।

ক্যামেরা বন্ধ হলোনা। সাংবাদিক বলল, চলুন।

বললাম,কোথায়?

আপনার বাসায়।রিমোট দেখব। ভিডিও করব।

রিমোট ভিডিও করার কি আছে?

আরে ভাই, চলেন তো। একটা নিউজ পাইছি। এইটা করবই।

অগত্যা, সাংবাদিক নিয়ে বাসায়। ক্যামেরা দেখে আশেপাশের আরও কয়েকজন হাজির। চাচা সম্পর্কের একজনও এলেন।

বাসায় এসে ক্যামেরা ধরলো।  রিমোটে ব্যাটারি লাগানোর দৃশ্য শুট করা হলো। টিভিতে তাক করে বাটন প্রেস করতেই টিভি চালু হলো। আশেপাশের সবাই বুঝে গেছে আমি কিছু একটা আবিষ্কার করেছি।কি আবিষ্কার করেছি তা জানেনা।তবে টিভি চালু হতেই তারা হাত তালি দিয়ে উঠলো। সেই দৃশ্যও রেকর্ড করা হলো।

হঠাৎ কে যেন বাসার ফ্যানটা চালু করলো। সাথেসাথেই আবারও হাততালি। কে একজন বলে উঠলো,'এইটা সব ফ্যানেই কাজ করে। আমি  দেখছি।'

সাংবাদিক বেশ কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিলো। বক্তব্য আরকি।

এক ছোট ভাই বলল, আমি সারাক্ষণই কিছুনা কিছু আবিষ্কার করি। সে গর্বিত।  

আমার চাচা সম্পর্কে একজন বলল, ' বিসমিল্লাহ। আমার ভাতিজা ছোট বেলা থেকেই মেধাবী।  তারে দেখতেছি, সে সব তৈয়ার করে একা একা। এ এক বিরাট প্রতভা।আমি সরকারের কাছে তার পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানাই।'

সাংবাদিক আমার সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য নিয়ে চলে গেলেন। বললেন,আজ রাত ৯ টায় দেখবেন। নিউজটা যাবে।

রাতে টিভিতে নিউজ হলো। রিপোর্ট ততক্ষণে প্রায় শেষ। দেখলাম সেখানে সাংবাদিক বলছে, 'এই তরুণ অর্থাভাবে  বহু প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারছেনা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছে সে আর্থিক সাহায্য চেয়েছে। '

Comments

    Please login to post comment. Login