নেশায় নষ্ট জীবন
ঢাকা শহরের মিরপুর-১০ এলাকার একটা সরু, ঘিঞ্জি, অপরিচ্ছন্ন গলিতে জিহাদের ছোট্ট বাসাটা অবস্থিত। বাসাটা ছিল একটা পুরনো দোতলা বাড়ির নিচতলায়, যেখানে মাত্র দুটো ছোট ছোট রুম আর একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন, স্যাঁতসেঁতে রান্নাঘর। রান্নাঘরের জানালাটা এত ছোট যে সূর্যের আলো প্রায় কখনোই ভালোভাবে ঢোকে না। জিহাদের বয়স তখন চব্বিশ বছর। সে লম্বা, রোগা চেহারার একটা ছেলে, কালো চুল সবসময় এলোমেলো হয়ে থাকে, চোখে একটা স্বপ্নাতুর, অস্থির দৃষ্টি যা তাকে সাধারণ মধ্যবিত্ত ছেলেদের থেকে একটু আলাদা করে তোলে। তার বাবা আব্দুল করিম সরকারি অফিসে ক্লার্কের চাকরি করতেন। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে তিনি ছেলেকে উপদেশ দিতেন, “জিহাদ, পড়াশোনায় মন দে। জীবনটা কবিতা দিয়ে চলে না। চাকরি-বাকরি না করলে কীভাবে সংসার চলবে?” মা রহিমা বেগম সারাদিন রান্না, ঘরদোর সামলাতেন, ছেলের জন্য বিশেষ করে ভাত-ডাল গরম করে রাখতেন আর রাতে তার পড়ার টেবিলে চা দিয়ে যেতেন। জিহাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনায় খুব বেশি মনোযোগী ছিল না সে, বরং তার আসল আনন্দ ছিল কবিতা লেখায়। ছোট ছোট খাতায় সে লিখে রাখত তার অনুভূতি। বন্ধু রাহাত আর সুমনের সাথে ক্যাম্পাসের পেছনের ছোট চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিত। রাহাত প্রায়ই হাসতে হাসতে বলত, “জিহাদ ভাই, তোর এই কবিতা দিয়ে কোনো মেয়ে পটবে কিনা জানি না, কিন্তু পেট ভরবে না নিশ্চয়ই। একটা রিয়েল চাকরি দেখ।” জিহাদ হাসত, চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলত, “রাহাত, জীবনটা শুধু খাওয়া-দাওয়া আর চাকরির জন্য নয়। কিছু স্বপ্ন, কিছু অনুভূতি তো থাকবেই।”
সেদিনটা ছিল বর্ষাকালের একটা সাধারণ দিন। আকাশ কালো মেঘে ঢাকা, হঠাৎ করে প্রচণ্ড বৃষ্টি নেমে এল। জিহাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে ছাতা ভুলে গিয়েছিল। বইয়ের ব্যাগটা মাথায় দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে সে একটা বড় আমগাছের নিচে আশ্রয় নিল। গাছের নিচে ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল একটা মেয়ে। তার নাম আফিয়া। লম্বা, ফর্সা গায়ের রং, ডাগর ডাগর চোখ দুটোতে একটা নরম, আলোকিত ভাব, লম্বা চুলে বৃষ্টির ফোঁটা লেগে মুক্তোর মতো ঝলমল করছিল। সে ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী। জিহাদের হাত থেকে একটা কবিতার বই পড়ে গেল তার পায়ের কাছে। আফিয়া মৃদু হাসি দিয়ে ঝুঁকে বইটা তুলে দিয়ে বলল, “কবিতার বই? আপনি নিজেও কবিতা লেখেন নাকি?” জিহাদের গলা শুকিয়ে গেল। সে কোনোমতে বলল, “হ্যাঁ, একটু চেষ্টা করি। আপনার নাম কী?” আফিয়া বলল, “আমি আফিয়া। ইতিহাসে পড়ি।” সেই প্রথম কথা। সেদিন আর বেশি কিছু হলো না। শুধু হালকা হাসি আর নাম জানা। কিন্তু জিহাদের মনে সেই হাসিটা রয়ে গেল।
কয়েকদিন পর ক্যাম্পাসে আবার দেখা। হালকা কথা, তারপর ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। জিহাদ প্রথম মেসেজ পাঠাল, “সেদিনের বৃষ্টিতে আপনার হাসিটা বারবার মনে পড়ছে।” আফিয়া উত্তর দিল, “আপনার বইয়ের কয়েকটা কবিতা পড়লাম। সত্যি সুন্দর।” এভাবে ধীরে ধীরে তাদের কথা বাড়তে লাগল। প্রথমে শুধু সাহিত্য, বই, কবিতা নিয়ে আলোচনা। তারপর নিজেদের জীবনের ছোট ছোট গল্প। আফিয়া বলত তার বাবা মোশাররফ হোসেন একটা বড় ব্যবসায়িক কোম্পানির ম্যানেজার, মা গৃহিণী, সে তাদের একমাত্র মেয়ে। জিহাদ বলত তার সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা, বাবার চাপ, মায়ের ভালোবাসা। কয়েক সপ্তাহ পর তারা প্রথম একসাথে চায়ের দোকানে বসল। সেখানে দুই ঘণ্টা কাটিয়ে তারা টিএসসির দিকে হাঁটতে হাঁটতে গেল। আফিয়া বলল, “তোমার কবিতা পড়লে মনে হয় জীবনটা অনেক রঙিন।” জিহাদ লজ্জা পেয়ে বলল, “তোমার সাথে কথা বললে নতুন নতুন কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে।”
সময় কাটতে লাগল। মাসের পর মাস। তাদের দেখা হওয়া বাড়তে লাগল। কখনো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিকেল কাটানো, যেখানে তারা ঘাসের ওপর বসে অনেকক্ষণ গল্প করত। কখনো লালবাগ কেল্লায় সূর্যাস্ত দেখতে যাওয়া, সেখানে আফিয়া জিহাদের কাঁধে মাথা রেখে বলত, “এই মুহূর্তগুলো যেন চিরকাল থেমে যাক।” কখনো পুরান ঢাকার সরু গলিতে ঘুরে ঘুরে ফুচকা, চটপটি খাওয়া, হাসাহাসি করা। জিহাদ আফিয়ার জন্য নিয়মিত কবিতা লিখত। একটা কবিতায় লিখেছিল, “তোমার চোখের সমুদ্রে ডুবে যাই, যেখানে ঢেউয়ের শব্দে শুধু তোমার নাম ভেসে বেড়ায়, আমি হারিয়ে যাই সেই অতলে।” আফিয়া পড়ে চোখে জল এনে বলত, “জিহাদ, তুমি আমাকে এত বড় করে দিয়েছ যে নিজেকে ছোট মনে হয়।” তারা হাত ধরে হাঁটত রাতের রাস্তায়, ছাদে বসে তারা দেখত, ফোনে রাত জেগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত। জিহাদের পড়াশোনা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছিল, সে খেয়াল করত না। ভালোবাসার এই মিষ্টি নেশা তাকে আস্তে আস্তে গ্রাস করছিল।
আফিয়ার বাসায় খবর চলে যেতে অনেক সময় লাগল। প্রথমে তার মা সন্দেহ করলেন, ছোট ছোট প্রশ্ন করতেন। তারপর বাবা মোশাররফ হোসেন খবর পেলেন। একদিন আফিয়াকে ডেকে বললেন, “মেয়ে, এই ছেলের সাথে বেশি মিশিস না। ওর কোনো স্থির ভবিষ্যৎ নেই। আমি তোর জন্য ভালো পাত্র দেখছি।” আফিয়া কাঁদল, অনেক বোঝাল, “বাবা, জিহাদ ভালো ছেলে। সে কবি, স্বপ্ন দেখে।” কিন্তু বাবা অটল, শুধু সাবধান করে দিলেন। জিহাদের বাসাতেও ধীরে ধীরে খবর পৌঁছাল। মা জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবা, তোর চোখে অন্য কিছু দেখি। কোনো মেয়ে নাকি?” জিহাদ লজ্জায় মুখ লুকিয়ে হাসল। বাবা বললেন, “পড়াশোনা ঠিক রাখিস। পরে সমস্যা হবে।”
তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হতে লাগল। ছয়-সাত মাস পর তারা বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে বসে অনেকক্ষণ কথা বলল। নদীর ঢেউয়ের শব্দের মাঝে আফিয়া বলল, “জিহাদ, আমি তোমাকে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারি না। কিন্তু পরিবারের চাপ বাড়ছে।” জিহাদ তার হাত চেপে ধরে বলল, “আমি চাকরি খুঁজছি আফিয়া। একটা বই প্রকাশ করব তোমার নামে উৎসর্গ করে। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা ছোট একটা ফ্ল্যাট নেব, জানালা দিয়ে নদী দেখা যাবে, আমাদের ছোট সংসার।” তারা স্বপ্ন দেখত দিনের পর দিন। কিন্তু বাস্তব চাপ ধীরে ধীরে বাড়ছিল। আফিয়ার বাবা আরও কড়া হয়ে উঠলেন। আফিয়াকে বললেন, “আমি তোর জন্য পাত্র দেখছি।” আফিয়া জিহাদকে লুকিয়ে দেখা করত, কিন্তু ভয়ে ভয়ে। ফোন কমে গেল, মেসেজের উত্তর দেরিতে আসত। জিহাদ জিজ্ঞাসা করলে আফিয়া বলত, “বাবা সন্দেহ করছে, সাবধানে থাকতে হবে।”
ধীরে ধীরে বিচ্ছেদের ছায়া ঘনিয়ে আসছিল। প্রথমে আফিয়ার ফোন অনেক কমে গেল। জিহাদ রাতে রাতে অপেক্ষা করত। তারপর দেখা কমল। একদিন আফিয়া বলল, “জিহাদ, হয়তো আমাদের একটু দূরত্ব রাখা উচিত।” জিহাদ কষ্ট পেল, অনেক বোঝাল, “আমরা তো একে অপরকে ভালোবাসি।” কয়েক সপ্তাহ এভাবে চলল। ঝগড়া, কান্না, আবার মিলন। তারপর এক বর্ষার সন্ধ্যায় আফিয়া ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “জিহাদ, বাবা আমাকে চট্টগ্রামে মামার বাসায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আমি আর পারছি না। পরিবার ভেঙে যাবে।” জিহাদ ছুটে তার বাসার সামনে গেল। বৃষ্টিতে ভিজে চিৎকার করল, “আফিয়া! নেমে আয় একবার!” আফিয়া নিচে নেমে এসে অনেকক্ষণ কাঁদল। “আমি তোমাকে ভালোবাসি জিহাদ, কিন্তু আমি অসহায়। প্লিজ আমাকে ভুলে যাও।” সেদিন তারা শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরল। আফিয়া চলে গেল। জিহাদ সেই রাতে একা বাসায় ফিরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর প্রথম সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে ভাবল, “এই যন্ত্রণা ভোলার কোনো উপায় নেই।”
বিচ্ছেদের পর জিহাদের জীবন ধীরে ধীরে উলটে যেতে লাগল। পড়াশোনা একদম ছেড়ে দিল। পরীক্ষায় ফেল করল। বাসায় ঝগড়া লেগেই থাকত। বাবা রাগ করে বলতেন, “তুই আমাদের মুখে চুনকালি মাখালি। এভাবে চললে আমরা তোকে আর রাখব না।” মা কাঁদতেন, “বাবা, একটু সামলে চল।” জিহাদ বাসায় ফিরত না। রাহাত আর সুমন প্রথমে সান্ত্বনা দিত, “ভাই, সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু জিহাদ শুনত না। মদ খাওয়া শুরু করল। প্রথমে অল্প, তারপর বেশি। নেশার মধ্যে আফিয়ার মুখ ভাসত। সে চিৎকার করে কাঁদত, “আফিয়া, তুমি কেন চলে গেলে?” ধীরে ধীরে গাঁজা, তারপর অন্য নেশা। চাকরি পেয়েছিল একটা ছোট প্রকাশনায়, কিন্তু নেশার জন্য ধরে রাখতে পারল না। টাকার জন্য বন্ধুদের কাছে হাত পাতত, পরে ছোটখাটো চুরি করত।
এক বছর কেটে গেল। জিহাদের চেহারা পুরোপুরি বদলে গেছে। চোখ কোটরে বসা, গাল ভাঙা, শরীর দুর্বল, হাত কাঁপে। বাবা-মা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। সে এখন মিরপুরের একটা ভাঙা পরিত্যক্ত বাড়ির ছাদে থাকে, অন্য নেশাখোরদের সাথে। নেশার টাকা জোগাড় করতে সে রিকশা চালাত, কখনো ভিক্ষা করত। শরীর ভেঙে পড়ছিল। লিভারের তীব্র ব্যথা, ঘুমের সমস্যা, হ্যালুসিনেশন। রাহাত শেষ চেষ্টা করল, “জিহাদ, রিহ্যাবে চল। আমি টাকা দেব।” জিহাদ হাসল, “রাহাত, আফিয়া ফিরে না এলে কোনো চিকিৎসা কাজ করবে না।”
দুই বছর পর। জিহাদ এখন হেরোইনের নেশায় পুরোপুরি ডুবে গেছে। শরীরে ক্ষতের দাগ, চোখে মৃত্যুর ছায়া। একদিন সে শুনল আফিয়া অন্য শহরে বিয়ে করেছে। সেই খবরটা তার শেষ শক্তিটুকু নিয়ে গেল। সে সারা রাত নেশা করে কাটাল। পরের দিন পুরনো লাইব্রেরির সেই আমগাছের নিচে গিয়ে বসল। বৃষ্টি পড়ছিল। পকেট থেকে ভিজে যাওয়া পুরনো কবিতার খাতা বের করল। পাতায় পাতায় আফিয়ার নাম, স্মৃতি, ভালোবাসার কথা। সে ফিসফিস করে বলল, “আফিয়া, তোমার ভালোবাসায় নেশা করেছিলাম। এখন এই বিষাক্ত নেশায় জীবনটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেল।” শরীর আর চলছিল না। সে চোখ বন্ধ করল। স্বপ্নে দেখল আফিয়া হাসছে, হাত বাড়িয়ে ডাকছে। কিন্তু সে আর ধরতে পারল না।
সকালে লোকজন তার নিথর দেহ পেল গাছের নিচে। পাশে পড়ে ছিল ভিজে যাওয়া কবিতার খাতা আর একটা খালি সিরিঞ্জ। খবরটা আফিয়ার কাছে পৌঁছাল। আফিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল। সে ফিসফিস করে বলল, “জিহাদ, ক্ষমা করো। আমিও তোমাকে কখনো ভুলতে পারিনি। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না।”
জিহাদের গল্প এখানেই শেষ হলো। কিন্তু নেশায় নষ্ট হওয়া হাজারো জীবনের গল্প এখনো চলতে থাকে। ভালোবাসা যখন অন্ধ নেশায় পরিণত হয়, তখন ধ্বংস অনিবার্য। যারা এখনো এই পথে হাঁটছে, তারা যেন ফিরে আসে। জীবনকে নষ্ট করো না। ভালোবাসা সুন্দর, কিন্তু নেশা মারাত্মক।
5
View