শহরের কোলাহল থেকে একটু আড়ালে, পুরোনো এক গলির ভেতর আকাশ ঘড়ির দোকান। নামটা অদ্ভুত শোনালেও, এর ভেতরে ঢুকলে মনে হয় সময় যেন এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। আকাশ একজন সাধারণ ঘড়ি মেরামতকারী নয়; লোকে বলে, সে নাকি মানুষের নষ্ট হয়ে যাওয়া সময়ের হিসেব মিলিয়ে দিতে পারে। তার টেবিলের ওপর রাখা একটা পুরনো পকেট ঘড়ি, যেটির কাঁটাগুলো উল্টো দিকে ঘোরে—তা ছিল তার সব রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু।
একদিন বিকেলে বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে দোকানের দরজায় টোকা পড়ল। এক বৃদ্ধা ভেতরে ঢুকলেন, যার পরনে সাধারণ শাড়ি, কিন্তু চোখে গভীর এক বিষণ্ণতা। তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে একটি পকেট ঘড়ি আকাশকে দিলেন। করুণ কণ্ঠে বললেন, “বাবা, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তটি এই ঘড়ির কাঁটায় আটকে আছে। আমি আবার সেই বিকেলে ফিরে যেতে চাই, যখন মানুষটা আমাকে বলেছিল, ‘আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যাব না’।”
আকাশ ঘড়িটির ঢাকনা খুলল। ভেতরে কোনো সাধারণ যন্ত্রাংশ নেই, বরং নীল রঙের এক অদ্ভুত ধুলিকণা জমা হয়ে আছে। আকাশ যখনই খুব সূক্ষ্ম চিমটা দিয়ে ধুলিকণাগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করল, ঘড়িটি থেকে এক মৃদু নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল সারা ঘরে।
হঠাৎ করেই আকাশ দেখল, দোকানের দেয়ালগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তার চারপাশে ভেসে উঠছে বহু বছর আগের এক নদীর পাড়। সে দেখল, এক তরুণী আর এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে সূর্যাস্তের আলোয়। আকাশ যেন কোনো অশরীরী সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই অমর মুহূর্তের। সেই কথাগুলো বাতাসের সাথে ভেসে এল, যা বৃদ্ধার জীবন বদলে দিয়েছিল।
আকাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, সে সময় মেরামত করছে না, বরং স্মৃতির আয়নাকে জীবন্ত করে তুলছে।
আকাশ ধীরে ধীরে ঘড়িটি বন্ধ করে দিল। ফিরে এল বাস্তবে। বৃদ্ধা তখনো তার সামনে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ঘড়িটি আবার স্বাভাবিক ছন্দে চলছে—টিক্ টিক্ শব্দ যেন এক নতুন আশার বাণী শোনাচ্ছে। বৃদ্ধার চোখে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি যেন সেই বিকেলটিকে আবার নতুন করে খুঁজে পেয়েছেন।
বৃদ্ধা চলে যাওয়ার পর আকাশ দোকানের দরজায় একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিল— ‘এখানে কেবল ঘড়িই নয়, মানুষের হারানো সময়ও খুঁজে পাওয়া যায়।’
আকাশ এখন জানে, সময় মেরামত করা তার পেশা হতে পারে, কিন্তু মানুষের স্মৃতির মূল্য তার কাছে এখন সবকিছুর ঊর্ধ্বে।