মায়াপুরের নূপুরধ্বনি: জমিদার বাড়ির সাত দিনঅধ্যায় ১:
প্রথম দিন – যাত্রা ও প্রথম আগমনশহরের কংক্রিটের জঙ্গল, গাড়ির হর্ন আর অফিসের ফাইলের স্তূপ থেকে বাঁচতেই সাত দিনের একটা ছুটি নিয়েছিলাম। বন্ধু স্বপ্ন বেশ কিছুদিন ধরেই বলছিল, "আকাশ, এবার পুজো আর ঈদের মাঝের এই ছুটিতে চল আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। পুরোনো জমিদার বাড়ি, তোর ভালো লাগবে।"যেই কথা সেই কাজ। সকাল ঠিক ছয়টায় আমরা ঢাকা থেকে রওনা দিলাম। দূরপাল্লার বাস যখন যান্ত্রিক শহরটাকে পেছনে ফেলে হাইওয়েতে উঠল, বুকের ভেতর একটা স্বস্তির বাতাস বয়ে গেল। দুপাশে সবুজ ধানখেত আর বিলের পানি আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। দুপুর নাগাদ আমরা নামলাম একটি ছোট মফস্বল স্টেশনে। সেখান থেকে একটা পুরোনো মোটরচালিত ভ্যান গাড়িতে করে আরও এক ঘণ্টার পথ।গ্রামের নাম মায়াপুর। নামটার মধ্যেই কেমন যেন একটা ঘোর আছে। বিকেল চারটে নাগাদ আমরা যখন জমিদার বাড়ির সিংহদুয়ারের সামনে পৌঁছালাম, তখন সূর্যের আলো ম্লান হয়ে আসছে। বিশাল লোহার গেট, যাতে মরিচা ধরেছে। গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল এক বিশাল দিঘি, যার পানি একদম কালো। দিঘির পাড়েই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল তিনতলা রাজপ্রাসাদ সমতুল্য বাড়িটি। চুনকাম খসে পড়েছে, জায়গায় জায়গায় শ্যাওলা আর পরগাছা গজিয়েছে।আমাদের দেখেই এগিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ লোক। পরনে সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি, মাথায় কাঁচা-পাকা চুল।স্বপ্ন পরিচয় করিয়ে দিল, "আকাশ, ইনি রহিম মিয়া। এই বাড়ির কেয়ারটেকার। আমার দাদুর আমল থেকে ইনি এই বাড়ি আগলে রেখেছেন।"রহিম মিয়া হাত জোড় করে সালাম দিয়ে বললেন, "আসুন আকাশ বাবু। স্বপ্ন দাদাবাবু অনেক দিন পর এলেন। ঘরদোর সব পরিষ্কার করে রেখেছি।"ভেতরে ঢুকতেই একটা স্যাঁতসেঁতে, পুরোনো কাগজের গন্ধ নাকে এল। হলঘরের বিশাল ঝাড়বাতিটা ধুলোয় ধূসর। আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে দোতলার একটি বড় ঘরে। ঘরটি বেশ রাজকীয়, বিশাল খাটের ওপর মশারি টাঙানো। রহিম মিয়া আমাদের ব্যাগগুলো রেখে চলে গেলেন। একটু পরেই ঘরে এলেন এক মধ্যবয়সী নারী, হাতে চায়ের ট্রে।স্বপ্ন বলল, "ইনি হালিমা বেগম। আমাদের কাজের বুয়া। রান্নাবান্না আর ঘরের সব তদারকি ইনিই করেন।"হালিমা বেগম মৃদু হেসে বললেন, "শহরের বাবুদের এই অজপাড়াগাঁয় কষ্ট হবে না তো? কিছু লাগলে ডাকবেন।"বিকেলের আলো ফুরিয়ে যখন সন্ধ্যা নামল, তখনই বাড়ির আবহাওয়াটা কেমন যেন বদলে গেল। চারিদিক একদম নিঝুম। শুধু ঝিঁঝি পোকার ডাক। আমরা বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। মনে হলো, পিছনের অন্ধকার করিডোর দিয়ে কেউ একজন হেঁটে গেল, আর তার সাথে হালকা একটা শব্দ হলো—‘রুনঝুন’। ঠিক যেন নূপুরের আওয়াজ।আমি স্বপ্নের দিকে তাকালাম, "স্বপ্ন, কিছু শুনলি?"স্বপ্ন হাসল, "ধুর পাগল, বাতাসের শব্দ। পুরোনো বাড়ি তো, বাতাস এখানে নানা রকম সুর তৈরি করে।"কিন্তু আমার মন মানল না। এক অদ্ভুত গা ছমছমে অনুভূতি নিয়ে মায়াপুরের প্রথম রাতটা শুরু হলো।
অধ্যায় ২: দ্বিতীয় দিন –
সন্ধ্যার গা ছমছমে ভাব ও সুরের সূচনাপরদিন সকালটা ছিল বেশ মনোরম। পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল। হালিমা বেগমের হাতের গরম খিচুড়ি আর ডিম ভাজি খেয়ে আমি আর স্বপ্ন পুরো বাড়িটা ঘুরতে বের হলাম। বাড়ির পেছনে একটা বিশাল আমবাগান, আর তার পাশেই একটা ভাঙা নাচঘর। নাচঘরের খিলানগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ছাদ ধসে পড়েছে।দুপুরের দিকে রহিম মিয়ার সাথে দেখা হলো। তিনি বাগানে কাজ করছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "রহিম চাচা, এই বাড়িতে আপনারা ছাড়া আর কে থাকে?"রহিম মিয়া একটু থমকে গেলেন। তার চোখের কোণে একটা ভয়ের ছায়া দেখতে পেলাম। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, "কেউ না আকাশ বাবু। আমি, হালিমা আর রাতের বেলা একজন নৈশপ্রহরী থাকে। তবে...""তবে কী?" আমি কৌতূহলী হলাম।"না কিছু না বাবু। পুরোনো বাড়ি, নানা রকম কথা বাতাসে ওড়ে। কান দেবেন না।" তিনি এড়িয়ে গেলেন।সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই আবার সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা ফিরে এল। আজ কুয়াশা একটু বেশি। ড্রয়িংরুমে একটা হ্যারিকেন আর কয়েকটা মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে, কারণ এই গ্রামে প্রায়ই লোডশেডিং হয়। আমরা যখন রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষা করছি, ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা মধুর সুর ভেসে এল।কোনো বাদ্যযন্ত্র নয়, একদম খালি গলায় কেউ গান গাইছে। ধ্রুপদী ছাঁচের একটা গান, অথচ তার মধ্যে এক তীব্র আকুলতা আর বেদনা। কণ্ঠস্বরটি এক মেয়ের। এত মিষ্টি, এত নিখুঁত সেই গায়নশৈলী যে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে গেলাম।"স্বপ্ন! শুনছিস? এবার তো আর বলিস না বাতাসের শব্দ!" আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম।স্বপ্নও এবার গম্ভীর হয়ে গেল। সে বলল, "হ্যাঁ, গানটা আমিও শুনছি। কিন্তু এই এত রাতে, এই শুনশান বাড়িতে কে গান গাইবে?"আমরা লণ্ঠন হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হলাম। সুরটা আসছিল ওপরের তলা, অর্থাৎ তিনতলা থেকে। তিনতলার সিঁড়িটা সাধারণত তালাবদ্ধ থাকে। আমরা সিঁড়ির গোড়ায় গিয়ে দাঁড়ালাম। অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে সুরটা নেমে আসছে নিচে। হুট করেই গানটা বন্ধ হয়ে গেল, আর তার জায়গায় আবার সেই ‘রুনঝুন’ নূপুরের শব্দ। শব্দটা দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠে মিলিয়ে গেল।রহিম মিয়া তখন হ্যারিকেন হাতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। তার মুখ ফ্যাকাশে। "দাদাবাবুরা, আপনারা এখানে কী করছেন? ওপরে যাবেন না। ওদিকে যাওয়া নিষেধ।""কেন নিষেধ রহিম চাচা? কে গান গাইছিল ওপরে?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।রহিম মিয়া কাঁপানো গলায় বললেন, "ওটা মানুষের গলা না আকাশ বাবু। ওটা নূপুর দিদিমণি।"এই প্রথম একটা নাম শুনলাম—নূপুর। কে এই নূপুর? সেই রহস্যের জট খোলার আগেই দ্বিতীয় দিন শেষ হলো।
অধ্যায় ৩: তৃতীয় দিন – গভীর রাতের আলাপে নূপুরের সন্ধানতৃতীয় দিনে মায়াপুরের আকাশে মেঘ জমল। দুপুর থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি। বৃষ্টির কারণে আমরা ঘর থেকে বের হতে পারলাম না। হালিমা বেগম দুপুরে যখন খাবার দিতে এলেন, আমি তাকে চেপে ধরলাম।"হালিমা খালা, এই বাড়ির নূপুর কে? সত্যি করে বলো তো।"হালিমা বেগম চারপাশটা দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "বাবু, আজ থেকে প্রায় আশির বছর আগের কথা। এই জমিদার বাড়ির শেষ জমিদারের ছোট মেয়ে ছিলেন নূপুর দিদিমণি। খুব সুন্দর গান গাইতেন তিনি। তাঁর পায়ের নূপুরের শব্দে পুরো বাড়ি মুখরিত থাকত। কিন্তু এক রাতে কী যেন একটা দুর্ঘটনা ঘটল, দিদিমণি এই তিনতলার ঘর থেকে নিখোঁজ হয়ে গেলেন। কেউ বলে তিনি দিঘিতে ডুবে মরেছেন, কেউ বলে তাঁকে খুন করা হয়েছে। তারপর থেকেই এই বাড়িতে সন্ধ্যা হলে গান আর রাতে নূপুরের শব্দ পাওয়া যায়।"কথাটা শোনার পর থেকে আমার মনের ভেতর নূপুরকে দেখার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। সেই রাতে বৃষ্টির বেগ বাড়ল। রাত তখন আনুমানিক দুটো। স্বপ্ন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ করেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। ঘরের ভেতর কেমন যেন একটা ঠান্ডা হাওয়া।আমি চোখ মেলতেই শিউরে উঠলাম। ঘরের জানালার পাশে, খাটের ঠিক কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি অবয়ব। সাদা শাড়ি পরা এক তরুণী। চাঁদের আলো জানালার কাচ গলে তার ওপর পড়েছে। তার মুখাবয়ব অতি লৌকিক সুন্দর, কিন্তু চোখের মণি দুটো সাধারণ মানুষের মতো নয়, কেমন যেন এক অপার্থিব আলো জ্বলছে তাতে।ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমার চিৎকার করতে ইচ্ছে করল না।মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তার কণ্ঠস্বর ছিল ঠিক সেই রাতের গানের মতো মিষ্টি। সে বলল, "তুমি ভয় পাচ্ছ, আকাশ?"আমি কোনোমতে বললাম, "তু... তুমি কে? তুমিই কি নূপুর?"সে মাথা নাড়াল। "হ্যাঁ, আমি নূপুর। অনেক বছর পর এই বাড়িতে এমন কেউ এসেছে, যে আমার গান মন দিয়ে শুনেছে। সবাই আমাকে দেখে ভয় পায়, পালিয়ে যায়।""তুমি কেন এখানে আছ? তোমার কী হয়েছে?" আমার ভয় ততক্ষণে কেটে গেছে, এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছে তার কণ্ঠস্বরে।"আমি এই বাড়ির মায়ায় আটকে আছি, আকাশ। আমার একটা অতৃপ্ত ইচ্ছা রয়ে গেছে। কিন্তু আমার সময় শেষ, ভোর হতে চলল।"কথাটা শেষ হতেই বাইরের উঠোন থেকে একটা মোরগ ডেকে উঠল। আর সাথে সাথেই নূপুর যেন বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেল। শুধু বাতাসে রয়ে গেল জুঁই ফুলের তীব্র সুবাস।
অধ্যায় ৪: চতুর্থ দিন – ভোররাতের কান্না ও বাস্তবতার টানাপোড়েনচতুর্থ দিন ভোররাত্রে, যখন চারপাশটা একদম ধূসর, তখন এক বুকফাটা কান্নার আওয়াজে আমার ঘুম ভাঙল। সেই কান্না এতই করুণ যে শুনলে যে কারও বুক ফেটে যাবে। একটি মেয়ের কান্নার শব্দ, যা তিনতলা থেকে নেমে এসে পুরো বাড়িটাকে এক ভারী বিষাদে ভরিয়ে দিচ্ছে।আমি বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় গেলাম। দেখলাম স্বপ্নও উঠে এসেছে। স্বপ্ন বলল, "আকাশ, তুই কাল রাতে কার সাথে কথা বলছিলি? আমি ঘুমের ঘোরে যেন একটা মেয়ের গলা শুনলাম।"আমি স্বপ্নকে আর লুকিয়ে রাখলাম না। কাল রাতের সব ঘটনা খুলে বললাম। স্বপ্ন প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইল না। "তুই নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখছিলি, আকাশ! ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই।""তাহলে এই ভোররাতের কান্নাটা কিসের?" আমি প্রশ্ন করলাম।আমরা দুজনে মিলে এবার সাহস করে তিনতলার তালাবদ্ধ দরজার সামনে গেলাম। রহিম মিয়া আমাদের আগেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁর হাতে একটা বড় চাবির তোড়া।"রহিম চাচা, তালাটা খোলো। আমরা দেখতে চাই ভেতরে কী আছে," স্বপ্ন আদেশ দিল।রহিম মিয়া কাঁপতে কাঁপতে চাবি দিয়ে জং ধরা তালাটা খুললেন। দরজা খোলার সাথে সাথে একটা দীর্ঘদিনের বদ্ধ বাতাস আমাদের মুখে এসে লাগল। ঘরটা ছিল এক রাজকন্যার ঘরের মতো। একটা পুরোনো ড্রেসিং টেবিল, যার আয়নাটা ঝাপসা হয়ে গেছে। এক কোণে একটা কাঠের সিন্দুক। আর ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে এক জোড়া রুপোর নূপুর।কান্নার শব্দটা ঘরটা খোলার সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি মেঝে থেকে নূপুর জোড়া তুলে নিলাম। রহিম মিয়া চিৎকার করে উঠলেন, "ছুঁবেন না আকাশ বাবু! ওটা দিদিমণির নূপুর।"কিন্তু আমার মনে হলো, নূপুরটা স্পর্শ করার সাথে সাথে আমার ভেতরে এক অদ্ভুত শক্তির সঞ্চার হলো। নূপুর যেন আমার সাথে কথা বলছে। আমার মনে মনে একটা জেদ চেপে বসল—এই মেয়েটি, যে মাত্র কিছুক্ষণের জন্য হলেও আমার সামনে এসেছিল, যার কণ্ঠস্বর এত সুন্দর, তাকে কি কোনোভাবে বাস্তবে ফিরিয়ে আনা যায় না? বৈজ্ঞানিক উপায়ে না হোক, কোনো তান্ত্রিক বা আধ্যাত্মিক উপায়ে?
অধ্যায় ৫: পঞ্চম দিন – অতিপ্রাকৃতিক সাধনা ও গ্রামের ওঝাপঞ্চম দিনে আমার পুরো চিন্তা চেতনা জুড়ে শুধু নূপুর। কাজের বুয়া হালিমা বেগম আমার অবস্থা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি গোপনে আমাকে বললেন, "আকাশ বাবু, আপনার চোখ-মুখের অবস্থা ভালো ঠেকছে না। আপনি দিদিমণির মায়ায় পড়েছেন। এই মায়া বড় খারাপ। এর থেকে বাঁচতে হলে গ্রামের বুড়ো ওঝা কাসেম আলীর কাছে যেতে হবে।"আমি আর স্বপ্ন হালিমা বেগমের কথামতো বিকেলে গ্রামের শেষ প্রান্তে কাসেম আলীর কুটিরে গেলাম। কাসেম আলী একজন অন্ধ বৃদ্ধ, কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি প্রবল বলে গ্রামে সুখ্যাতি আছে। আমরা গিয়ে বসতেই তিনি কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললেন, "শহরের ছেলে, তুমি এক মৃত আত্মার প্রেমে পড়েছ। যে আশি বছর আগে ইহলোক ত্যাগ করেছে, তাকে তুমি বাস্তবে আনতে চাও?"আমি চমকে উঠলাম। তিনি জানলেন কী করে? "হ্যাঁ বাবা, তাকে কি কোনোভাবে জীবন্ত করা সম্ভব নয়? তার কণ্ঠস্বর, তার উপস্থিতি এতটাই জীবন্ত!"কাসেম আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন। "না বাবা, প্রকৃতির নিয়ম উল্টানো যায় না। যা চলে গেছে, তা গেছেই। তবে হ্যাঁ, যদি সেই আত্মার কোনো তীব্র আকাঙ্ক্ষা বাকি থাকে, তবে বিশেষ এক অমাবস্যার রাতে তাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য পূর্ণ মানবী রূপে দেখা যেতে পারে। কিন্তু তার বিনিময়ে জীবিত মানুষের জীবনীশক্তির ক্ষতি হতে পারে।"স্বপ্ন আমাকে টেনে ধরল, "আকাশ, চল এখান থেকে। তুই পাগল হয়ে যাচ্ছিস। একটা ভূতের জন্য তুই নিজের জীবন বাজি রাখবি?"আমরা জমিদার বাড়িতে ফিরে এলাম। আজ রাতটা ছিল অন্যরকম। কোনো গান নেই, কোনো কান্না নেই। শুধু এক গভীর, থমথমে নীরবতা। আমি রাতে বালিশের নিচে সেই রুপোর নূপুর জোড়া রেখে ঘুমাতে গেলাম। মাঝরাতে আবার সেই বরফশীতল হাওয়া। নূপুর আবার এল। এবার সে আমার খুব কাছে এসে বসল। তার হাতটা আমার কপালে ছোঁয়াল। স্পর্শটা ছিল বরফের মতো ঠান্ডা, অথচ এক অদ্ভুত আরাম ছিল তাতে।"তুমি কেন আমার জন্য এত কষ্ট করছ, আকাশ?" সে জিজ্ঞেস করল।"আমি তোমাকে এই অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে চাই, নূপুর। তোমার শেষ ইচ্ছা কী?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।নূপুর কেঁদে ফেলল, "আমার শেষ ইচ্ছা ছিল, আমার শেষ গানটি কেউ একজন শেষ পর্যন্ত শুনুক। আমার বাবা আমাকে গান গাইতে নিষেধ করেছিলেন, আর রাগ করে এই ঘরে বন্দি করে রেখেছিলেন। আমি অভিমান করে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছিলাম। আমার গানটা অসমাপ্ত রয়ে গেছে।"
অধ্যায় ৬: ষষ্ঠ দিন – অসমাপ্ত গান ও মুক্তির আয়োজনষষ্ঠ দিন। আমাদের ছুটির প্রায় শেষ পর্যায়। আগামীকালই আমাদের শহরে ফিরে যেতে হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, নূপুরের আত্মা যাতে মুক্তি পায়, সেই ব্যবস্থা করব। আমি তাকে বাস্তবে পুরোপুরি আনতে পারব না জানি, কিন্তু তার অসমাপ্ত গান শুনে তাকে শান্তি দিতে পারি।আমি স্বপ্ন, রহিম মিয়া এবং হালিমা বেগমকে নিয়ে বসলাম। সবাইকে বোঝালাম যে নূপুর কোনো ক্ষতিকারক আত্মা নয়। সে শুধু তার গানটা গাইতে চায়। রহিম মিয়া কেঁদে ফেলে বললেন, "আমি ছোটবেলা থেকে এই গান শুনে আসছি বাবু। কিন্তু ভয়ে কখনো বুঝিনি। আপনি ঠিক বলেছেন, দিদিমণির মুক্তি দরকার।"সেই রাতে আমরা সবাই তিনতলার সেই ঘরে জড়ো হলাম। ঘরের মাঝখানে একটা মোমবাতি জ্বালানো হলো। আমি বালিশের নিচ থেকে নূপুর জোড়া বের করে মেঝের মাঝখানে রাখলাম। রাত যখন ঠিক বারোটা, চারপাশের বাতাস থমকে গেল। মোমবাতির শিখাটা নীল হয়ে উঠল।