ভয়ংকর প্রেম কাহিনী
পর্ব ৫: রক্তের বন্ধন ও অভিশপ্ত গর্ভ
বিয়ের পরের সাত দিন আদিত্য আর নাদিয়া যেন স্বর্গে ছিল। টিকাটুলির মেসবাড়ির একটা ছোট্ট কক্ষে তারা নতুন জীবন শুরু করেছিল। রাহাত আর সুমন প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসত, হাসি-ঠাট্টা করত। নাদিয়া তার বাবার বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিল বলে তার মা চুপিচুপি কিছু টাকা আর কাপড় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আদিত্য তার প্রতিযোগিতার টাকা দিয়ে একটা ছোট্ট ফ্রিজ আর গ্যাস কিনেছিল। রাতে তারা দুজন জানালার ধারে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত।
কিন্তু স্বর্গ কখনো বেশি দিন টেকে না।
প্রথম সতর্কবার্তা
বিয়ের দশম দিন রাতে নাদিয়া হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। তার পেটে প্রচণ্ড যন্ত্রণা। আদিত্য আলো জ্বালাতেই দেখল বিছানায় রক্তের দাগ। নাদিয়ার মুখ ফ্যাকাশে, ঠোঁট কাঁপছে। “আদিত্য... কেউ যেন আমার পেটের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে নাড়াচাড়া করছে।”
আদিত্য তাকে জড়িয়ে ধরল। ঠিক তখনই ঘরের আয়নায় পরীর প্রতিবিম্ব দেখা গেল। এবার তার চেহারা আরও ভয়ংকর। মুখে রক্তের দাগ, চুলগুলো সাপের মতো নড়ছে। “এই সন্তান আমার। তোমার শরীরে আমার অংশ আছে, আদিত্য। নাদিয়া শুধু একটা পাত্র।”
সুমনকে ফোন করা হল। সে মেডিকেলের ছাত্র হিসেবে দ্রুত চলে এল। পরীক্ষা করে বলল, “শারীরিক কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু... তার পালস অস্বাভাবিক। যেন দুটো হার্টবিট।”
পরের কয়েকদিন নাদিয়া বিছানায় শুয়ে রইল। আদিত্য ক্লাস কামাই করে তার পাশে থাকত। কিন্তু রাত হলেই পরী আসত। কখনো নাদিয়ার কানে ফিসফিস করে বলত, “তোমার সন্তান আমার হবে।” কখনো আদিত্যর শরীরে ঢুকে তার স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ করত। স্বপ্নে আদিত্য দেখত, সে আর পরী একসঙ্গে একটা অন্ধকার প্রাসাদে বাস করছে, আর নাদিয়া মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
বন্ধুদের উপর নতুন আক্রমণ
রাহাতের উপর আক্রমণটা সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল। একদিন সে মার্কেট থেকে ফিরছিল। হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে একটা অদৃশ্য শক্তি তাকে ধাক্কা দিল। রাহাত ট্রাকের সামনে পড়ে গেল। ট্রাক চালক শেষ মুহূর্তে ব্রেক কষল। রাহাত বেঁচে গেল, কিন্তু তার পা ভেঙে গেল এবং মাথায় গভীর ক্ষত হল। হাসপাতালে শুয়ে সে আদিত্যকে বলল, “ভাই, আমি আর পারছি না। ওই মেয়েটা... সে আমার স্বপ্নে আসে। বলে, তুই আদিত্যর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তোকে শেষ করলে আদিত্য ভেঙে পড়বে।”
সুমনও আক্রান্ত হল। তার মেডিকেল বইগুলো রাতারাতি পুড়ে গেল। তার হাতে অদৃশ্যভাবে কাটা দাগ পড়তে লাগল। সে এক রাতে আদিত্যকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি আর তোদের সঙ্গে থাকতে পারব না। আমার মা-বাবা আছে। আমি ডাক্তার হতে চাই। কিন্তু এই অভিশাপ...”
আদিত্য একা হয়ে পড়ছিল।
আদিত্যর অন্ধকার দিক
একদিন রাতে, যখন নাদিয়া ঘুমিয়ে ছিল, আদিত্য ছাদে উঠে পরীকে ডাকল। “তুমি যা চাও, আমি দেব। কিন্তু নাদিয়া আর আমার বন্ধুদের ক্ষতি করো না।”
পরী তার সামনে এসে দাঁড়াল। এবার সে পুরোপুরি শারীরিক রূপ ধারণ করেছিল। তার শরীর ঠান্ডা, কিন্তু স্পর্শে আগুন। সে আদিত্যকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। আদিত্য প্রথমে প্রতিরোধ করেছিল, কিন্তু পরীর শক্তির সামনে তার ইচ্ছাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ল। সেই রাতে আদিত্য পরীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল। যখন সকাল হল, তার শরীরে নখের দাগ আর রক্তের ছাপ। নাদিয়া জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, “কিছু না, স্বপ্ন দেখেছি।”
কিন্তু সেই ঘটনার পর আদিত্য বদলে যেতে লাগল। তার লেখায় অন্ধকার বেড়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা সেমিনারে তার প্রবন্ধ “প্রেমের অতিপ্রাকৃত রূপ” সবাইকে মুগ্ধ করল। একটা প্রকাশনা সংস্থা তার প্রথম উপন্যাস ছাপার প্রস্তাব দিল। টাকা আসতে শুরু করল। কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে তার ভিতরের অন্ধকারও বাড়ছিল। সে কখনো কখনো নাদিয়ার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাত।
নাদিয়ার গর্ভ ও ভয়ংকর আবিষ্কার
তিন মাস পর নাদিয়া নিশ্চিত হল সে গর্ভবতী। ডাক্তার বললেন, “সবকিছু নরমাল।” কিন্তু আলট্রাসাউন্ডে ডাক্তারের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “দুটো হার্টবিট... কিন্তু একটা সাধারণ নয়। যেন... অন্য কিছু।”
নাদিয়া ভয় পেয়ে কাঁদতে লাগল। আদিত্য তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি তোমাদের দুজনকেই রক্ষা করব।” কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে জানত, সন্তানটা পরীর অংশ।
এক রাতে নাদিয়ার শরীর থেকে অদৃশ্য শক্তি বেরিয়ে এল। ঘরের আসবাবপত্র উলটে গেল। নাদিয়া চিৎকার করে বলল, “আদিত্য, ও আমার পেটে লাথি মারছে... আর বলছে, ‘আমি তোমার মেয়ে। কিন্তু আমার বাবা পরী।’”
আদিত্য হতবাক। সে পরীকে ডেকে বলল, “এটা কী করছ তুমি?”
পরী হাসল, “আমি তোমার মাধ্যমে এই দুনিয়ায় ফিরে আসছি। এই মেয়ে আমাদের দুজনের। নাদিয়া শুধু জন্ম দিবে। তারপর আমি তাকে নিয়ে নেব।”
বড় বিপদ ও বিশ্বাসঘাতকতা
একই সময়ে আদিত্যর বাবা করিম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সৎমা সালমা ফোন করে বলল, “তোর জন্যই সব অশান্তি। তোকে দেখলে করিমের অবস্থা খারাপ হয়।” আদিত্য গ্রামে গেল। সেখানে পুরোনো আমগাছের নিচে বসে সে তার শৈশবের স্মৃতি মনে করছিল। হঠাৎ গাছের ভিতর থেকে পরীর পুরোনো ইতিহাস উন্মোচিত হল।
পরী আসলে ১৮১২ সালে এই অঞ্চলের এক জমিদারের মেয়ে ছিল। তার প্রেমিক তাকে নদীতে ডুবিয়ে মেরে ফেলেছিল সম্পত্তির লোভে। মৃত্যুর আগে পরী শপথ করেছিল, সে তার পরবর্তী জন্মের প্রেমিককে চিরকালের জন্য পাবে। আদিত্য সেই পুনর্জন্ম।
গ্রাম থেকে ফেরার পথে আদিত্যর বাস অ্যাক্সিডেন্ট করল। বাসটা নদীতে পড়ে গেল। অনেক যাত্রী মারা গেল। আদিত্য বেঁচে গেল কারণ পরী তাকে পানির উপর ভাসিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সে দেখল, দুর্ঘটনার জন্য পরীই দায়ী — সে বাসের চালককে নিয়ন্ত্রণ করেছিল যাতে আদিত্য “তার প্রতি নির্ভরশীল” হয়।
ঢাকায় ফিরে আদিত্য নাদিয়াকে বলল সব সত্য। নাদিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে আমরা এই সন্তান নষ্ট করে দেই।”
কিন্তু পরী তা হতে দিল না। সেই রাতে নাদিয়ার শরীর অবশ হয়ে গেল। তার পেট ফুলে উঠল অস্বাভাবিকভাবে।
আদিত্য এখন তিনটা জগতের মাঝে আটকে পড়েছে — মানুষের ভালোবাসা, অতিপ্রাকৃত আকর্ষণ, আর অভিশপ্ত সন্তান। তার ভিতরে দুটো আদিত্য লড়াই করছে। একজন নাদিয়ার জন্য মরতে চায়, অন্যজন পরীর অন্ধকারে ডুবে যেতে চায়।
রাহাত হাসপাতাল থেকে ফিরে বলল, “ভাই, আমরা একটা ওঝা বা কবিরাজের কাছে যাই। এভাবে চললে কেউ বাঁচবে না।”
কিন্তু আদিত্য জানত, এই যুদ্ধ আর সাধারণ উপায়ে জেতা যাবে না।
বাইরে ঝড় উঠছিল। নাদিয়ার পেটে আবার নড়াচড়া শুরু হয়েছে। পরীর হাসি ঘরের প্রতিটা কোণ থেকে ভেসে আসছিল।
“আদিত্য... আমরা শীঘ্রই এক হব। চিরকালের জন্য।”
(পর্ব ৫ সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্বে: সন্তানের জন্ম, পরীর পূর্ণ শক্তির উন্মোচন, আদিত্যর জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়, বন্ধুদের সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াই, এবং এক অপ্রত্যাশিত ট্র্যাজেডি যা সবকিছু বদলে দেবে।
5
View