Posts

পোস্ট

"যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম যদিদং হৃদয়ং মম তদস্তু হৃদয়ং তব"

June 7, 2026

তাসলিহা মওলা

48
View

"যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম

যদিদং হৃদয়ং মম তদস্তু হৃদয়ং তব"।

এটা হিন্দু বৈদিক বিয়ের একটা মন্ত্র। বিভিন্ন সময় ভারতীয় সিনেমা বা সিরিয়ালে আমরা এই মন্ত্রটা শুনে থাকি। আজ সকাল থেকে আমার মাথায় ঘুরছিল লাইন কয়টা কারণ একটা লেখা তৈরী করছিলাম মনে মনে। কেন যেন এই লাইন দুইটা আমার খুব ভাললাগে। খুব অবাক কান্ড হল এই পোস্টে ৮টা রিয়েকশনের মধ্যে ৬টাই হা হা। কেন বুঝলামনা।

যাই হোক, এ মন্ত্রের সহজ বাংলা অর্থ হল, "আমার এই হৃদয় তোমার হোক, আর তোমার ওই হৃদয় আমার হোক।" কি সুন্দর একটা কথা তাইনা? বিয়ে - যাকে ইংরেজি কেতাবী ভাষায় বলা হয়, "The holy wed-lock" তার মূল বিষয়বস্ত আসলে কী? দুটি মনের মিলন - তাই তো? সমাজ সংসার যাই বলুক, দুইটা হৃদয় কাছাকাছি হলেই না জন্ম হয় ভালবাসার। মন কাছে আসে, দেহের টানে দেহও কাছে আসে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে। সেই কাছে আসাটাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেবার জন্যই বিবাহ নামক বস্তুটির দ্বারস্থ হতে হয়। এর সাথে বংশরক্ষা, সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারার মত বহু বিষয় জড়ীয়ে থাকলেও আপাতঃ দৃষ্টিতে বিয়ে মানে ধর্ম, বর্ণ, সমাজ, জাতি নির্বিশেষে একজন নারী আর একজন পুরুষের একসাথে থাকার স্বীকৃতি। মুসলমান বিয়েতে ভরণপোষণ, দেন মোহরানা, কাবিননামা অনেক ফর্মালিটি থাকে যার সবই কাগুজে। বলছিনা সেখানে হৃদয়ের যোগ নেই। একেক ধর্মের একেক আচার। তা মেনে চলাই বিধান।

কিন্তু সেই যে তিথিডোর উপন্যাসে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন "সব মন্ত্রই বিফল যদি হৃদয়ে সত্য না থাকে"। যেকোনো সম্পর্কের মূল বিষয় হল কেমিস্ট্রি। আর বৈবাহিক সম্পর্কে সেটা হল তরকারীতে লবনের মত। এই একটা জিনিস মেলেনা দেখেই ঘরে ঘরে, সংসারে সংসারে অশান্তি লেগেই থাকে। যে আপনাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসল, আপনার সুখে সুখী হল, আপনার কঠিন সময়ে পাশে থাকল, আপনার প্রতিষ্ঠায় নিজেকে উজাড় করে দিল, তাকে আপনি যেভাবে প্রতিদান দিলেনতো? নাকি নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকলেন, নিজের জগতে মত্ত থাকলেন?

সংসারে বেশীরভাগ মানুষই অবহেলা করে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে আর অপরপক্ষও অবহেলিত হওয়াটাকে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলে। এসব ক্ষেত্রে সমস্যা তেমন হয়না। সমস্যা হয় যখন অবহেলিত মানুষটা আর সেটা মানেনা। যখন নিজের ভালবাসার অপচয়টা মেনে নিতে না পেরে নিজের অধিকার চেয়ে বসে। যখন সে বাঁচতে শিখে যায়, যখন সে বুঝতে শিখে যায় যে যাকে সে ভালবাসা ভাবত তা ভুল।

"সন্তানের জন্মের পর ভালবাসা কমে যায়" - এমন একটা কথা চালু আছে আমাদের সমাজে। অত্যন্ত বাজে একটা কথা এটা। পশ্চিমা সমাজের দিকে তাকান, কীভাবে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের কোয়ালিটি টাইম কাটাচ্ছে। সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের ভালবাসা প্রকাশ এদেশে লজ্জার বিষয়। গর্বের বিষয় হল সন্তানের সামনে কুৎসিত ঝগড়া, গালাগালি, মারামারি। কখনো শুনেছেন বাবা-মায়ের ঝগড়া হচ্ছে আর ছোট্ট শিশু ভয়ার্ত গলায় কাঁদছে? কেমন লাগে সেই কচিকন্ঠের কান্না?

পরিশেষে একটা কথা বলব। এটা আমার ব্যাক্তিগত মতধারা, কাউকে মেনে নিতেই হবে কথা নাই। আমি বহু আগে থেকেই নীল রঙের কাগজে সই করার চাইতে দুইজন মানুষের বোঝাপড়াকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছি। যাকে বিয়ে করেছি, বিয়ের আগে তার সাথে আমার আট বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ধরতে গেলে আমরা একসাথে বেড়ে উঠেছি। সেই মানুষটার শূণ্য থেকে আমি তার সাথেই ছিলাম। তাকে আমি প্রায়ই একথাটা বলতাম যে কাবিননামার চাইতেও আমার কাছে ভালবাসাটা বড়। তবে সামাজিকতার চাপ তো থাকেই।

দাম্পত্য সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল ও সবচাইতে কঠিন একটা সম্পর্ক। একটা গাছে যেমন নিয়মিত জল, সার দিতে হয়, এখানেও তাই। দাম্পত্যে শুধু প্রেম থাকলে, সৎ থাকলে বা শুধু দায়িত্ববোধ থাকলেই সব কেল্লাফতে হয়ে যায়না। দরকার সময়, দরকার বাৎসল্য। হ্যাঁ, প্রেমে বাৎসল্য প্রয়োজন। বিবাহিত দম্পতির নিজেদের মত সময় কাটানো প্রয়োজন। শুধু "ভালবাসি" বলে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়না। সময়ের সাথে সাথে মন যেমন বদলে যায়, তেমনি শরীরও বদলে যায়। দেহ বিনে প্রেম আর প্রেম বিনে দেহ যেন মুরলী বিনে কৃষ্ণ।

একবার আমি প্রশ্ন করেছিলাম "মানুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় নাকি বন্দী হয়" মিশ্র উত্তর পেয়েছিলাম। আবারো একই প্রশ্ন করলাম। কী মনে হয় আপনাদের?

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Abdur Rahman 5 days ago

    অসাধারণ সুন্দর রচনা ।