ভয়ংকর প্রেম কাহিনী
পর্ব ৪: বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্ধকার দরজা ও রক্তের শপথ
আদিত্যর বয়স এখন উনিশ। সাভারের ছোট্ট গ্রাম, নদীর পাড়ের আমগাছ, সৎমার অত্যাচার, সবকিছু পিছনে ফেলে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। বিভাগ: ইংরেজি সাহিত্য। ভর্তি পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল করার পরও তার মনে কোনো আনন্দ ছিল না। কারণ সে জানতো, যে ছায়া তার পিছু নিয়েছে, সে কখনো ছাড়বে না।
ঢাকার টিকাটুলিতে একটা ছোট্ট মেসবাড়িতে রাহাতের সঙ্গে থাকা শুরু করল আদিত্য। সুমন মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে, তাই তিনজনের দেখা কম হয়, কিন্তু প্রতি শুক্রবার তারা পুরোনো প্রতিজ্ঞা মেনে একসঙ্গে বসে। নাদিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অর্থনীতি বিভাগে। তার বাবা এখনও সম্পর্ক মেনে নেননি, কিন্তু নাদিয়া লুকিয়ে লুকিয়ে আদিত্যর মেসে আসে।
নতুন জীবনের সকাল
সকাল ছয়টায় উঠে আদিত্য চা বানায়। জানালা দিয়ে দেখা যায় ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা। হর্নের শব্দ, ধুলো, মানুষের ভিড়। এখানে কেউ তাকে “ভূতের ছেলে” বলে না। কিন্তু রাত হলেই পরী আসে। কখনো বিছানার পাশে বসে তার চুলে হাত বুলায়, কখনো দেয়ালের সঙ্গে মিশে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
ক্লাসে আদিত্য দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। তার লেখা কবিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাগাজিনে ছাপা হল। “ছায়ার প্রেমিক” নামে একটা কবিতা লিখেছিল সে। সবাই প্রশংসা করল, কিন্তু শুধু নাদিয়া বুঝেছিল এটা পরীর জন্য লেখা।
একদিন সন্ধ্যায় আর্টস ফ্যাকাল্টির পিছনের বাগানে নাদিয়া আদিত্যর হাত ধরে বলল, “আমরা বিয়ে করি। গোপনে। আমার বাবা কখনো মেনে নেবে না, কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।”
আদিত্যর চোখে জল এসে গেল। “নাদিয়া, আমার জীবন অভিশপ্ত। তুমি যদি আমার সঙ্গে থাকো, তাহলে তোমারও ক্ষতি হবে।”
নাদিয়া তার গালে হাত রেখে বলল, “আমি ভয় পাই না। তোমার সেই ‘পরী’ যদি আসে, আমি তার সঙ্গেও লড়ব।”
তারা দুজন ঠিক করল, আগামী মাসে গোপনে কাজি অফিসে বিয়ে করবে। রাহাত আর সুমন হবে সাক্ষী।
পরীর ক্রমবর্ধমান রাগ
কিন্তু পরী সব জানত। সেই রাতে আদিত্য ঘুমাতে গেলে সে তার স্বপ্নে ঢুকে পড়ল। স্বপ্নে তারা দুজন একটা পুরোনো প্রাসাদে। পরী সাদা শাড়ি পরে, কিন্তু তার শরীর থেকে রক্ত ঝরছে।
“তুমি আমাকে ছেড়ে মানুষের মেয়েকে বিয়ে করবে? আমি যে তোমার জন্য দুইশো বছর অপেক্ষা করেছি!” পরীর গলা কাঁপছিল।
আদিত্য স্বপ্নের ভিতরেও কাঁপছিল। “তুমি আমাকে ভালোবাসো, কিন্তু তোমার ভালোবাসা আমাকে মেরে ফেলছে। আমি সাধারণ জীবন চাই।”
পরী হাসল। তার দাঁতগুলো ধারালো হয়ে গেল। “সাধারণ জীবন? ঠিক আছে। দেখি কতদূর যাও।”
পরের দিন সকালে আদিত্য ঘুম থেকে উঠে দেখল তার বুকে লম্বা নখের দাগ। রক্ত জমাট বেঁধে আছে। রাহাত ভয় পেয়ে বলল, “ভাই, এটা আর সাধারণ ভূত নয়। এটা কিছু অন্য জিনিস। আমরা কোনো পীর-ফকিরের কাছে যাই।”
কিন্তু আদিত্য রাজি হল না। সে পরীকে ভালোবাসতেও শুরু করেছিল। তার নির্জনতা, তার অন্ধ ভালোবাসা, তার অতিপ্রাকৃত ছোঁয়া—সবকিছু তাকে টানছিল।
বিপদের ঘনঘটা
বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সেমিস্টারে আদিত্য প্রথমবারের মতো একটা বড় সুযোগ পেল। একটা আন্তর্জাতিক সাহিত্য প্রতিযোগিতায় তার গল্প “অদৃশ্য প্রেমিকা” প্রথম হল। পুরস্কার হিসেবে পেল পাঁচ লাখ টাকা আর একটা স্কলারশিপ। গ্রামের বাড়িতে খবর পৌঁছাল। সৎমা সালমা এবার প্রথমবার তার সঙ্গে ভালো করে কথা বলল। বাবা করিম কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তোর মা দেখলে খুব খুশি হতো।”
কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে বিপদও এল। নাদিয়ার বাবা খবর পেয়ে মেয়েকে জোর করে বাড়িতে আটকে রাখলেন। “ওই ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে তোকে আমি মেরে ফেলব।” নাদিয়া জানালায় দাঁড়িয়ে কাঁদত।
এক রাতে আদিত্য নাদিয়ার বাসার সামনে গেল। হঠাৎ রাস্তার বাতি নিভে গেল। একটা কালো ছায়া তার চারপাশে ঘুরতে লাগল। পরী এবার আর সুন্দরী মেয়ে নয়। তার মুখ বিকৃত, চোখ গর্তে ঢোকা, হাত লম্বা হয়ে গেছে। সে আদিত্যকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরল।
“তুমি যদি নাদিয়াকে বিয়ে করো, তাহলে প্রথমে তোমার বন্ধুদের মারব। তারপর তোমার বাবাকে। শেষে নাদিয়াকে তোমার সামনে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারব।”
আদিত্য চিৎকার করে বলল, “তুমি আমাকে ছেড়ে দাও! আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু এভাবে নয়!”
পরী তার ঠোঁটে একটা রক্তাক্ত চুমু খেল। “তাহলে প্রমাণ দাও। আজ রাতেই নাদিয়াকে বলো যে তুমি তাকে ছেড়ে দিচ্ছ।”
বন্ধুদের উপর আক্রমণ
পরের সপ্তাহে সুমনের উপর প্রথম আক্রমণ হল। মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে সুমন রাতে পড়ছিল। হঠাৎ তার বইয়ের পাতাগুলো রক্তে ভিজে গেল। দেয়ালে লেখা হল: “আদিত্যকে ছেড়ে দাও।” সুমন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তার বলল, “অদ্ভুত। তার শরীরে কোনো আঘাত নেই, কিন্তু রক্তশূন্যতা।”
রাহাত ভয় পেয়ে বলল, “ভাই, আমরা এই যুদ্ধে হেরে যাব। পরী আরও শক্তিশালী হচ্ছে।”
আদিত্য একা নদীর ধারে (যেখানে তার জন্ম হয়েছিল) গিয়ে বসল। সে চিৎকার করে কাঁদল। “আমি কী করব? দুজনকেই তো ভালোবাসি। একজন মৃত, আরেকজন জ্যান্ত।”
পরী এসে তার পাশে বসল। এবার তার রূপ আবার সুন্দর। সে আদিত্যর কাঁধে মাথা রেখে বলল, “আমাকে পুরোপুরি গ্রহণ করো। আমি তোমার শরীরে ঢুকে যাব। আমরা এক হয়ে যাব। তাহলে কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
আদিত্য কেঁপে উঠল। কিন্তু একটা অংশ তার ভিতরে চাইছিল এই প্রস্তাব।
গোপন বিয়ের রাত
অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত নিল। এক বৃষ্টির রাতে নাদিয়া বাড়ি থেকে পালিয়ে এল। রাহাত আর সুমনকে নিয়ে তারা চারজন কাজি অফিসে গেল। গোপন বিয়ে সম্পন্ন হল। নাদিয়া আদিত্যর কপালে চুমু খেয়ে বলল, “এখন আমরা এক। কোনো ভূত আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
কিন্তু বিয়ের কাগজে সই করার ঠিক পর মুহূর্তে বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘর অন্ধকার। কাজি সাহেব চিৎকার করে উঠলেন। যখন আলো জ্বলল, দেখা গেল কাগজের উপর রক্ত দিয়ে লেখা: “এই বিয়ে অসম্পূর্ণ। আদিত্য আমার।”
নাদিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তার গলায় আবার নীল দাগ।
আদিত্য বুঝতে পারল, এই যুদ্ধ এখন আর শুধু তার একার নয়। এটা তার, নাদিয়ার, তার বন্ধুদের এবং তার পুরো ভবিষ্যতের যুদ্ধ।
সেই রাতে মেসের ছাদে দাঁড়িয়ে আদিত্য আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “পরী... তুমি জিততে পারো। কিন্তু আমি লড়ব। মানুষ হিসেবে, প্রেমিক হিসেবে, স্বামী হিসেবে।”
দূরের আকাশে বজ্রপাত হল। আর অন্ধকার থেকে পরীর হাসি ভেসে এল—যেন সে বলছে, “লড়ো। দেখি কতদূর যাও। শেষ পর্যন্ত আমিই জিতব।”
(পর্ব ৪ সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্বে: বিয়ের পরের জীবন, পরীর শারীরিক আক্রমণ, আদিত্যর অন্ধকার দিকের উন্মোচন, বন্ধুদের জীবন সংশয়, নাদিয়ার গর্ভধারণ এবং আরও ভয়ংকর টুইস্ট।
5
View