প্রথম খণ্ড:
তুষখালীর পথঅধ্যায় ১:
চেনা রাস্তা, অচেনা পথিকপিরোজপুর লঞ্চঘাট থেকে যখন বলেশ্বর নদীর বুক চিরে ট্রলারটি তুষখালীর উদ্দেশ্যে রওনা দিল, তখন দুপুরের রোদ মাথার ওপর ঠিকরে পড়ছে। নদীর নোনা বাতাস আর পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে এক অদ্ভুত একাকীত্ব লুকিয়ে আছে। ট্রলারের এক কোণে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল শুভ্র। তার পকেটে একটা সরকারি দপ্তরের বদলির আদেশনামা। শহর ছেড়ে এই অজপাড়াগাঁয়ে আসার কোনো ইচ্ছেই তার ছিল না। কিন্তু ভাগ্য তাকে টেনে এনেছে এই পিরোজপুরের নদী-নালা আর সবুজের ঘেরাটোপে।তুষখালী বাজারে যখন সে পৌঁছাল, তখন সূর্যটা পশ্চিমে একটুখানি হেলে পড়েছে। গ্রাম্য বাজারের চায়ের দোকানগুলো থেকে ধোঁয়া উঠছে। শুভ্র তার কাঁধের ব্যাগটা ভালো করে চেপে ধরে একটা মাটির রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল। তার থাকার জায়গা ঠিক হয়েছে তুষখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঠিক পাশেই একটা পুরনো কাঠের দোতলা বাড়িতে। বাড়িটি এক স্কুল মাস্টারের, যিনি এখন শহরে থাকেন।পরদিন সকাল থেকেই শুভ্রর নতুন কর্মজীবন শুরু হলো। সে একটা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (NGO) মাঠ পরিদর্শক হিসেবে যোগ দিয়েছে। তার কাজ হলো তুষখালী ও তার আশেপাশের গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার হার তদারকি করা। তবে কাজের ফাঁকে শুভ্রর সবচেয়ে প্রিয় সময় হয়ে উঠল অলস দুপুর আর বিকেলবেলাটা।বিদ্যালয়টির সামনে একটি বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ। সেই গাছের নিচে একটা ভাঙা সিমেন্টের বেঞ্চ পাতা। শুভ্র প্রতিদিন দুপুরের পর মাঠের কাজ শেষ করে এসে ওই বেঞ্চটায় বসত। বাতাসে কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলগুলো টুপটাপ ঝরে পড়ত মাটিতে। আর ঠিক তখনই শুরু হতো তার অন্তহীন অপেক্ষা।সে জানত না তার নাম। কোনোদিন সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস বা সুযোগ কোনোটাই হয়ে ওঠেনি। সে শুধু জানত, মেয়েটি তুষখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। প্রতিদিন সকাল সাড়ে নয়টায় সে একটা হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি পরে, কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে এই রাস্তা দিয়ে স্কুলে যায়। আর বিকেল চারটায় যখন স্কুলের শেষ ঘণ্টাটি বাজে, বাচ্চাদের কোলাহলে যখন চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন সে বাচ্চাদের ছুটি দিয়ে ধীরপায়ে এই পথেই বাড়ি ফেরে।শুভ্র ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে থাকত। দুপুর আড়াইটা... তিনটা... সাড়ে তিনটা...।তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করত। কাজের খাতাগুলো কোলের ওপর খোলা থাকত ঠিকই, কিন্তু চোখ দুটো পড়ে থাকত স্কুলের ওই কাঠের গেটটার দিকে। মনে মনে সে বলত, "সে আমায় কেন হলো না? কেন এই চেনা পৃথিবীতে আমরা এত অচেনা রয়ে গেলাম?"বিকেল চারটা বাজল। স্কুলের পিওন যখন ঘণ্টি বাজাল—'ঢং ঢং ঢং ঢং'—শুভ্রর হৃদস্পন্দন যেন বেড়ে গেল। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পিঠে ব্যাগ নিয়ে হইচই করতে করতে স্কুল গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। কেউ ধুলো উড়িয়ে দৌড়াচ্ছে, কেউ আইসক্রিমওয়ালার চারপাশে ভিড় করছে।আর ঠিক তাদের পেছনেই শান্ত, স্নিগ্ধ মূর্তির মতো বেরিয়ে এল সে।আজও তার পরনে সেই পরিচিত নীল শাড়ি। কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ। চুলগুলো আলতো করে খোঁপা করা। সে ধীরপায়ে হেঁটে আসছে এই কৃষ্ণচূড়া তলার রাস্তা দিয়েই। শুভ্রর হাতের কলমটা থমকে গেল। সে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মেয়েটি যখন শুভ্রর বসার স্থানটি অতিক্রম করছিল, ঠিক তখন বাতাসের এক ঝলক ঝাপটায় তার শাড়ির আঁচলটা একটু উড়ে গেল। মেয়েটি আলতো হাতে আঁচলটা টেনে নিতে নিতে একবার মাত্র তাকাল কৃষ্ণচূড়ার বেঞ্চটার দিকে।ব্যস, ওইটুকুই। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুটি চোখ এক হলো। শুভ্রর মনে হলো, এই এক দেখাতেই তার সারাদিনের ক্লান্তি, রোদের তীব্রতা আর জীবনের সব একাকীত্ব মুছে গেল। কিন্তু মেয়েটি চট করে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে সোজা হেঁটে চলে গেল তুষখালী নদীর ঘাটের দিকে। হয়তো ওপারেই তার বাড়ি।শুভ্র স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। সে তার নাম জানে না, তার পরিচয় জানে না। শুধু জানে, এই তুষখালীর মেঠো পথে প্রতিদিন বিকেলে সে ওই রূপবতীর পথ চেয়ে বসে থাকে। এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুভ্র ভাবল, "যদি তার সাথে একটু দেখা হতো, যদি দুটো কথা বলা যেত!" কিন্তু গ্রামীণ সমাজে একজন অচেনা যুবকের এভাবে কোনো এক শিক্ষিকার পিছু নেওয়া বা নাম জিজ্ঞেস করাটা কতটা শোভন? এই সংকোচ আর লোকলজ্জার ভয়ে শুভ্র কেবল দূর থেকেই ভালোবেসে গেল। প্রতিদিন কাজের ফাঁকে বসে থাকা, আর প্রতি বিকেলে শুধু একটুখানি দেখার তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফেরা—এটাই হয়ে উঠল তার তুষখালী জীবনের একমাত্র উপাখ্যান।(উপন্যাসের পরবর্তী অংশ যদি বেশি পড়া হয় তাহলে পরবর্তী খন্ড লিখতে পারি।)